ফুটবল বিশ্ব হারালো আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। দীর্ঘ বর্ণিল অধ্যায়ের ইতি টেনে ৮৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ইতালি ও ইন্টার মিলানের কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড স্যান্দ্রো মাজ্জোলা। আজ ১৯শে সেপ্টেম্বর তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে তারই ভালোবাসার ক্লাব ইন্টার মিলান। কাকতালীয়ভাবে, ইন্টারের ঘরের মাঠ বিখ্যাত ‘সান সিরো’ স্টেডিয়াম উদ্বোধনের শতবর্ষ পূর্তির দিনেই এই কিংবদন্তির চিরবিদায় ফুটবলপ্রেমীদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে।
১৯৪২ সালে জন্ম নেয়া মাজ্জোলা তার পুরো ১৭ বছরের পেশাদার ক্লাব ক্যারিয়ার (১৯৬০–১৯৭৭) কাটিয়েছেন শুধু ইন্টারেই। ক্লাবটির হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫৬৫ ম্যাচে ১৬২ গোল করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। নেরাজ্জুরিদের জার্সিতে তিনি চারবার সিরি আ এবং দুবার করে ইউরোপিয়ান কাপ (পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়নস লীগ) এবং দুবার ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জেতেন। ১৯৬৪ সালের ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে তার জোড়া গোল ক্লাবটিকে প্রথম ইউরোপসেরার খেতাব এনে দেয়।
ইতালি জাতীয় দলের জার্সিতে ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ৭০ ম্যাচে ২২ গোল করেন মাজ্জোলা। ১৯৬৮ সালে দেশটির ঐতিহাসিক ইউরোজয়ী দল এবং ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়া দলের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তিনি। তার গতি, সৃষ্টিশীলতা এবং কৌশলগত বুদ্ধি তাকে সমসাময়িক ফুটবলারদের ভিড়ে আলাদা করে রাখে।
ফুটবল রক্তেই ছিল মাজ্জোলার। বাবা ভ্যালেন্তিনো মাজ্জোলা ছিলেন চল্লিশের দশকের কিংবদন্তি ‘গ্র্যান্ড তুরিনো’ দলের অধিনায়ক। তিনি ১৯৪৯ সালের মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। তখন মাত্র ছয় বছর বয়স ছিল স্যান্দ্রোর। বাবা তুরিনোর আইকন হলেও দুই ভাই স্যান্দ্রো ও ফেরুচ্চিও যোগ দেন ইন্টার মিলানে। ১৮ বছর বয়সে জুভেন্টাসের বিপক্ষে স্মরণীয় সেই ৯-১ গোলের ম্যাচ দিয়ে তার মূল দলে অভিষেক হয়।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ইন্টার ও তুরিনোর ক্রীড়া পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সফল টিভি ধারাভাষ্যকার হিসেবেও কাজ করেন মাজ্জোলা। তার হাত ধরেই পরবর্তী সময়ে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও এবং উরুগুয়ের আলভারো রেকোবা সান সিরোয় আনেন।
ইন্টার মিলানের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই কিংবদন্তিকে স্মরণ করে বলা হয়, ‘স্যান্দ্রো মাজ্জোলা শুধু ইন্টারের ইতিহাসেই নন, বরং ফুটবলের ইতিহাসেই অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। ছেলেবেলায় ক্লাবে যোগ দেয়ার পর তিনি আর কখনো তা ছেড়ে যাননি।’
ফুটবল মাঠে গোঁফওয়ালা এই তারকার দ্যুতি যেমন চিরঅম্লান, তেমনি তার নিজের জীবনের শেষ ইচ্ছাও ছিল সাধারণ ও মহৎ। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আমাকে যেন একজন ভালো মানুষ হিসেবে মনে রাখা হয়, যিনি জয় অসম্ভব জেনেও লড়াই চালিয়ে যান।’ তার এই লড়াকু মানসিকতা ও বর্ণিল অবদান ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
