বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধের নাম নয়; এটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয়। রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত কিশোরদের সংঘবদ্ধ সহিংসতা, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সাইবার অপরাধ এবং হত্যাকাণ্ডের খবর নিয়মিতই শিরোনাম হচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে অন্তত ৫২টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং এবং ৬৮২ জন চিহ্নিত সদস্য রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এরা কারা? এরা কি ভিন্ন কোনো সমাজের সন্তান? না, এরা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই শিক্ষার্থী, আমাদেরই ভবিষ্যৎ। সুতরাং কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
অভিভাবক আছে, অভিভাবকত্ব নেই
আজকের অনেক পরিবারে সন্তানের জন্য সবকিছু আছে, শুধু সময় নেই। বাবা-মা সন্তানের হাতে দামি স্মার্টফোন, মোটরবাইক, গাড়ি ও সীমাহীন হাতখরচ তুলে দিচ্ছেন; কিন্তু তার মানসিক অবস্থা, বন্ধুমহল, অনলাইন কার্যক্রম কিংবা জীবনদর্শন সম্পর্কে জানার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
বিশেষ করে উচ্চবিত্ত ও ধনাঢ্য পরিবারের একটি অংশ মনে করেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই সন্তানের নিরাপত্তা। বাস্তবে এটি একটি ভয়ংকর ভুল ধারণা। অর্থ মানুষকে শিক্ষিত করতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ দিতে পারে না। সন্তানকে সম্পদ দেওয়া সহজ; চরিত্র গঠন করা কঠিন। আর সেই কঠিন দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার ফলই সমাজ আজ দেখতে শুরু করেছে।
স্মার্টফোন: শিক্ষার হাতিয়ার, নাকি অপরাধের প্রবেশদ্বার?
আধুনিক প্রযুক্তি মানবসভ্যতার অন্যতম আশীর্বাদ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি কিশোরদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
আজ একজন কিশোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সহিংস ভিডিও, গ্যাং সংস্কৃতি, মাদক প্রচারণা কিংবা অপরাধ-উৎসাহিত অনলাইন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অনেক কিশোর গ্যাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে সদস্য সংগ্রহ, শক্তি প্রদর্শন এবং সংঘর্ষ সংগঠিত করার কাজে।
শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে যদি অভিভাবক দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করেন, তবে সেটি হবে আত্মপ্রবঞ্চনা। প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো যেমন জরুরি, তেমনি তার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাও সমান জরুরি।
আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়?
বাংলাদেশে আইনের ঘাটতি নেই; ঘাটতি রয়েছে প্রয়োগে। শিশু আইন, ২০১৩ শিশুদের জন্য পৃথক বিচারব্যবস্থা, শিশু-বান্ধব পুলিশিং এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। একইভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ মাদক ব্যবসা ও সরবরাহের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছে।
কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, একজন ১৪ বা ১৫ বছরের কিশোর অস্ত্র কোথায় পায়? মাদক কোথা থেকে পায়? তার পেছনে কারা থাকে?
একজন কিশোর কখনোই অপরাধচক্রের মূল হোতা নয়। তার পেছনে থাকে মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্র সরবরাহকারী, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। তাই শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না। আইনের কঠোরতম প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে সেইসব প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে, যারা নিজেদের স্বার্থে শিশুদের অপরাধের পথে ঠেলে দেয়।
সুইজারল্যান্ডের শিক্ষা
সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো অপরাধ ঘটার পর নয়, তার আগেই ব্যবস্থা নেয়। সেখানে পরিবার, স্কুল, সমাজকর্মী, মনোবিজ্ঞানী এবং স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করে। কোনো কিশোর ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে মনে হলে তাকে দ্রুত কাউন্সেলিং, শিক্ষা সহায়তা এবং সামাজিক তত্ত্বাবধানের আওতায় আনা হয়।
তাদের নীতি স্পষ্ট: একজন কিশোরকে হারানো মানে একটি ভবিষ্যৎকে হারানো।
বাংলাদেশেও সেই উপলব্ধি জরুরি। কারণ কিশোর গ্যাং দমনে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ।
এখনই যা করতে হবে
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সেল বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও লাইব্রেরি সম্প্রসারণ করতে হবে। অভিভাবকদের ডিজিটাল সচেতনতা ও প্যারেন্টিং প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাং কার্যক্রম ও সহিংসতার বিরুদ্ধে বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কিশোরদের ব্যবহারকারী মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্র সরবরাহকারী, চাঁদাবাজ এবং পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা
কিশোর গ্যাং কোনো অপরাধ প্রতিবেদনের বিষয় নয়; এটি আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার আয়না।
আজ আমরা যদি সন্তানদের সময় না দিই, আগামীকাল আদালত ও কারাগারকে তাদের জন্য সময় ব্যয় করতে হবে। আজ আমরা যদি তাদের হাতে বই না দিই, আগামীকাল তারা অস্ত্র তুলে নিতে পারে। আজ আমরা যদি তাদের স্বপ্ন না দিই, আগামীকাল কোনো গ্যাং তাদের পরিচয় হয়ে উঠবে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই তাই কেবল অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই নয়; এটি পরিবার রক্ষার লড়াই, মূল্যবোধ রক্ষার লড়াই এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। কারণ যে জাতি তার কিশোরদের হারায়, সে একদিন তার ভবিষ্যৎও হারায়। আর যে জাতি তার তরুণদের রক্ষা করতে পারে, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তারই হয়।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।
ই মেইল: [email protected]
কিশোর গ্যাং
হারিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ, জাগবে কি বিবেক?
সহিদুল আলম স্বপন
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
২২ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার), ২০২৬, ১০ঃ০৮ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
