আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির মতবিনিময় শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। এর আগে মতবিনিময়ের মাঝপথে আলোচনা বর্জন করে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। ওদিকে সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে সংবিধান সংশোধন কমিটির মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে ব্যাখ্যাও দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ১১ দলীয় ঐক্য।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা খুব দ্রুতগতিতে এগোতে চাই। প্রতি সপ্তাহে একটি করে বৈঠকের আয়োজন করা হবে। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ আমরা আলাপ-আলোচনা শেষ করে রিপোর্ট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত করতে পারবো বলে আশা করছি। এরপর সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিল আকারে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে আসবে। বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দলকে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। এরমধ্যে ১৫টি দল তাদের প্রতিনিধি নিয়ে সরাসরি অংশ নিয়েছে। এবি পার্টি তাদের লিখিত বক্তব্য দিয়েছে এবং জাতীয় গণফ্রন্টের নেতারা পারিবারিক অসুস্থতার কারণে শেষ মুহূর্তে অংশ নিতে না পারলেও টেলিফোনে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এখনো এই কমিটিতে অংশ নেয়নি।
অর্থবছর পরিবর্তন ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: সংবিধানের কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন, বিচার, জনপ্রশাসন ও পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কারে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এরমধ্যে বাজেট বা অর্থবছর পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে এবং অপচয় রোধে সরকার জুলাই-জুনের পরিবর্তে ১লা এপ্রিল থেকে ৩১শে মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি বাস্তবায়নে সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। এ ছাড়া দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের (উচ্চকক্ষ) রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১০০ সদস্য নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে অনেক দল একমত। এটি সরাসরি জনপ্রতিনিধি দিয়ে নির্বাচিত হবে না, বরং সংসদে প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনদের নিয়ে গঠিত হবে। তবে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা এই উচ্চকক্ষের থাকবে না।
‘নোট অব ডিসেন্ট’ ও ম্যান্ডেট
জুলাই সনদে কিছু দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি বলেন, যে বিষয়গুলোতে নোট অব ডিসেন্ট ছিল, সেগুলো আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছি। জনগণের ম্যান্ডেট ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ীই আমরা সেগুলো বাস্তবায়ন করবো। বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সংস্কার চায় না, মাঠে এমন অপপ্রচার চলছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি সম্পূর্ণ অসত্য। জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, আমরা অক্ষরে অক্ষরে সেভাবেই বাস্তবায়ন করবো।
ভবিষ্যতে সংশোধনী বাতিল হওয়ার শঙ্কা নেই: সংবিধানের এই সংশোধনী ভবিষ্যতে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে না হলে আদালতে চ্যালেঞ্জ হবে বা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যাবে না, এসব ধারণা ঠিক নয়। সংবিধান কোনো সর্বকালের জন্য অপরিবর্তনশীল গ্রন্থ নয়। সমাজের চাহিদা অনুসারে তা পরিবর্তিত হয়। তিনি আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল যদি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করে এবং সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তবে তারা জনচাহিদা অনুযায়ী সংবিধানের যেকোনো বিধান পরিবর্তন করতে পারবে। পৃথিবীর অনেক দেশে শতাধিকবার সংবিধান সংশোধন হয়েছে। বিরোধী দলগুলো সংসদে না থাকলেও সংবিধান সংশোধনী বিল যখন আসবে, তখন তারা সেখানে অংশ নেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের আলোচনা বর্জন: সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠকের মাঝপথে বর্জন করেছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করার প্রতিবাদে বৈঠক বর্জন করে দলটি। রোববার বেলা আড়াইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে শুরু হওয়া মতবিনিময় সভায় যোগ দিয়ে মাঝপথে বের হয়ে আসেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দুই প্রতিনিধি। এ সময় রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলেন, এই মতবিনিময়ে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য তারা সংবিধান সংস্কারসম্পর্কিত বিশেষ কমিটিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করার প্রতিবাদ জানিয়ে বের হয়ে এসেছেন। পাশাপাশি তারা বৈঠকে একটি দাবিও তুলে ধরেছেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করার কথা বলা হয়েছিল, সেই সময়সীমা এখনো আছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হয়।
বৈঠকে অংশ না নেয়ার ব্যাখ্যা ১১ দলের: সংবিধান সংশোধন কমিটির মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে ব্যাখ্যাও দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ১১ দলীয় ঐক্য। রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের নেতা, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে মতবিনিময়ের জন্য প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তারা সংবিধান সংশোধনের কোনো উদ্যোগকে ধারণাগতভাবে সমর্থন করবেন না। সংবাদ সম্মেলনের পাশাপাশি জোটের শরিক দলগুলো বিবৃতি দিয়েও কমিটির মতবিনিময়ে অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে জানিয়েছে। দুপুরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক হাসান জুনাইদের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলটির অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট।
গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে কোনো ধরনের সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সংবিধান সংশোধনের পক্ষে নয় বরং গণভোটের রায়ের আলোকে জনগণের মতামত ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। দলটি বলেছে, গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে কিংবা তার বাইরে গিয়ে কোনো প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেয়ার প্রশ্নই আসে না।
এনসিপি’র মিডিয়া কমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাত বলেন, এনসিপি’র পক্ষ থেকে মতবিনিময়ে কেউ অংশগ্রহণ করছে না।
জামায়াত-জোটের আরেক শরিক আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)-এর সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, তার দল মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং দলের এক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। আমন্ত্রণ পেলেও মত দিতে না যাওয়ার কথা বলেছে ইসলামী আন্দোলন। দলের সহকারী মহাসচিব আহমদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত জুলাই গণভোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সরকারের ‘মনের মতো’ সংবিধান সংশোধন করার খেলায় অংশ নিতে চায় না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তাই আজকের বৈঠকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যোগ দেবে না। তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে জুলাই সনদ ও গণভোটের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংবিধান সংস্কার হতে হবে। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডিও বলেছে তারা মতবিনিময় সভায় যাচ্ছে না। জুলাই সনদ সংলাপে অংশ নিলেও তাতে স্বাক্ষর করেনি তিনটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ও বাংলাদেশ জাসদ। সংবিধান সংশোধন কমিটির গতকালের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তাদের ডাকা হয়নি। বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
