মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ

ঢাবি’র সাবেক ভিসি মাকসুদসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থ্যান চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগে তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল এবং অধ্যাপক জাফর ইকবালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আমলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একইসঙ্গে অধ্যাপক মাকসুদ কামাল, অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল সহ মামলায় ৫ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শুনানি শেষে অভিযোগ আমলে নিয়ে এ পরোয়ানা জারি করেন। এর আগে ১৬ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।

এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকায় ৫ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ জনকে হত্যাচেষ্টা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে। প্রসিকিউটর এসএম মইনুল করিম ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি পড়ে শোনান। শুনানি শেষে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকা আসামিদের আগামী ২২শে অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলার ৮ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত। এ ছাড়া পলাতক অন্য আসামিরা হলেনÑ কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন।

যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে
এ এস এম মাকসুদ কামাল (সাবেক ভিসি, ঢাবি): আন্দোলন দমনে ১৪ই জুলাই রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ ও নির্দেশনা গ্রহণ। নিজ বাসায় ছাত্রলীগ নেতাদের ডেকে আন্দোলন দমনে সহায়তা, ক্যাম্পাসে অবস্থান ও কার্যক্রমের সুবিধা দেয়া। ১৫ই জুলাই হামলায় উস্কানি ও সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ। অধ্যাপক আ. ক. ম. জামাল উদ্দীন: মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের একাংশের নেতা হিসেবে ১৩ই জুলাই শাহবাগের সমাবেশে আন্দোলনকারীদের ‘সমূলে উৎপাটন করে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে মারার’ ঘোষণা দেয়া এবং পরবর্তী হামলায় উস্কানি ও প্ররোচনার অভিযোগ।

এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক (সাবেক বিচারপতি): ১৩ই জুলাইয়ের কর্মসূচিতে বলপ্রয়োগের উস্কানি এবং ১৮ই জুলাই টকশোতে আবু সাঈদসহ আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ ও ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে পুলিশের গুলির পক্ষ সমর্থন করার অভিযোগ।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল: ১৬ই জুলাই নিজস্ব ওয়েবসাইটে চিঠি প্রকাশ করে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দেয়া, নেতিবাচক মন্তব্যের মাধ্যমে সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়া এবং বলপ্রয়োগে প্ররোচনার অভিযোগ। ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ (সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, মাজহারুল কবির শয়ন ও তানভীর হাসান সৈকত): ১৪ই জুলাই রাতে ঢাবি ক্যাম্পাসে মহড়া, হুমকি ও ‘শেষ দেখে নেয়ার’ ঘোষণা দিয়ে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা। ১৫ই জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলায় সরাসরি নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ।

পাঁচজন হত্যার অভিযোগ: ১৬ থেকে ১৯শে জুলাইয়ের মধ্যে ধারাবাহিক হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় ৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়Ñ ১৬ই জুলাই শাজাহান; ১৮ই জুলাই খালিদ হাসান সাইফুল্লাহ; ১৯শে জুলাই সাইদুল ইসলাম শোভন, মো. আব্দুল ওয়াদুদ ও শাওন শিকদার। এ ছাড়া এসব হামলায় ১৫ জনকে হত্যাচেষ্টা ও বহু শিক্ষার্থীকে গুরুতর আহত করা হয়।

সাবেক সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামানসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা: এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুম, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাবেক প্রধান মো. আসাদুজ্জামানসহ ৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল। অপর তিন আসামি হলেন সাবেক পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক মো. মেজবাহ উদ্দিন আহাম্মেদ ও সাবেক এসআই তৌহিদুল ইসলাম সুমন। গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ দেন।

এই মামলায় মোট আসামি ৫। মামলায় আসামি সিটিটিসি’র সাবেক এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ গ্রেপ্তার আছেন। বাকিরা পলাতক। আগামী ২২শে অক্টোবর এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। সেদিন ইশতিয়াককে হাজির এবং পলাতক ৪ আসামিকে গ্রেপ্তার করে হাজির করতে বলা হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে মো. ফখরুল ইসলাম ও তার ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম, মো. দ্বীন ইসলাম, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, হাফেজ আবদুল্লাহ আল মামুন ও মো. সুরুজ্জামানকে সিটিটিসি’র সপ্তম তলায় গোপন বন্দিশালায় গুম করে রাখা হয়। এ ছাড়া গাজীপুর মহানগরের ইবনে মাসউদ মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল মাওলানা আবুল হোসেন আল-আমিনকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে গুম করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।