নিজের একটি বইয়ের দোকান থাকবে। কাঠের তাকে সাজানো থাকবে হাজারো বই। সকালের নরম আলোয় কফির কাপে চুমুক দিয়ে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেয়া হবে প্রিয় কোনো উপন্যাস। এমন স্বপ্ন দেখেন অনেক বইপ্রেমী। স্কটল্যান্ডের ছোট্ট শহর উইগটাউন সেই স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এখানে পর্যটকরা শুধু অতিথি হয়ে আসেন না। তারা সরাসরি বইয়ের দোকান পরিচালনার সুযোগ পান। শহরটির একটি ঐতিহ্যবাহী বুকস্টোরের উপরের ফ্ল্যাটে রাত কাটিয়ে দোকান সামলানোর বিরল সুযোগ মেলে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উইগটাউন একসময় ছিল ধুঁকতে থাকা একটি ছোট্ট গ্রামীণ জনপদ। জনসংখ্যা মাত্র ৯শ’। নব্বইয়ের দশকে অর্থনৈতিকভাবে এলাকাটি প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা তখন বইকে আঁকড়ে ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯৮ সালে শহরটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্কটল্যান্ডের জাতীয় বই-শহর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপরই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।
বর্তমানে এই শহরে ডজনেরও বেশি বিশেষায়িত স্বাধীন বইয়ের দোকান গড়ে উঠেছে। এটিকে এখন ডাকা হয় বই দিয়ে বেঁচে ফেরা এক অলৌকিক শহর হিসেবে। শহরের সবচেয়ে অভিনব উদ্যোগ ‘দি ওপেন বুক’। এটি কোনো সাধারণ আবাসিক ভাড়া বাসা নয়। বরং এটি সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য একটি শৈল্পিক অভিজ্ঞতা। পর্যটকরা এয়ারবিএনবি’র মাধ্যমে বইয়ের দোকানের ঠিক ওপরের তলায় থাকা সুন্দর ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিতে পারেন। ভাড়া প্রতি রাতে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টাকা (৩৮ ডলার)। এর বিনিময়ে পুরো বুকস্টোরটি চালানোর দায়িত্ব তুলে দেয়া হয় তাদের হাতে। শহরের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান ‘দ্য বুকশপ’। প্রায় এক লাখ পুরনো বই দিয়ে ঠাসা এই দোকানে রয়েছে এক মাইলেরও বেশি দীর্ঘ তাক, ফায়ারপ্লেস এবং প্যাঁচানো সিঁড়ি।
এ ছাড়া পুরনো ব্যাংকের ভবনে গড়ে ওঠা ‘দি ওল্ড ব্যাংক বুকশপ’, নারী লেখকদের বই ও ক্যাফে নিয়ে তৈরি ‘রিডিংগ্লাসেস’, এককালের গোয়ালঘরে থাকা লোকসাহিত্য ও ইতিহাসের বইয়ের দোকান ‘বাইরে বুকস’ এবং শিশুদের জন্য তৈরি ‘কার্লি টেল বুকস’ পাঠকদের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ দেয়। পুরো শহর জুড়ে বইয়ের পাতা দিয়ে অলংকার তৈরির মতো কুটির শিল্পও রয়েছে। প্রতি বছর শরতে এই শহরে বসে দশ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক উইগটাউন বইমেলা। তখন সারা বিশ্ব থেকে নামিদামি লেখক, শিল্পী ও হাজার হাজার পাঠক এই শান্ত উপত্যকায় ছুটে আসেন। আশপাশের সবুজ বনভূমি, শান্ত হ্রদ আর পরিযায়ী পাখির কলকাকলির মাঝে এই জনপদ এখন বিশ্ব জুড়ে বইপ্রেমীদের অন্যতম প্রধান তীর্থক্ষেত্র। অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে বইকে হাতিয়ার বানিয়ে উইগটাউন যে অনন্য রূপকথা তৈরি করেছে, তা আধুনিক দুনিয়ায় সত্যিই বিরল।
