উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৫

উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ফন্ট সাইজ:

উল্লেখ্য, বিদ্যাসাগর একাধিক ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন, আর সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বহু চিরায়ত রচনা তিনি বাংলায় ভাষান্তর করেছিলেন। তথাপি, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আপন ‘জাতিভাষা’ অর্থাৎ মাতৃভাষা বাংলা চর্চার বিশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বরাবরই সচেতন ছিলেন। ওদিকে, অগ্রাধিকারভিত্তিক মাতৃভাষা চর্চার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে নগুগি যথার্থই বলেছেন, “আপনি যদি নিজের মাতৃভাষা ছাড়া, জগতের অন্য সকল ভাষাও রপ্ত করে থাকেন, তাহলে আপনি দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি রয়েছেন। অন্যদিকে, মাতৃভাষা যদি আপনার রপ্ত থাকে, আর তার সঙ্গে যদি জগতের অন্যান্য ভাষার শক্তি যুক্ত করেন, তাহলে আপনার ক্ষমতায়ন ঘটেছে।”২৯১

উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের এই শৃঙ্খল ভেঙে, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতায়নের পথে অগ্রসর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
তৃতীয়ত, আমরা বলেছি, উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়ণের জন্য গণতন্ত্রপরায়ণ জনশিক্ষার বিস্তার অপরিহার্য, আর এই জনশিক্ষার সকল স্তরে ঔপনিবেশিক ভাষার পরিবর্তে মাতৃভাষায় শিক্ষাপ্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা বৈশ্বিক ইতিহাসের নানা অভিজ্ঞতা থেকে জানি, পশ্চিমের প্রাক্তন উপনিবেশক দেশগুলোসহ, পৃথিবীর কোনো দেশই মাতৃভাষায় জনশিক্ষা বিস্তার ছাড়া নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও জাগতিক উন্নয়নসাধন নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে, উপনিবেশোত্তর উন্নয়নকামী দেশগুলোর জন্যও এই ব্যবস্থা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এখানে এটাও উপলব্ধি করা জরুরি যে, ঔপনিবেশিক ভাষার বদলে নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষাপ্রদানের ক্ষেত্রে, পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ আপন আপন দেশে নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষাদানের মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় ইতিমধ্যেই যে প্রভূত অগ্রগতি সাধন করেছে, উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার নানা পরিসরের পাঠ্যক্রমে পশ্চিমে বিকশিত সেইসব প্রাগ্রসর জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করারও কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া, সমকালীন আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার জন্যও উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষকে অনেকগুলো বিদেশি ভাষা রপ্ত করা একটি অপরিহার্য কর্তব্য হিসেবে হাজির রয়েছে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নানা বিদেশি ভাষায়
ধারণকৃত নানা ধরনের প্রাগ্রসর জ্ঞান-বিজ্ঞান দেশিভাষায় রচিত পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পথ কী? এই প্রশ্নের সর্বজনীন উত্তর হলো, অনুবাদ — প্রচুর অনুবাদ। আর তার জন্য উপনিবেশোত্তর দেশগুলোতে, প্রধানত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক যথার্থ পণ্ডিত অধ্যাপকদের নেতৃত্বে, বিশাল বিশাল অনুবাদ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট সকলেরই অপরিহার্য কর্তব্য। কেননা, উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর জন্য বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে গণতান্ত্রিক মুক্তির মহাসড়কে পৌঁছানোর এটাই হলো নির্বিকল্পপ্রাথমিক পথ।
তথ্যসূত্র:
Ngugi wa thiong’o, ‘Makers Dream’, Dcolonizing Language and Other Revolutuinary Ideas, p, 73