বাংলাদেশের জন্য নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন নিছক একটি আন্তর্জাতিক সফরের আনুষ্ঠানিকতা নয়। নতুন সরকারের জন্য এটি বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক যাত্রা, উন্নয়ন ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রূপরেখা তুলে ধরার প্রথম বড় বৈশ্বিক সুযোগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথম ভাষণ সেই কারণেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
এখন নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশে ফেরার কথা রয়েছে তার। সফরের সময় সংক্ষিপ্ত হলেও কর্মসূচি বেশ বিস্তৃত। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বৈঠকের পাশাপাশি জলবায়ু, রোহিঙ্গা, স্বাস্থ্য, বৈশ্বিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এবার বাংলাদেশ কথা বলবে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারের মতো বিষয় গুরুত্ব পাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বক্তব্যের পরিধি কেবল জাতীয় রাজনীতি নয়; বরং একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে, তারও একটি ইঙ্গিত থাকবে।
এবারের সফরের বিশেষত্ব আরও একটি কারণে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি ২ জুন ২০২৬-এ ৯৯ ভোট পেয়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। জাতিসংঘের ইতিহাসে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন।
ফলে একই সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে থাকবেন। এটি দেশের বহুপক্ষীয় কূটনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত।
ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের মূল প্রতিপাদ্য—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে তাঁর ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য তৈরি, উন্নয়নশীল দেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয় রয়েছে।
এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। দেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের বাস্তবতাকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ এখন বাংলাদেশের হাতে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে জলবায়ু পরিবর্তন। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় সক্রিয়। এবার সেই অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি রয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে আয়োজিত ‘Climate Action and the Just Transition’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেবেন। পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন। সেখানে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতির অর্থায়ন এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো তুলে ধরার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশ শুধু অভিযোগ জানাতে চায় না; বরং অভিযোজন, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও ন্যায্য বৈশ্বিক রূপান্তরের আলোচনায় একটি বাস্তবসম্মত অংশীদার হতে চায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৃথক জলবায়ু পরিবর্তন উইং প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও সরকারের এই কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়।
রোহিঙ্গা সংকটও থাকবে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক অগ্রাধিকার। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি সাইড ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন। সেখানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। তাই নিউইয়র্কে বাংলাদেশের উদ্যোগের একটি ইতিবাচক দিক হতে পারে—এই সংকটকে আবারও আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের আলোচনায় সামনে নিয়ে আসা এবং দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে নতুন করে সমর্থন তৈরি করা।
সফরের আরেকটি উজ্জ্বল দিক অর্থনৈতিক কূটনীতি। প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, মেটা, ওয়াল স্ট্রিট এবং অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয় থাকবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, দেশ শুধু উন্নয়ন সহযোগিতা চায় না; বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও দক্ষতার আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বও চায়। তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
জাতিসংঘের কর্মসূচির বাইরে প্রধানমন্ত্রী একাধিক দেশের সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সূচি রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গেও বৈঠক করবেন তিনি।
এসব বৈঠক বাংলাদেশের কূটনীতিকে শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিবর্তে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের দিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতও এবার বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বার্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং দক্ষ ধাত্রীসেবা নিয়ে আয়োজিত সাইড ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। সেখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার কথা রয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; মানুষের জীবনমানের উন্নয়নও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশুর সুরক্ষা এবং তরুণদের সুযোগ তৈরি—এসবকে একই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে রাখার বার্তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
তারেক রহমানের এই সফরের আরেকটি প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। তিনি জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন।
তবে সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জও বদলেছে। আজকের বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে এবারের ভাষণের গুরুত্ব ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার পাশাপাশি ভবিষ্যৎমুখী বার্তাতেও।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্ক সফর বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগের জানালা খুলে দিচ্ছে। নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার, উন্নয়ন ভাবনা, জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি, রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রত্যাশা, সবগুলো বিষয় একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিচয়ও এখন আগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। একসময় যে বাংলাদেশকে মূলত উন্নয়ন-সহায়তার প্রাপক হিসেবে দেখা হতো, আজ সেই বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজন, শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা, তৈরি পোশাক, তরুণ জনশক্তি ও আঞ্চলিক সংযোগের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্ব এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ দুটি ঘটনাই সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্যই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব ফলও গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্কে আলোচনার টেবিলে যে বিষয়গুলো উঠবে, সেগুলো পরবর্তী সময়ে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতায় কতটা রূপ নেয়, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। কিন্তু শুরুটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ এবার বিশ্বকে যে বার্তা দিতে যাচ্ছে, তার মূল সুর হতে পারে দেশটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে, কিন্তু তার লক্ষ্য বিচ্ছিন্নতা নয়; আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব। গণতন্ত্রের সঙ্গে উন্নয়ন, অর্থনীতির সঙ্গে মানবিকতা, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বৈশ্বিক দায়িত্ব এবং জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে জলবায়ু ন্যায়বিচার—এই সমন্বিত ভাবনাই হতে পারে নতুন বাংলাদেশের বৈশ্বিক পরিচয়ের ভিত্তি।
নিউইয়র্কে তাই বাংলাদেশের সামনে শুধু বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নয়, নিজের নতুন পরিচয় তুলে ধরার সুযোগও এসেছে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠ যত বেশি আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যৎমুখী হবে, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের পরিসরও তত বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এই সফরের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক সম্ভবত এখানেই—বাংলাদেশ বিশ্বকে শুধু তার সমস্যার কথা বলতে যাচ্ছে না; একই সঙ্গে তার সম্ভাবনা, সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথাও বলতে যাচ্ছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
