ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকারি দল। তবে সেই কমিটিতে নাম দেয়নি বিরোধী দল। সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন চাইছে বিরোধী জোটের নেতারা। তাদের দাবি, নির্বাচনের দিন গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার ভিত্তিতেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংশোধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। বিরোধী দল বলছে, সংশোধনের নামে গণভোটে দেয়া জনগণের রায় পাশ কাটানো যাবে না। ফলে সংবিধান সংশোধন হবে, নাকি গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংস্কার হবে। এ নিয়েই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিপরীতমুখী অবস্থান তৈরি হয়েছে।
গত ১৬ই জুন সংসদের এলডি হলে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল থেকে কোনো প্রতিনিধি দেয়া হবে না। জনগণের দাবি ছিল সংবিধান সংস্কার। এজন্যই গণভোট হয়েছে। তাই সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কারের জন্য কমিটি করলে তারা সেটা বিবেচনা করবেন।
বিরোধী দল ও জোটের আপত্তি যে কারণে: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কয়েক মাসের আলোচনার পর জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়। ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোট এতে সই করে। ২০২৫ সালের ১৩ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন। এই আদেশে সনদ বাস্তবায়ন এবং যেসব সংস্কার প্রস্তাবের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে গণভোট আয়োজনের আইনি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
কমিশনের কাজ শেষে মোট ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়। এর মধ্যে ৪৮টির জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। বাকি বিষয়গুলো নির্বাহী আদেশ ও আইন সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন এমন ৪৮টি বিষয়ের মধ্যে মাত্র ৯টিতে বিএনপি (নোট অব ডিসেন্ট) আপত্তি জানিয়েছে।
সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ওই আদেশ অনুসারে ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারকাজ শেষ করতে হবে।
এই জায়গাতেই বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের মূল বিরোধ। বিএনপি সরকার গঠনের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করেনি। দলটির সংসদ সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নেননি। এর পরিবর্তে গত ১৩ই জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। কমিটিতে বিরোধী দল থেকে পাঁচজন প্রতনিধির নাম চাওয়া হলেও তারা নাম দেননি।
কমিটি নিয়ে মুখোমুখি সরকার-বিরোধী দল: এর আগে গত ২৯শে এপ্রিল বিএনপি ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে সাতজন বিএনপি, পাঁচজন অন্যান্য দল এবং পাঁচজন বিরোধী দল থেকে নেয়ার প্রস্তাব ছিল। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জামায়াত সময় চেয়েছিল। পরে গত ১৬ই জুন জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান ঘোষণা দেন, তারা ওই কমিটিতে যোগ দেবেন না। গত ২০শে সেপ্টেম্বর সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্যে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের সুপারিশ ও সংবিধান সংশোধনী বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই যাবতীয় আলোচনা সম্পন্ন করে জাতীয় সংসদে চূড়ান্ত রিপোর্ট উপস্থাপন করা হবে।
আইনি প্রক্রিয়া ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বাধীন রাষ্ট্রে নতুন করে সংবিধান পুনর্লিখন বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজন পড়ে না। সংসদীয় ব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো সংশোধনী গৃহীত হওয়াই এক ধরনের সংস্কার।
গণভোটের রায় নিয়েই বিরোধ: জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে নাম আহ্বান করা হলেও তারা নাম দেয়নি। গত ২০শে সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিশেষ কমিটির মতবিনিময়েও জামায়াতসহ ১১ দল অংশ নেয়নি। ওইদিন সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের ভোটে যে সাংবিধানিক ম্যান্ডেট দেয়া হয়েছে, সেটিকে পাশ কাটিয়ে কোনো বিকল্প প্রক্রিয়াকে জনগণের রায়ের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। জনগণের ভোট কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধা-অসুবিধা কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘিষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রহণ বা বর্জনের বিষয় নয়। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিকদের বক্তব্যও একই।
বিশেষ কমিটির মতবিনিময়েও অনুপস্থিত বিরোধীরা: জুলাই সনদে সই করা রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। সনদে সই করা ২৬টি দল ও জোটের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এতে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১টি দল অংশ নেয়নি।
বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে দল ও জোটগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ের দু’জন করে প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর আগে গত ৪ঠা আগস্ট কমিটির প্রথম বৈঠকে রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
সনদে সই না করা চার বামপন্থি দল- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাসদ ও বাসদ (মার্কসবাদী) কেও মতবিনিময়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া খেলাফত মজলিস জানিয়েছে, তারাও সংস্কারের দাবিতে অনড় থাকায় কমিটির বৈঠকে যাবে না। রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন জানিয়েছে, তারা বৈঠকে গিয়ে সংবিধান সংশোধন নয়, গণভোটের ফল অনুযায়ী সংস্কারের দাবি জানাবে। জেএসডি জানিয়েছে, বিএনপি গণভোটে অস্বীকার করায় তারা কমিটির বৈঠকে অংশ নেবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্যে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়।
এসব বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মানবজমিনকে বলেন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং সংস্কারের বিষয়েও আমরা একমত হয়েছিলাম। এরপর গণভোট হয়েছে, যেখানে ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখন সেই গণভোটের রায় কার্যকর না করে সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি করা হচ্ছে। এর কোনো প্রয়োজন নেই এবং এর কোনো ভিত্তিও নেই। এতে কোনো অর্জন হবে না। এ কারণে আমরা এটাকে প্রয়োজনীয় মনে করছি না।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও আমরা প্রতিনিধি দেইনি, ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকেও এই কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি দেয়া হয়নি।
এনসিপি’র নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্য ও মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার মানবজমিনকে বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে কেন এই সংবিধান সংশোধন কমিটি করা হচ্ছে? এখানে কেন বিরোধী দল নাম দেবে? আগের পুরো প্রক্রিয়াটাকে ভায়োলেট করে এখন এখানে আসা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা এর সঙ্গে থাকতে পারি না।
তিনি বলেন, এটা নিয়ে প্রশ্নটা বিরোধী দলের দিকে যেভাবে করা হচ্ছে, প্রশ্নটা আসলে সরকারকে করা উচিত। তারা গণভোটের রায়কে কেন অন্যদিকে নিয়ে গিয়ে নতুন করে এই প্রক্রিয়া শুরু করছে? পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাকস্পেস চেপে দিয়ে শূন্য থেকে শুরু করতে হলো কেন?
সরকার চাইলে এর সমাধান হবে জানিয়ে সারোয়ার তুষার বলেন, তারা (সরকার) যদি না চায়, এককভাবে করে ফেলতে চায়, আপাতত করে ফেলতে পারবে। কিন্তু এর যে পরিণতি, সেটাও তাদের ফেস করতে হবে। এর কোনো লেজিটিমেসি থাকবে না- নৈতিক বৈধতা যেটা বলা হয়, সেটা থাকবে না। এটা এককভাবে, একচেটিয়া একটা বিষয় হয়ে যাবে।
বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে থাকতে পারে না উল্লেখ করে এনসিপি’র এই নেতা বলেন, কারণ এটা গণভোটের রায়কে অমান্য করে হচ্ছে। ফলে এরকম কোনো প্রক্রিয়ায় আমরা থাকতে পারি না। কথা খুব পরিষ্কার। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের যে রোডম্যাপ, সেটা বাস্তবায়ন করেন। তাহলে আমরা সেটাতে শতভাগ কোঅপারেট করবো।
