ইতিহাসের কৌতুক এই যে, ব্রিটিশ শাসনের স্থায়িত্বকামী ও শাসক ইংরেজের করুণাপ্রত্যাশী এই বাঙালি শিক্ষাবিদ আবার, ১৮৬৭ সালে, ‘জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, আর সেই সভার ‘কার্যবিবরণের ওপর নির্ভর করে’ একটি ‘প্রসপেক্টাস অব আ সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব ন্যাশনাল ফিলিং অ্যামাঙ দ্য এডুকেটেড নেটিভস অব বেঙ্গল’ রচনা করেছিলেন এবং এই কাজের জন্য খ্যাতিমান ভারতীয় বাঙালিদের কেউ কেউ তাকে “ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পিতামহ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলার ‘এডুকেটেড নেটিভস’ বলতে, বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজনারায়ণ বসু বাংলাদেশের ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালি অধিবাসীদের বুঝিয়েছেন। কিন্তু উপনিবেশিত অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসী বোঝাতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক অবজ্ঞামূলক ‘নেটিভ’ শব্দের ব্যবহার মেনে নিতে বসুর ‘জাতীয়তাবাদী’ মর্যাদাবোধকে আহত করেনি। জাতীয়তাবাদের এহেন উপনিবেশবাদী পিতামহ ও তার অনুসারীদের নেতৃত্বে ও তৎপরতায় প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব জারি থাকার বিষয়টি অতএব মোটেই আশ্চর্যজনক নয়।
রাজনারায়ণ বসুর সমসাময়িককালে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের স্থায়িত্বকামী বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা মোটেও কম ছিল না। এ ব্যাপারে, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও ইংরেজি-শিক্ষিত খ্যাতিমান হিন্দুত্ববাদী সাহিত্যিক, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৮৪) কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৮৮৪ সালের মাঝামাঝি প্রকাশিত তার ‘ধর্মতত্ত্ব’ গ্রন্থে বঙ্কিমচন্দ্র ভারতে ইংরেজ শাসনের প্রতি হিন্দুর অকৃত্রিম ভক্তির কথা স্বীকার করে লিখেছেন, “মুসলমানের পর ইংরেজ রাজা হইল, হিন্দু প্রজা তাহাতে কথা কহিল না, বরং হিন্দুরাই ইংরেজকে ডাকিয়া রাজ্যে বসাইল। হিন্দু সিপাহী ইংরেজের হইয়া লড়িয়া, হিন্দুর রাজ্য জয় করিয়া ইংরেজকে দিলো। কেননা, হিন্দুর ইংরেজের উপর ভিন্নজাতীয় বলিয়া কোনো দ্বেষ নাই। আজও ইংরেজের অধীনে ভারতবর্ষ অত্যন্ত প্রভুভক্ত।” তারপর, অকৃত্রিম ইংরেজ-প্রভুভক্ত বঙ্কিম ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে অভিমানক্ষুব্ধ অনুযোগ উত্থাপন করেন: “ইংরেজ ইহার কারণ না বুঝিয়া মনে করে, হিন্দু দুর্বল বলিয়া কৃত্রিম প্রভুভক্ত।”৪২
লক্ষণীয়, যে ওয়ারেন হেস্টিংস ভূমির ‘দশসালা বন্দোবস্ত’ প্রবর্তনের মাধ্যমে, শেষ পর্যন্ত, ভূমির নিপীড়নমূলক ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রবর্তনের পথ প্রসারিত করেছিলেন, সেই হেস্টিংসের ‘কলিকাতার গভর্নর জেনারেল’ পদ লাভকে বঙ্কিমচন্দ্র তার আনন্দমঠ উপন্যাসে ‘ভগবানের নিয়োগ’ বিবেচনায় আপ্লুত হয়েছেন।৪৩ ইংরেজ শাসকদের যারা শত্রু মনে করেছেন, তাদের উদ্দেশ্যে এই উপন্যাসের শেষে বঙ্কিম বলেছেন, “শত্রু কে? শত্রু আর নাই। ইংরেজ মিত্ররাজা।”৪৪ আর, তার দেবী চৌধুরানী উপন্যাসের শেষে বঙ্কিম ঘোষণা করেছেন, “ইংরেজ রাজ্য শাসনের ভার গ্রহণ করিলো। রাজ্য সুশাসিত হইলো।”৪৫
ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনের পক্ষে বঙ্কিম এমনকি, জাতীয় ‘স্বাধীনতা’ প্রত্যয়টির মর্মার্থ পর্যন্ত বিকৃত করে উপস্থাপন করেছেন। তিনি ‘ধর্মতত্ত্ব’ গ্রন্থে লিখেছেন, “স্বাধীনতা দেশী কথা নহে, বিলাতি আমদানি। লিবার্টি শব্দের অনুবাদ। ইহার এমন তাৎপর্য নহে যে, রাজা স্বদেশীয় হইতে হইবে। স্বদেশীয় রাজা অনেক সময়ে স্বাধীনতার শত্রু, বিদেশীয় রাজা অনেক সময়ে স্বাধীনতার মিত্র।”৪৬ এখানে, বঙ্কিমচন্দ্র, বস্তুত, ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকারকে ভারতের ‘স্বাধীনতার মিত্র’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
স্পষ্টতই, বাংলায় নতুন ভূমিব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন কায়েমি স্বার্থ ও তার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে লাভবান নতুন জমিদার শ্রেণি ও তার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে পাকাপোক্ত করতে সক্রিয় সহযোগিতা জুগিয়েছে।
চার
এবার আমরা দেখবো, দেশে দেশে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভেতর হীনম্মন্যতাসঞ্চারী ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও ইতিহাসের দর্শনচর্চা এবং তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ‘বয়ান’ সৃষ্টি ও প্রচার করার মাধ্যমে কীভাবে, যুগের পর যুগ ধরে, ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন ও শাসনের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে। বিজিত জনগোষ্ঠীর ভেতর হীনম্মন্যতা সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ইতিবাচক অতীত কীর্তিকে তাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার বর্ণবাদী কৌশল ব্যবহার করতো— আপন জনগোষ্ঠীর অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে কোনো গর্ববোধ থেকে বঞ্চিত করে এক অসীম নিঃস্বতার বোধ জাগ্রত করাই ছিল যার লক্ষ্য। উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভেতর এই নিঃস্বতাবোধ সঞ্চারের পাশাপাশি, উপনিবেশবাদী ইতিহাসবিদগণ ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর নানা প্রযুক্তিগত অর্জনকে চড়া স্বরে তুলে ধরার মাধ্যমে নিজেদের তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস গ্রহণ করেছে— যা, প্রকারান্তরে, ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও শাসনের ন্যায্যতা জোগাতে সাহায্য করেছে। আফ্রিকার বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কীর্তি আফ্রিকারই ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার উদাহরণ হিসেবে, নগুগি মিশর, ইথিওপিয়া ও জিম্বাবুয়ের প্রাচীন স্থাপত্য প্রযুক্তি যে কালো আফ্রিকারই আবিষ্কার, ইউরাপীয় ইতিহাসবিদগণ কর্তৃক সেই সত্যকে মুছে ফেলার উদাহরণ পেশ করেছেন।৪৭ ‘মহান জিম্বাবুয়ের’ স্থাপত্যশৈলী ও সৌন্দর্য সম্পর্কে নগুগি কোনো বর্ণনা না দিলেও, এটা অনেকেরই আর অজানা নয় যে, স্থানীয় কালো মানুষেরা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবি নদীর উত্তরে, জিম্বাবুয়ে নগরীর উঁচু পাহাড়ে, মর্টারবিহীন প্রযুক্তিতে ৩০ ফুট উঁচু, ২০ ফুট পুরো, ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২২০ ফুট প্রশস্ত দেয়াল ঘেরা ‘মহান জিম্বাবুয়ে’ নামক বিশাল স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন— যা দুই শতাব্দী ধরে গর্বের সঙ্গে টিকে ছিল। তাছাড়া, প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে আফ্রিকার মানুষরাই মিশরে অপার সৌন্দর্যময় পিরামিড নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এসব অবিস্মরণীয় কাঠামো নির্মাণের স্থাপত্য কৌশল আবিষ্কারের কৃতিত্ব আফ্রিকার মানুষকে না দিয়ে, উপনিবেশবাদী শ্বেতাঙ্গ ইতিহাসবিদগণ, নগুগির ভাষায়, ‘কোনো এক অচিন দেশের ফর্সা ত্বকবিশিষ্ট কিছু অজানা মানুষকে দান করেছেন’।৪৮
শুধু জিম্বাবুয়ে কেন, আফ্রিকার বেনিন রাজ্যের, বর্তমানে যা নাইজেরিয়ার অন্তর্গত একটি অঞ্চল, সৃজনশীল কারু ও স্থাপত্য শিল্পীরা সেই চতুর্দশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালে ব্রোঞ্জ, পিতল, আইভরি ও কাঠ দিয়ে নির্মিত ভাস্কর্য ও স্মৃতিফলক নির্মাণে উৎকর্ষ অর্জনের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তাদের এই শিল্পকর্ম ‘বেনিন ব্রোঞ্জ’ নামে ইতিহাসে স্বীকৃত। কিন্তু, দুঃখজনক হলো, উনবিংশ শতাব্দীর শেষে, ১৮৯৭ সালে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসী অভিযানের ফলে বিভিন্ন রাজকীয় প্রাসাদে রক্ষিত মহামূল্যবান সেইসব শিল্পকর্ম ধ্বংস ও লুট হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত আফ্রো-মার্টিনিকান রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী এইমে সেজার (১৯১৩-২০০৮) তার ডিসকোর্স অন কালোনিয়ালিসম গ্রন্থে বেনিন ব্রোঞ্জকে আফ্রিকার সমৃদ্ধ স্থাপত্য ও কারুশৈলীর একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে, পূর্ব আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কারের প্রাক-ঔপনিবেশিক অতীত সম্পর্কে সেজার বলেন, “সমকালীন নির্যাতনের শিকার মাদাগাস্কারের জনগণ একশ’ বছরেরও কম সময় আগে কবি, শিল্পী ও প্রশাসক ছিলেন।”৪৯ উল্লেখ্য, এই দ্বীপরাষ্ট্রটি ব্রিটিশ ও ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির আধিপত্যমূলক প্রতিযোগিতার নৃশংস শিকার হয় এবং ১৮৯৫ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সময়কাল নিরন্তর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির শোষণ-নিপীড়নের অধীনে থেকে, শেষ পর্যন্ত, ১৯৬০ সালে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করে।৫০
এখানে উল্লেখ্য যে, উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীসমূহের ভেতর হীনম্মন্যতা সঞ্চারের জন্য, অসদুদ্দেশ্যপরায়ণ ইতিহাস চর্চার পাশাপাশি, সাহিত্যকেও ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নগুগি তার ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড গ্রন্থে কেনিয়ার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিশেষ ধরনের রেডিও-নাটক সম্প্রচারকে উৎসাহিত করার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, যেসব নাটকে আফ্রিকার কোনো কালো মানুষের চরিত্রকে ‘ভাঁড়’ হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে, গোটা কালো জনগোষ্ঠীকেই প্রতীকীভাবে হাস্যকর বেকুব হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস গ্রহণ করা হতো।
কালো আফ্রিকার বিরুদ্ধে খ্যাতিমান শ্বেতাঙ্গ বুদ্ধিজীবীদের বর্ণবাদী নিন্দাবাদ রচনার সুনির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে নগুগি, তার একই গ্রন্থে, গোটা ইউরোপ জুড়ে ‘স্কটিশ এনলাইটেনমেন্ট ফিলসফার’ হিসেবে খ্যাত ডেভিড হিউমের (১৭১১-১৭৭৬) নাম পেশ করে, অত্যন্ত ন্যায্য ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, হিউম লিখেছেন, “কালো মানুষদের মধ্যে এমন কাউকেই খুঁজে পাননি, যিনি চিন্তা বা তৎপরতায় কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন”। হিউমের ভাষায়, “তাদের মধ্যে একজনও প্রতিভাবান উৎপাদক নেই, তাদের কোনো শিল্পকলা নেই, নেই কোনো বিজ্ঞান।”৫১
ডেভিড হিউম কালো আফ্রিকা সম্পর্কে যে অবজ্ঞাপূর্ণ কথাগুলো বলেছিলেন, নগুগি তার পুরোটা উদ্ধৃত করেননি। ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক আলোকায়নের একজন পুরোধা দার্শনিক হয়েও, হিউম আফ্রিকা সম্পর্কে কী ধরনের বর্ণবাদী মনোভাব পোষণ করতেন, পাঠকদের উপলব্ধির জন্য তার সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধটির— অফ ন্যাশনাল ক্যারেকটারস— পুরো অনুচ্ছেদটি এখানে তুলে ধরছি।
১৭৪৮ সালে লিখিত তার এই প্রবন্ধের শেষ অনুচ্ছেদে হিউম লেখেন, “আমার ধারণা, শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় নিগ্রোরা প্রাকৃতিকভাবেই নিকৃষ্ট। সভ্য জাতি হিসেবে জগতে কোনো কালো বর্ণের জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ইতিহাসে বিরল। কালোদের মধ্যে এমনকি ব্যক্তি হিসেবেও এমন কারোর অস্তিÍত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না, যে কখনো চিন্তা বা তৎপরতায় কোনো বিশিষ্টতা অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে একজনও প্রতিভাবান উৎপাদক নেই, তাদের কোনো শিল্পকলা নেই, নেই বিজ্ঞান।
তথ্যসূত্র:
৪২. প্রাগুক্ত
৪৩. প্রাগুক্ত, উপন্যাস সমগ্র, পৃষ্ঠা: ৭৮৫
৪৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৭৯৪
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৮৮৪
৪৬. প্রাগুক্ত, সাহিত্য সমগ্র, পৃষ্ঠা: ৬০৯
৪৭. Ngugi Wa Thiong’o, “The Body of Knowledge”, Decolonizing Language and Other Revolutionary Ideas, p. 18
৪৮. প্রাগুক্ত
৪৯. Aimé Césaire, Discourse on Colonialism, p. 52
৫০. Decolonizing the Mind: The Politics of Language in African Literature, p. 38
৫১. প্রাগুক্ত
