গত ১১ই সেপ্টেম্বর দুপুরে গুলশানে ঝটিকা মিছিল করে ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এলাকায় গণ-অভ্যুত্থানে পতন হওয়া দলটির এত বড় জমায়েত ও ককটেল বিস্ফোরণ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় দেশ জুড়ে। গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়টি উঠে আসে। সমালোচনার মুখে গুলশান জোনের ডিসি ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)কে প্রত্যাহার করা হয়। আটক করা হয় মিছিলে অংশ নেয়া প্রায় শতাধিক নেতাকর্মীকে। তবে ওই ঘটনার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তথ্য আদান-প্রদানের এক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের তথ্য বলছে- আগের দিন রাতেই সবাইকে নিশ্চিত করা হয়, মিছিলের সময়ে গুলশানের রাস্তায় কোনো পুলিশ থাকবে না। আর পরিস্থিতি খারাপ হলে তারাই ব্যাকআপ দেবে।’ আর এই তথ্য প্রকাশের পর থেকেই তোলপাড় শুরু হয়েছে।
গুলশান থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেন বলেছিলেন- শুক্রবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে গুলশান-১ এর ৩ নম্বর সড়কের একটি গলিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১৫০-২০০ নেতাকর্মী জড়ো হন। মিছিলের চেষ্টা করেন। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে মিছিলকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশের দিকে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দু’টি রাবার বুলেট ছুড়ে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
তবে তথ্য-উপাত্ত বলছে- ভিন্ন কথা। সেদিন মিছিলের পুরোটাই ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। কবে, কখন, কোথায় সবাই জড়ো হবে, মিছিল কোন পাশ থেকে বের হবে, কোথায় শেষ হবে, পরিস্থিতি খারাপ হলে কি করতে হবে- সব কিছুই আগে থেকে নির্ধারিত ছিল। এমনকি ঠিক কখন পুলিশ থাকবে না সেই সময়টাও নেতাকর্মীদের আগে থেকে নিশ্চিত করে দেয়া হয়। ‘এডুকেশন বিডি’ নামে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দ্বারা পরিচালিত একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, ১০ই সেপ্টেম্বর সকাল ১১টা ৩৪ মিনিটে সাদিক নামে এক ব্যক্তি বলছেন- ‘আমি সব ম্যানেজ করে নিবো।
এখানে সবাই নেতা, ভয়ের কিছু নেই।’ এরপর রাত ৮টা ৪২ মিনিটের দিকে ওই একই গ্রুপে ইমরান নামে এক ব্যক্তি লেখেন, ‘রাস্তা খালি থাকলেই হবে।’ তার লেখার প্রেক্ষিতে আরেক ব্যক্তি লেখেন- ‘শেষ’। ইমরান লেখে- ‘হুমম’। একই সময় আরেক ব্যক্তি লেখেন- ‘কি সিদ্ধান্ত হলো ভাই।’ এরপর রাত ৮টা ৫১ মিনিটের দিকে আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও দলীয় পতাকার ছবি দিয়ে গ্রুপটিতে লেখা হয়- ‘ওয়েস্টিনের সামনে সবাই। সকাল ১১টা বরাবর। না থাকলে কমিটিতে নাই। দলের এই সময় সাহসীদের সামনে দরকার। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।’ এই লেখার পরই বেশ কয়েকজন ‘জয়বাংলা’ লেখেন। ঠিক রাত ১টা ৪০ মিনিটের দিকে গ্রুপটিতে আরেকজন লেখেন, ‘নামাজের আগে পুলিশ থাকবে না, ফাইনাল। অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা হলে রোডের ভেতরে চলে যাবো। পুলিশ আমাদের ব্যাকআপ দিবে। কাউকে ফাঁসানো যাবে না। আমরা সবাই মুজিব সেনা।’ তখন তাকে সমর্থন দিয়ে অনেকেই লেখে ‘ইনশাআল্লাহ’, ‘জয়বাংলা’। অর্থাৎ ১১ই সেপ্টেম্বর দুপুরে গুলশানে আওয়ামী লীগের বের করা ঝটিকা মিছিলের সময়ে যে পুলিশ থাকবে না তা আগের দিনই নেতাকর্মীদের নিশ্চিত করা হয়। গ্রুপে লেখা নির্দিষ্ট সময়েই অর্থাৎ সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকেই দুই থেকে তিনশ’ লোকের মিছিল হয় গুলশানে।
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অভ্যন্তরীণ তথ্য বলছে, ঘটনার দিন গুলশান এলাকার যে যে স্পটে পুলিশের টহল গাড়ি থাকার কথা ছিল সেখানে পুলিশ ছিল না। থানা পুলিশের তথ্যমতে, অন্যান্য দিনের মতো গুলশান-১ থেকে গুলশান এভিনিউ হয়ে পিংকসিটি, নিকেতন পর্যন্ত তিনটি স্পটে অন্তত তিন থেকে চার ইউনিট পুলিশ থাকার কথা ছিল। সেখানে মাত্র একটি ইউনিট বাদে বাকি দুই ইউনিটকেই পাঠানো হয় প্যারেডে। খোদ থানা পুলিশের ভাষ্য, সেসময়ে পুরো গুলশান এলাকার দায়িত্বে ছিল একটি মাত্র পুলিশ ইউনিট। তারাও ছিল সুবাস্তুর সামনে। সেখান থেকে মিছিলের স্থানে পুলিশ আসতে বেশ কিছুক্ষণ সময় ক্ষেপণ হয়। বাকি পিংকসিটি আর এভিনিউতে যেই টিম থাকার কথা ছিল তারা সেখানে ছিল না। এ ছাড়াও একজন এসআইয়ের দায়িত্ব ছিল- সাদা পোশাকে নজরদারি রাখা। তিনিও দায়িত্ব পালন না করে ছিলেন নিজ বাসায়। ওই পুলিশ সদস্য বলেন, গুলশানে নামাজকেন্দ্রিক ডিউটি ছিল আমার। নামাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তার অনেক আগেই মিছিল বের হয়। সকালে। ১১টার দিকে। সেসময়ে আমার কিছু করার ছিল না। তবে এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্যই করতে রাজি হননি তৎকালীন গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেন ও গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদ। বর্তমানে তাদের দু’জনকেই প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে সদরদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এসব বিষয় নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আক্তার হোসেন বলেন, এই ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। অনেকের রিমান্ডও মঞ্জুর করেছে আদালত। পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের পরে এই বিষয়ে জানানো হবে।
উল্লেখ্য, গত ১১ই সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের মিছিলের ঘটনায় গুলশান থানার এসআই মো. মাহবুব হোসাইন বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১১৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৮০ থেকে ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১১ই সেপ্টেম্বর সকালে গুলশানের মিছিলে সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়া হয়। ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ছত্রভঙ্গ করতে গেলে পুলিশকে লক্ষ্য করেও ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি ককটেল উদ্ধারসহ দু’জনকে আটক হয়। ওই মামলার পর প্রথমে ৩২ জন, পরে আরও অর্ধশত ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্যে অন্তত ২৪ জনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
