সরাইলে সিন্ডিকেটের কব্জায় সার, হতাশায় কৃষক

সরাইলে সিন্ডিকেটের কব্জায় সার, হতাশায় কৃষক

ফন্ট সাইজ:

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে প্রকাশ্যে-গোপনে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সার। কৌশলে গুদামবন্দির মাধ্যমে সারের ক্রাইসিস দেখিয়ে বস্তাপ্রতি ৪০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০০৯ সালে তৈরি কাগজে ৩২ ডিলার, ৭৯ সাব ডিলারের (খুচরা) তালিকা থাকলেও অধিকাংশের অস্তিত্ব নেই বাস্তবে। গুটি কয়েক প্রভাবশালী ব্যক্তির কব্জায় সরাইলের সার। নকল সারের কথাও চাউর হচ্ছে কৃষকের মুখে। মঙ্গলবার কালীকচ্ছ বাজারে সার ক্রয়ের সঠিক মূল্য বলায় কৃষক সিরাজুল ইসলামকে গালমন্দ করেন বিক্রেতা হেলাল মিয়া। গত ১৪ই সেপ্টেম্বর অধিক মূল্যে সার বিক্রির সময় হাতেনাতে ধরে শাহবাজপুরে এক বিক্রেতাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন নির্বাহী কর্মকর্তা মীর কামরুজ্জামান কবির। তারপরও থেমে নেই সিন্ডিকেটের কারসাজি।

সরজমিন অনুসন্ধান, কৃষি অফিস, ভুক্তভোগী কৃষক ও স্থানীয় সূত্র জানায়, এবার সরাইল উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। পর্যাপ্ত সারও দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সরকার নির্ধারিত সারের মূল্য হচ্ছে- ইউরিয়া প্রতি কেজি ২৭ টাকা (৫০ কেজির বস্তা ১৩৫০ টাকা), টিএসপি কেজি ২৭ টাকা, এমওপি কেজি ২০ টাকা ও ডিএপি কেজি ২১ টাকা (বস্তা ১০৫০ টাকা)। কৃষকের সার প্রাপ্তির জন্য সরাইলে ২০০৯ সালে নিয়োগ দেয়া হয় বিসিআইসি’র ১৬ জন ও বিএডিসি’র ১৬ জন ডিলার। তবে কাগজে-কলমে অস্তিত্ব আছে ৫-৭ জনের। চুন্টায়, কালীকচ্ছ ও শাহজাদাপুর ইউনিয়নে ট্যাগ করা হয়েছে আশুগঞ্জ উপজেলার মেসার্স আবীর পরিবহন সংস্থা, মেসার্স বাগদাদ পরিবহন সংস্থা, মেসার্স মলাই মিয়া, মেসার্স সবুজ বাংলা নামের সংস্থাগুলোকে। কাগজে এ ৪টির ঠিকানা রয়েছে আশুগঞ্জ ফেরিঘাট। সরাইলে তাদের কোনও অফিস নেই বা অতীতেও ছিল না। এছাড়া ৩২ জনের মধ্যে মাত্র ৫-৭ জন ডিলারের নড়াচড়া রয়েছে। আর সার উত্তোলন করেন ২-১ জন। একেক জন ৮-১০ জনের সার উত্তোলন করে মনগড়া সব উপজেলায় সাব ডিলারদের কাছে বিক্রি করছে। প্রত্যেক ইউনিয়নে (প্রতি ওয়ার্ডে ১ জন করে) নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৯ জন করে সাব-ডিলার (খুচরা)। তাদের প্রত্যেকের জামানত ৩০ হাজার টাকা। নিয়মানুযায়ী ৩২ জন ডিলারের কাছ থেকে সার নিয়ে কৃষকের কাছে বিক্রি করবেন ৭৯ জন সাব ডিলার। তবে সাব ডিলার নিয়োগেও অনিয়ম রয়েছে। অনেকেই নিষ্ক্রিয়, এক পরিবারের একাধিক সদস্য, এক পয়েন্টে ২, ৩ বা ৪ জন, এক ওয়ার্ডের বাসিন্দা আরেক ওয়ার্ডের ডিলার হয়ে বসে আছেন বছরের পর বছর। এদের কেউ সার পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না। কৃষকদের অভিযোগ, খুচরা ডিলারদের কাছে সার প্রাপ্তি ও মূল্যে চলছে নানা কারিশমা। সংকট দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম রাখছেন।

সরজমিন কালীকচ্ছ ইউনিয়নের সূর্যকান্দি গ্রামের কৃষক নজির মৃধা বলেন, বর্ডার বাজারের সাত্তারের দোকান থেকে টিএসপি সার ৪০ টাকা কেজি (২ হাজার টাকা বস্তা) মূল্যে ক্রয় করেছি। সেখানে ইউরিয়া ৩৫ টাকা কেজি আর লাল সার ১৬০০ টাকা বস্তা। আরও দেড় মণ সার লাগবে। তিনি বলেন, শুনেছি চানপুরসহ বিভিন্ন বাড়িঘরে সার মজুত করে রাখা আছে। গত মঙ্গলবার কালীকচ্ছ বাজারের বিক্রেতা হেলাল মিয়ার কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের ৫ বস্তা সার ক্রয় করেন নন্দীপাড়া গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম। তিনি টিএসপি ২ হাজার আর ইউরিয়া ১৬শ’ টাকায় কিনেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক বলেন, তারা মূল্য রসিদ দেয় না। ক্রেতা থেকে রাখা টাকার প্রকৃত পরিমাণও উল্লেখ করেন না। তাদের প্রিন্ট করা অংশ বাদে একটি সাদা কাগজে একেবারে সরকারি মূল্যটা লিখে ক্রেতাকে দেন। সরাইল সদরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মাহফুজ মিয়া বলেন, আমি এক বস্তা ডেপ সার ক্রয় করেছি ১৯শ’ টাকায়। উপজেলার প্রায় সব কৃষকেরই একই ধরনের অভিযোগ। সরাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও সার বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মো. একরাম হোসেন কয়েকজন সাব-ডিলার অধিক মূল্যে সার বিক্রি করছেন বলে স্বীকার করেন। বলেন, অধিক মূল্যে বিক্রির কোনও বিধান নেই। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে মনিটরিং করছি।

কৃষকরা অভিযোগ করলে ও সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো। সরাইলে অস্তিত্বহীন আশুগঞ্জের ৪ ডিলারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখেছি। দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাগজে থাকা ২৬ ডিলারের মধ্যে অধিকাংশের অস্তিত্ব না থাকার বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মীর কামরুজ্জামান কবির বলেন, একজনকে তো হাতেনাতে ধরে জরিমানা করেছি। এছাড়া জেলার কর্মকর্তাসহ আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মরত সকল উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি সর্বক্ষণ তদারকি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।