সময়ের সঙ্গে বদলায় যুদ্ধের ভাষা। পাল্টে যায় নিরাপত্তার অভিধানও। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে আধুনিক যুদ্ধের মানচিত্র। পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার স্বপ্ন দেখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়ায় স্থাপিত হচ্ছে মনুষ্যবিহীন আকাশযান—ইউএভি বা ড্রোন কারখানা। জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃহত্তর পরিকল্পনায় এই ড্রোন কারখানা যেন বাংলাদেশের আকাশের দিকে ওঠার একটি নতুন সিঁড়ি।
বর্তমানে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারকারী একটি দেশ থেকে ধীরে ধীরে উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও গবেষণায় সক্ষম একটি প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তির দিকে এগিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে একটি আধুনিক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও চতুর্মাত্রিক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন সরকারপ্রধান তারেক রহমান। এরই অংশ হিসেবে ড্রোন প্রযুক্তিতে দেশীয় সক্ষমতা অর্জন ও উৎপাদনে স্বনির্ভরতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামরিক প্রযুক্তিতে অগ্রসর চীন এবং দ্রুত বিকাশমান ড্রোনশিল্পের দেশ তুরস্ক বাংলাদেশের সম্ভাব্য কৌশলগত অংশীদার হতে পারে। প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদনের মাধ্যমে এমন অংশীদারত্ব বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী ও স্বনির্ভর করে তুলতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা নীতিতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বিত সক্ষমতা বৃদ্ধির যে দিকটি স্পষ্ট, বগুড়ায় ড্রোন উৎপাদনের উদ্যোগের সঙ্গে তা সরাসরি সম্পর্কিত। মাস কয়েক আগে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, ‘বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।' বগুড়ার কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে ইতোমধ্যেই অত্যাধুনিক বিমানঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা নীতির মূল দর্শন—শুধু অস্ত্র সংগ্রহ নয়, সক্ষমতা সৃষ্টি। প্ল্যাটফর্ম কেনা নয়, প্রযুক্তি বোঝা। উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি বর্তমানের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হওয়া। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বগুড়ায় ড্রোন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ কেবল একটি শিল্প প্রকল্প নয়। এটি দেশের উত্তরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি অবকাঠামো বিস্তারেরও একটি সম্ভাবনাময় বড় ক্ষেত্র। ড্রোন উৎপাদনকে আকাশ যোগাযোগব্যবস্থা, রাডার, নজরদারি প্রযুক্তি এবং তথ্য বিশ্লেষণের সঙ্গে সমন্বিত করা গেলে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেম গড়ে উঠতে পারে।
আবার ড্রোনের ব্যবহারও বহুমাত্রিক। সামরিক নজরদারি ও সীমান্ত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং মানবিক সহায়তার মতো কাজেও ইউএভি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে একটি ড্রোন কারখানা গড়ে তোলার অর্থ শুধু প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়। এর সঙ্গে বেসামরিক প্রযুক্তি ও শিল্পেরও সংযোগ তৈরি হতে পারে।
দেশেই সামরিক ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে চীনের সঙ্গে জি-টু-জি সহযোগিতায় এগিয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার বিমানবাহিনী সদর দপ্তরে বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও চায়না ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন ইন্টারন্যাশনালের (সিইটিসি) মধ্যে ‘ইউএভি ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট এস্টাবলিশমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি ট্রান্সফার অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে দেশে ড্রোন উৎপাদন, সংযোজন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্কের কারিগরি ও কৌশলগত সহযোগিতার সম্ভাবনাও জোরালো হচ্ছে। সমরাস্ত্র বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রোন, ট্যাংক ও আধুনিক ইলেকট্রনিক সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তুর্কি প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের আলোচনা চলমান।
দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী ও সময়োপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার কথা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সম্প্রতি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘যুদ্ধ করার জন্য নয়, বরং যুদ্ধ এড়ানোর জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।’ তাঁর ভাষায়, ‘শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’ দেশের আমদানি-রপ্তানি সমুদ্রপথনির্ভর হওয়ায় তিনি নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। অর্থাৎ জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষায় স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত সক্ষমতা গড়ে তোলাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের শনিবার (২৫ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নৌবাহিনীকে ‘একটি আধুনিক, ত্রিমাত্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনী’ হিসেবে আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে নৌবাহিনী প্রধান প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা শিল্পে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার পাশাপাশি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি শক্তিশালী করার দিকটিও স্পষ্ট হয়।
আকাশ প্রতিরক্ষার গুরুত্বও সমানভাবে উঠে এসেছে বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনের বক্তব্যে। কয়েক মাস আগে বৃহস্পতিবার (২১ মে) যশোরের বাংলাদেশ বিমানবাহিনী একাডেমিতে গ্রীষ্মকালীন রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘একটি বিশ্বাসযোগ্য এয়ার ডিফেন্স সক্ষমতা শুধু সামরিক শক্তির প্রতীক নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং জনগণের নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।’ ভবিষ্যৎ যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জনের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। ফলে তিন বাহিনীর প্রধানের বক্তব্যে একটি অভিন্ন দিক স্পষ্ট—আধুনিক প্রযুক্তি, দেশীয় সক্ষমতা এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করা।
সামরিক ড্রোন তৈরির ‘এলিট ক্লাবে’ আনুষ্ঠানিকভাবে নাম লেখানোর পথে যাত্রা শুরু করছে বাংলাদেশ। বগুড়ায় প্রস্তাবিত ড্রোন কারখানা বাস্তবায়িত হলে ইউএভি উৎপাদনে দেশের স্বনির্ভরতার নতুন দুয়ার খুলবে। একই সঙ্গে আকাশসীমা সুরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতায় যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। দীর্ঘসময় আকাশে অবস্থান করে গোয়েন্দা নজরদারি, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ও কৌশলগত তথ্য সংগ্রহে সক্ষম এসব ড্রোন দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য হতে পারে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যপথ, সমুদ্রসম্পদ ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সংযোগ থাকায় বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো বড় শক্তিগুলোর আগ্রহও ক্রমশ বাড়ছে। স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রসীমাতেও বাংলাদেশের অবস্থান তাই আন্তর্জাতিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এমন বাস্তবতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—‘বাংলাদেশ বন্ধু ও অংশীদার চায়, কোনো প্রভু নয়।’ তাঁর বক্তব্যের নির্যাস একা চলা নয়। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিশ্বসম্পর্ক গড়ে তোলাই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির মূল দর্শন।
ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা, আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি—এই তিনটি বিষয়ে বাংলাদেশ তাঁর সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা, কৌশলগত সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবিষ্যৎকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পথে এগিয়ে যেতে চায়। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব কৌশলগত প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অংশীদার বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে বাংলাদেশের। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুদ্ধের জন্য নয়। এটি সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিরোধ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি। তাই সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে আধুনিক, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার বিকল্প নেই।
সংসদে সরকারপ্রধান তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য-সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে এমন সক্ষমতায় উন্নীত করা, যাতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।’ সেই লক্ষ্যেই নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের পাশাপাশি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ‘পিপলস ওয়ারফেয়ার ডকট্রিন’-এর আলোকে প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—যেখানে আধুনিক সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ ও জাতীয় প্রতিরোধ শক্তিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম [email protected]
