প্রিয় আমীরুল ইসলাম, গত কয়েক বছরে দ্রুত তোমার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছিল। আমাদের প্রিয় আমীরুল ইসলামকে বিদায় জানাতে হবে, এর জন্য মনে মনে তৈরি ছিলাম। যখন সেটা সত্যিই ঘটলো তখন তা মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বসে আছি আর পড়ছি তোমাকে নিয়ে বন্ধু-স্বজনদের লেখা অজস্র স্মৃতিগদ্য ও পদ্য। তোমাকে নিয়ে কতোজন কতো কথা কতো সুন্দর করে লিখবেন তা কি তুমি জানতে?
সারা বিশ্বের শিশুসাহিত্য সম্পর্কে তোমার জানাশোনা অসামান্য। ছড়া, গল্প, রূপকথা, অনুবাদ, জীবনী— এ রকম প্রত্যেকটা শাখায় তুমি যা লিখেছো তা-ই মানসম্পন্ন ও উৎকৃষ্ট। তোমার বৈশিষ্ট্য ও অবদান নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক লেখা হবে। কিন্তু আমরা, আমার মতো অনেকেই, আমীরুলের অভাব বোধ করবো একজন বন্ধু, ছোট ভাই ও আড্ডাসঙ্গী হিসেবে।
তোমার সঙ্গে লেখালেখি বা কাজের গল্প তো বাকি রয়ে গেলই। আরও কতো কথা বাকি। কতো আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, সমালোচনা, ঠাট্টা বিদ্রƒপ, হাহা হিহি। তোমার সঙ্গে গল্প করতে বসলে আমি নিজের বয়স ভুলে যেতাম। তোমার চেয়ে যে আমি বয়সে সাত-আট বছর বড়, তুমি যখন স্কুল পার হওনি তখন আমি ইউনিভার্সিটি পার হয়ে এসেছি— এসব বিষয় ছিল তুচ্ছ। তোমার প্রিয় ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়েছি অনেক বছর আগে। আমি যে তোমার স্যারের ছাত্র আর বসের বন্ধু সেটাও কোনো ব্যাপার না। আমার ক্যারিয়ার, জীবন-শৃঙ্খলা, ভোজন-সতর্কতা, জাগতিক সাফল্য ইত্যাদি নিয়ে তুমুল তাচ্ছিল্য ও নির্বিকার ইয়ার্কি করতে তুমি। এটা করার অধিকার তোমারই ছিল। আমি তো নগণ্য মানুষ। আড্ডায়, তর্কে তুমি যেকোনো বিশিষ্ট লেখক, অধ্যাপক, চিন্তাবিদ, ছোট-বড় যে কাউকে অনায়াসে তুচ্ছ করে ধসিয়ে দিতে পারতে। তোমার এই বৈশিষ্ট্যের জন্য অনেকেই মজা পায়, কেউ কেউ একটু আতঙ্কিত ও বিব্রত বোধ করে। আমার তো ভালোই লাগে। কারণ শুধু তোমার সঙ্গে গল্প করার সময়ই আমি জানতে পারতাম আমার জীবন ও অর্জনসমূহ কতো অর্থহীন।
কেউ কেউ আমাকে বলেন, আমীরুল সবাইকে এমন অসম্মান করে কেন? ও তো কোনো বড় লেখককেই বড় মনে করে না। একটা ভালো বই বা পত্রিকার মান নিয়ে সহজেই তাচ্ছিল্য করে। আসলেই কি আমীরুল এ রকম? মোটেই না। তোমাকে কোনো কোনো বিষয়ে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি, কিছু মানুষকে তুমি কীরকম গভীরভাবে ভালোবাসো। কতোটা সম্মান করো। সায়ীদ স্যার, মানে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্য তোমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল নিরঙ্কুশ। এমনকি এই ভালোবাসার কারণেই আমাকেও তুমি কিছুটা কাছের মানুষ বলে মনে করতে। এ জন্যই আমার অথবা সাগরের জন্য বিশেষ প্রীতি ছিল তোমার। শিশুসাহিত্যের সংগঠক ও
সম্পাদক হিসেবে পরিচিত রোকনুজ্জামান খান, রফিকুল হক বা আফলাতুনকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তুমি যত নির্মম রসিকতাই করে থাকো, এই মানুষগুলোকে তুমি ভালোবেসেছো তীব্রভাবে। সম্মান ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাদের কথা তুমি মনে রেখেছো আমৃত্যু। এ রকম অনেক মানুষকেই গোপনে নানাভাবে সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করেছো। কিছু কাজে তোমার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম বলে এটা আমি ভালো করে জানি। যেমন তুমি আর আমি একসঙ্গে কাজ করেছি সবুজ পাতার সম্পাদক শেখ তোফাজ্জল হোসেনের জীবনের শেষ কয়েকটি বছর একটু সহজ করে তোলার জন্য। তোফাজ্জল ভাইকে টাকা ও ওষুধ পাঠাতে তোমার ভুল হয়নি কখনো।
সায়ীদ স্যারের সঙ্গে আমার বাসায় আড্ডা-গল্পে পুরো সন্ধ্যা মাতিয়ে তুলতে তুমি। খাবারের পরিমাণ নয়, সৌখিন, বৈচিত্র্যময় খাবার বা সুখাদ্যের ব্যাপারে তোমার আগ্রহ ছিল ব্যাপক। আগ্রহ ছিল রান্না, রন্ধনশিল্পে। বুদ্ধদেব বসুর বইয়ের শিরোনাম থেকে শব্দ ধার করে তোমাকে আমি ডাকতাম ভোজনশিল্পী বলে। গত কয়েক বছর অসুস্থতার জন্য তুমি কয়েকবার আমার নিমন্ত্রণে সাড়া দিতে পারোনি। তাই তোমাকে কিছু পাঠাতে ইচ্ছা করতো। আজ থেকে ঠিক দু’মাস আগে একবার তোমাকে পছন্দের কিছু স্ন্যাকস পাঠাই। সেগুলো নিয়ে সাগরের রুমে বসে একসঙ্গে খেতে বসে তুমি আমাকে ফোন করলে। ওই সামান্য খাবার নিয়ে কী যে তোমার উচ্ছ্বাস— এতে আমার খুশি হওয়ার কথা। তোমার ওই শিশুর মতো আনন্দ আমাকে বিষণ্ন করে দেয়।
এ চিঠির সঙ্গে তোমাকে একটা ছবি দিতে চাই। কোন ছবি বেছে নিই তোমার জন্য? স্যারের সঙ্গে তুমি আর আমি— পাঞ্জাবিওয়ালা? সাগরের বাসায় তোলা ছবি? নাকি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সামনে বসে থাকা ছবি?
তোমার সঙ্গে শেষ দেখা জুলাইয়ের শেষদিকে। যখন সায়ীদ স্যারের জন্মদিন উপলক্ষে চ্যানেল আইয়ে আমরা একটা অনুষ্ঠান করি। স্যারের লেখা বইগুলো নিয়ে আলোচনা করছি ইমদাদুল হক মিলন, তুমি আর আমি। পাঠক হিসেবে আমাদের মোটামুটি সুনাম আছে। মিলন তো অসাধারণ। অথচ ওই আলোচনায় স্যারের প্রথম বই থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্বের গুরুত্বপূর্ণ বই, ভাষা ও ভাবনা নিয়ে তুমিই বললে সবচেয়ে চমৎকার। আমাদের শিক্ষকের জন্য কী সুন্দর সেই শ্রদ্ধাঞ্জলি। আমীরুল, সুসময় এবং দুঃসময়, প্রয়োজন অথবা প্রসঙ্গ ছাড়াই তোমাকে মনে করি। তোমাকে ভালোবাসি।
