ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ/আপিল করবে উভয়পক্ষ

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ঘোষিত এই সাজাকে ‘অপর্যাপ্ত’ আখ্যা দিয়ে তা বাড়ানোর জন্য আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রসিকিউশন পক্ষ। অন্যদিকে রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আসামিপক্ষও।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার এস এম মইনুল করিম মানবজমিনকে বলেন, সংঘটিত অপরাধের ভয়াবহতা ও মাত্রা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত সাজা বাড়ানো প্রয়োজন। আইনি প্রক্রিয়া মেনে যথাসময়ে সাজা বৃদ্ধির দাবিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপিল দায়ের করা হবে। সে লক্ষ্যে ইতিমধ্যে প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। অপরদিকে ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ বলেন, আমরা রায়ের অনুলিপি হাতে পেয়েছি। রায় পর্যালোচনা করে দ্রুতই এই দণ্ডের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। এর আগে গত ৩০শে জুন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২-এর তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল যা বলেন: রায়ের শুরুতে ট্রাইব্যুনাল মামলার বিচারিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৫শে অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়া হয়। পরে ডিসচার্জ আবেদন খারিজ করে তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১০ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। আসামিপক্ষ ৯ জন সাক্ষীকে জেরা করে এবং নিজেদের পক্ষে দু’জন প্রতিরক্ষা সাক্ষী হাজির করে। এ বছর ২রা এপ্রিল থেকে ১৪ই মে পর্যন্ত ১৪ কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। ট্রাইব্যুনাল বলেন, মামলায় মৌখিক সাক্ষ্যের পাশাপাশি ভিডিও ক্লিপ, ডিজিটাল তথ্য, টেলিফোনে আড়িপাতা কথোপকথন, গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন দলিল আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব ডিজিটাল আলামতের সত্যতা, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং ফরেনসিক পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া আদালত বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন। আদালতের মতে, এসব প্রমাণ আইনসম্মতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং যথাযথ সাক্ষীর মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে এসব প্রমাণের সত্যতা নিয়ে আদালত সন্তুষ্ট।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আসামির দু’টি টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এসব কথোপকথন থেকে প্রতীয়মান হয়, আসামি নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ছিলেন না। বরং ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে কৌশলগত, সাংগঠনিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে সক্রিয়ভাবে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আন্দোলনের নেতাদের শনাক্ত করে তালিকা প্রস্তুত, রাতে গ্রেপ্তার এবং আন্দোলন দমনে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, অভিন্ন পরিকল্পনার প্রমাণ এবং উস্কানির প্রমাণ বিশ্লেষণে এসব প্রতীয়মান হয়েছে। ইনু তথ্য সংগ্রহ, বিপুলসংখ্যক সমর্থক মোতায়েন, দেশব্যাপী সমন্বিত অবস্থান গ্রহণ এবং আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসবাদ’, ‘উগ্রবাদ’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উপস্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ট্রাইব্যুনালের মতে, এসব বক্তব্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণকে বৈধতা দেয়ার উদ্দেশ্যেই হয়েছিল এবং তা উস্কানির পর্যায়ে পড়ে। রায়ে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপিত আড়িপাতা টেলিফোন কথোপকথন, সত্যতা যাচাইকৃত অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং, আসামির স্বেচ্ছায় দেয়া গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকার, রাজনৈতিক জোটের বৈঠকের কার্যবিবরণী, অন্যান্য দলিল এবং রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য একত্রে মূল্যায়ন করে ট্রাইব্যুনাল নিশ্চিত হয়েছেন যে, আসামি জেনে-শুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে ছাত্র-জনতার আন্দোলন অবৈধ উপায়ে দমনের অভিন্ন পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ট্রাইব্যুনাল বলেন, ইনু কেবল একজন নিষ্ক্রিয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ছিলেন না। তিনি সচেতনভাবে এমন একটি বয়ান প্রচার ও সমর্থন করেছেন, যেখানে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি আন্দোলনের বিরুদ্ধে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন এবং প্রকাশ্য বক্তব্য, সাক্ষাৎকার ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে ওই অভিন্ন অপরাধমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উৎসাহ ও সহায়তা করেছেন।