গত বছরের সেপ্টেম্বরে রিয়াদে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি জেনারেল আসিম মুনিরের কাছে বিশ্বটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। দেশটির সেনাপ্রধান সেখানে ছিলেন সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের সাক্ষী হতে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করে এই চুক্তির আয়োজন করেছিলেন তিনি।
আসিম মুনিরের কাছে বিষয়টি ছিল অত্যন্ত কৌশলগত একটি সাফল্য। নগদ অর্থের সংকটে থাকা পাকিস্তানকে সৌদি কয়েক বিলিয়ন ডলারের জরুরি বিনিয়োগ ও ঋণ দেবে। বিনিময়ে পাকিস্তান সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়। পাশাপাশি সৌদির ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী দেশটির প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তখন পাকিস্তান ধরে নিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক শিগগিরই আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম থাকবে। কিন্তু এরপর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য কার্যত যুদ্ধের আগুনে জ্বলতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে বোমা হামলা শুরু করে। পাল্টা জবাবে ইরান সৌদিসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
এরপর সৌদির সঙ্গে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনভিত্তিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের সংঘাতও দ্রুত আবার জ্বলে ওঠে। ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিও ভেঙে পড়ে। চলতি মাসের শুরুতে হুতিরা ইয়েমেনে নজিরবিহীনভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা বাড়ায় এবং সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হানে। এর জবাবে সৌদিও ইয়েমেনে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন পাকিস্তান, বিশেষ করে জেনারেল আসিম মুনিরের ওপর চাপ বাড়ছে।
এর মধ্যে গত আগস্টে সৌদির সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা চুক্তির পরিধি বাড়িয়ে তুরস্ককেও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এর নাম দেয়া হয় ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। তিন দেশই সম্মত হয়, তাদের যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
কিংস কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সিনিয়র ফেলো আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, আমি মনে করি না, আসিম মুনির ওই অঞ্চলের মুখোমুখি হওয়া হুমকিগুলো যথাযথভাবে হিসাব করেছিলেন।
সৌদির হাতে কয়েক হাজার কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের নেই। অন্যদিকে, হুতিরা কঠিন ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যোদ্ধা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি যদি হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘মক্কা চুক্তি’ সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পাকিস্তানের সামনে সেনা পাঠানো ছাড়া খুব বেশি বিকল্প থাকবে না। সৌদিতে প্রশিক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে মোতায়েন থাকা হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনাও এর আওতায় পড়তে পারেন।
প্রতিরক্ষা অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে সৌদির ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সম্প্রতি সৌদি দেশটিকে জরুরি সহায়তা হিসেবে ৮০০ কোটি ডলারের তহবিল ও বিনিয়োগ দিয়েছে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সরকারি মন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা ক্রমেই কঠোর ও আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিতে থাকেন। তারা চুক্তির প্রতি নিজেদের ‘নিঃশর্ত’ অঙ্গীকারের কথা নিশ্চিত করেন এবং সৌদিকে রক্ষায় ইসলামাবাদ ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত বলেও জানান।
তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অন্তহীন যুদ্ধে দেশটি জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দেশটির অর্থনীতি ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত। আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে জঙ্গিবাদও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি।
অনেকের আশঙ্কা, ‘মক্কা চুক্তি’ সক্রিয় হলে ইসলামাবাদ ইরানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে- এমন বার্তা যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের তেহরানে হামলার আগে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ভালো সম্পর্ক ছিল। যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় আসিম মুনির তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতেও এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়েছিলেন।
কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়েছে, পাকিস্তান ততই ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে। একই সময়ে ইসলামাবাদের ওপর তেহরানের আস্থাও অনেকটাই কমে গেছে।
আয়েশা সিদ্দিকা জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তান হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিলে এর “বড় ধরনের পরিণতি” হতে পারে।
ইরানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠী পাকিস্তানে বসবাস করে। ফলে হুতিদের ওপর হামলায় পাকিস্তান জড়িয়ে পড়লে দেশটির শিয়া জনগোষ্ঠী প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে পারে।
এদিকে আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গেও ইরানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে পাকিস্তানের অন্যতম বড় নিরাপত্তা হুমকি আরও উসকে যেতে পারে।
এতে ইরান সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের অস্থিতিশীল অঞ্চল বেলুচিস্তানের পরিস্থিতিও আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা একটি বিদ্রোহ চলছে।
পাকিস্তানের সিনেটে বিরোধীদলীয় নেতা রাজা নাসির আব্বাস বলেন, ‘মক্কা চুক্তি’তে কী কী শর্ত ও সমঝোতা হয়েছে, তা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের খুব অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউ জানেন না।
আব্বাস বলেন, পাকিস্তান যদি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহলে তা দেশের জন্য বিপর্যয় হবে। আমরা যদি এই সংঘাতে সৌদির পক্ষ নিই, তাহলে দেশ বিশৃঙ্খলা, অস্থিতিশীলতা ও ধর্মীয় বিভাজনের মুখে পড়বে।
পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে বলেন, তার মনে হয় না সৌদি যুবরাজ এখনই চুক্তিটি সক্রিয় করতে চান। তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি না, সৌদি যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া হুতিদের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে কী হবে, তা আপনি অনুমান করতে পারবেন না।
