পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রা ঘোষণা করেছে তার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই)। এই পদযাত্রা ঠেকাতে ইসলামাবাদে হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। মহাসড়কে ব্যারিকেড এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে সরকার। অনেক সড়ক, মহাসড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কাঁটাযুক্ত কন্টেইনার বসানো হয়েছে এসব সড়কে। ফলে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী ৪ঠা অক্টোবর এই পদযাত্রা করবে পিটিআই। এর আগে ২৭শে সেপ্টেম্বর পদযাত্রা করার ঘোষণা দিয়েছিল তারা। কিন্তু সেই কর্মসূচি এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সরকারের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।
২০২৩ সাল থেকে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে রাখা হয়েছে ইমরান খানকে। তার সঙ্গে কারাগারে যে আচরণ করা হচ্ছে তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে দলে। এর মধ্যে তার শারীরিক ভয়াবহ অবনতি হয় বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। তার বোনসহ দলীয় শীর্ষ নেতারা তাকে দেখতে যান কারাগারে। কিন্তু ইমরানকে মুক্তি দেয়া হয়নি। উল্টো তার দুই বোনকে আটক করে সরকার। এরপর ওই কর্মসূচির ঘোষণা দেয় দল।
বিশ্লেষকেরা বলেছেন, এই বিক্ষোভ সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সরকারকে ব্যাপকভাবে দুর্বল, অবৈধ ও জনসমর্থনহীন হিসেবে বিবেচনা করা হয় এমন দাবিও রয়েছে। অন্যদিকে ইমরান খান এখনো জনসমাবেশে বিপুল সমর্থন জড়ো করতে সক্ষম একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে বিবেচিত। ক্ষমতাসীন জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তবে ব্যাপকভাবে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে দেশটির কার্যত নেতা হিসেবে দেখা হয়। চলতি সপ্তাহে পিটিআইয়ের কয়েক ডজন নেতা ও মন্ত্রীকে আটক করা হয়েছে অথবা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। সোমবার ইমরান খানের তিন বোনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরির অভিযোগে তারা এখনো কারাগারে। গ্রেপ্তার হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইমরানের নিজ প্রদেশ খাইবার পখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী ও পিটিআইয়ের শক্ত ঘাঁটির নেতা সোহেল আফ্রিদি। রাজধানীর উদ্দেশে পদযাত্রায় ওই প্রদেশ থেকে হাজার হাজার সমর্থক যোগ দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আফ্রিদি বলেছেন, ইমরানের সঙ্গে আচরণ ও কারাগারের পরিস্থিতি নিয়ে সরকার উল্লেখযোগ্য ছাড় না দিলে পিটিআই পদযাত্রা করবে। এর মধ্যে ইমরানের মামলাগুলোর ন্যায্য শুনানির দাবিও রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার আতঙ্কিত। এ কারণেই তারা ইসলামাবাদ অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এ কারণেই তারা আমাদের মন্ত্রীদের অপহরণ করছে। কিন্তু ইমরান খান দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা এবং তার জন্য মানুষ রাস্তায় নামবে। আমি নিশ্চিত, জনগণ রাস্তায় নেমে ইসলামাবাদে পৌঁছালে জনতার শক্তি তারা থামাতে পারবে না। নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুল মোতায়েনের কারণে ইমরান সমর্থকদের রাজধানীতে প্রবেশ ঠেকাতে সহিংস সংঘর্ষ হতে পারে। এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও স্বীকার করেন আফ্রিদি। এর আগে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিক্ষোভেও এমন সংঘর্ষ দেখা গেছে।
সরকার ইতিমধ্যে খাইবার পখতুনখোয়ায় হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে এবং প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারের সঙ্গে ইসলামাবাদের সংযোগকারী প্রধান মহাসড়ক বন্ধ করে দিয়েছে। আফ্রিদি বলেন, আমাদের থামাতে তারা যে কোনো পর্যায়ে গিয়ে বলপ্রয়োগ করতে পারে, এ বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যদি বিপুলসংখ্যক মানুষ থাকে, তারা আমাদের ওপর গুলি চালাতে পারবে না। আমাদের পরিকল্পনা হলো এত বেশি মানুষ নিয়ে আসা যে শেষ পর্যন্ত তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
খাইবার পখতুনখোয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগ করা গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে নেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমর্থন করে বলেন, এগুলো সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। তিনি পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ করেন। ইমরান খানের দলের সমর্থকদের রাজধানীতে প্রবেশের পথ বন্ধ করতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপে ইসলামাবাদে জনঅসন্তোষ বাড়ছে। শহরটিকে এখন উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত দুর্গের মতো দেখাচ্ছে। রাস্তায় এক হাজারের বেশি পণ্যবাহী কনটেইনার বসিয়ে দেয়া হয়েছে এরই মধ্যে। এসব কনটেইনারের অনেকগুলোতে কাঁটাযুক্ত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সেতুগুলোতে বালুর বস্তা রাখা হয়েছে এবং রাজধানীতে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইসলামাবাদে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজধানীজুড়ে ২২ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারের এই অবরোধমূলক পদক্ষেপে রাজধানীতে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারছে না।
