জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ৫ দাবি, কিন্তু তথ্যপ্রমাণ বলছে ভিন্ন কথা

জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ৫ দাবি, কিন্তু তথ্যপ্রমাণ বলছে ভিন্ন কথা

ফন্ট সাইজ:

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা ও অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই দিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চ ব্যবহার করেছেন বারবার। এ সময় তিনি এমন কিছু দাবি করেছেন, যা আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবিক সহায়তা সংস্থা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব তথ্য-উপাত্তের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দেয়া বিভিন্ন ভাষণে নেতানিয়াহু ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন, বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা অত্যন্ত কম বলে দাবি করেছেন, গাজার মানবিক সহায়তা সংকটের জন্য হামাসকে দায়ী করেছেন এবং অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি দখলদারদের সহিংসতাকে খাটো করে দেখিয়েছেন। এ ধরনের পাঁচটি দাবি পর্যালোচনা করেছে তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু। তাতে দেখা যায়, নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সঙ্গে নথিভুক্ত তথ্য-প্রমাণের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

‘গণহত্যার অভিযোগ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা’: ২০২৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে নেতানিয়াহু গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে, এমন অভিযোগকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করেন। তার যুক্তি ছিল, বেসামরিক মানুষকে সতর্ক করা, টিকাদান এবং খাদ্য সরবরাহের মতো পদক্ষেপ গণহত্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে জাতিসংঘের অধীনে গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, স্যাটেলাইটের ছবি, সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে কমিশনটি জানায়, গণহত্যা সনদে সংজ্ঞায়িত পাঁচটি কর্মকাণ্ডের মধ্যে চারটি ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ও বাহিনী করেছে। এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। কমিশন আরও বলেছে, নেতানিয়াহু ও ইসরাইলের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বক্তব্য গণহত্যার অভিপ্রায়ের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইসরাইল অবশ্য এসব অনুসন্ধান প্রত্যাখ্যান করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এখনো চূড়ান্ত রায় দেয়নি। তবে আদালত ইসরাইলকে গণহত্যা সনদের আওতাভুক্ত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং জরুরি প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে।

‘বেসামরিক হতাহতের অনুপাত অস্বাভাবিকভাবে কম’: ২০২৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে নেতানিয়াহু দাবি করেন, গাজায় বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধা নিহত হওয়ার অনুপাত দুইয়ের কম। তিনি এটিকে ‘অত্যন্ত কম’ বলে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৭ শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা কমানোর জন্য ইসরাইল যা করছে, বিশ্বের আর কোনো সেনাবাহিনী তা করেনি।’ তবে দ্য গার্ডিয়ান, +৯৭২ ম্যাগাজিন ও লোকাল কল-এর যৌথ এক তদন্তে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর একটি গোপন গোয়েন্দা তথ্যভান্ডারের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ওই তথ্যভান্ডারে হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের প্রায় ৮ হাজার ৯০০ যোদ্ধার নাম ছিল, যাদের মৃত বা সম্ভবত মৃত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। একই সময়ে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৩ হাজার। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিহতদের প্রায় ৮৩ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক।

‘গাজার মানবিক সহায়তার বড় অংশ চুরি করেছে হামাস’: গাজায় প্রবেশ করা বিপুল পরিমাণ মানবিক সহায়তা হামাস চুরি করেছে বলে বারবার অভিযোগ করেছেন নেতানিয়াহু। ২০২৬ সালে জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমরা গাজায় যে বিপুল পরিমাণ খাদ্য ঢুকতে দিয়েছি, তার বেশির ভাগই হামাস চুরি করেছে।’ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের হামাস বিপদের মধ্যে রেখে দিচ্ছে- এমন যুক্তিও দেন তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি)-এর একটি অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত মানবিক সহায়তা হামাস পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে নিয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

‘২০ লাখ টন খাদ্যই দুর্ভিক্ষের দাবি খণ্ডন করে’: জাতিসংঘে নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরাইল গাজায় ২০ লাখ টন খাদ্য বিতরণের সুযোগ করে দিয়েছে। অর্থাৎ গাজার প্রতিটি বাসিন্দার জন্য প্রায় এক টন খাদ্য। দুর্ভিক্ষ ও গণহত্যার অভিযোগ খণ্ডনের প্রমাণ হিসেবে তিনি এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তবে গাজায় ত্রাণ প্রবেশ করা আর সেই খাদ্য বেসামরিক নাগরিকদের কাছে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা নথিভুক্ত করেছে, নানা ধরনের বিধিনিষেধ, নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং সামরিক অভিযান খাদ্য ও সহায়তা সংগ্রহ ও বিতরণে বাধা সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালের ২রা মার্চ থেকে ১৮ই মে পর্যন্ত ইসরাইল গাজায় পণ্য ও মানবিক সহায়তা প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ রেখেছিল। সংঘাত চলাকালে বিভিন্ন সময় দীর্ঘ মেয়াদে মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা, বিধিনিষেধ এবং স্থগিতাদেশও দেয়া হয়েছে।

‘দখলদারদের সহিংসতা ছোট একটি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড’: ২০২৬ সালের জাতিসংঘের ভাষণে নেতানিয়াহু অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি দখলদারদের সহিংসতাকে প্রায় ১৫০ জন ‘উচ্ছৃঙ্খল কিশোরের’ কর্মকাণ্ড বলে বর্ণনা করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, এতে মাত্র ‘দুই বা তিনজন’ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে আরও বিস্তৃত একটি চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের ২০শে জুলাই পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, বছরের শুরু থেকে হতাহত বা সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। এমন ১ হাজার ৩৩০টির বেশি দখলদার হামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ছয়টিরও বেশি হামলা হয়েছে। ওসিএইচএ একই সময় পর্যন্ত দখলদারদের হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৮ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ১২ জন দখলদারদের হাতে, তিনজন ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন এবং আরও তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় দায় কার, তা নিয়ে বিরোধ রয়েছে।