বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয়ে দুই প্রধান বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই একক দেশ হিসেবে সর্ববৃহৎ বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি ও উল্লম্ফন দেখা গেলেও, ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বড় ধরনের পতন ঘটেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য পর্যালোচনা করে বাজারে এমন বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১১.৪২% বৃদ্ধি পেয়ে ১৬১ কোটি ২৯ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। কেবল আগস্ট মাসেই এই বাজারে রপ্তানি বাড়ে ২৫.৬৫%। আগামীতে আরও ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে বলে আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপে দেখা দিয়েছে নেতিবাচক প্রবণতা। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহে ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শ্লথগতির প্রভাবেই ইউরোপের মতো বৃহৎ বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও ভারতের বাজার অংশীদারিত্ব বাড়ায় সেখানে বাংলাদেশ কিছুটা পেছনে পড়েছে বলে জানান খাতসংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন ক্রয়াদেশ বাড়ায় সাময়িক বড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে উল্লম্ফন: যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি গত আগস্টে একক মাস হিসেবে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই মাসের তুলনায় আগস্টে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৫.৬৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৮১৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত অর্থবছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল ৬৫০.৩৪ মিলিয়ন ডলার। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে মোট ১.৬১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১১.৪২ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির মাসিক গড় দাঁড়িয়েছে ৮০৬.৪৬ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট রপ্তানিকে ১২ মাসের সমান গড় হিসেবে ধরলে মাসিক গড় ছিল ৬৪৫.৩৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, চলতি অর্থবছরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানির মাসিক গড় গত অর্থবছরের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের এই বাড়তি গতি মূলত আগস্টের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির কারণে। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৫.৬৫ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯.০৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪.০৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে তৈরি পোশাক থেকেই এসেছে ৭.৭৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্য থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ১.৩০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি রয়েছে।
পোশাকের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্য, টেক্সটাইল ও সুতা, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল পণ্য, জুতা ও অন্যান্য শিল্পপণ্য। এসব পণ্যের পাশাপাশি তৈরি পোশাকের উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোরও সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, শীতকালীন পোশাকের অর্ডারের কার্যাদেশ দেয়ার শেষ সময় হওয়ায় গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের একটি অন্তর্নিহিত সক্ষমতা রয়েছে। এ কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কাজে লাগাচ্ছেন। প্রয়োজনমতো জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকারের নীতি-ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে এই সুযোগ আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বর্তমানে যে গতিতে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি হচ্ছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এই গতি আগামী ১২ মাস অব্যাহত থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ইউরোপে রপ্তানি বেশি কমেছে: চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ১ হাজার ৩৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। এটি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩.৬৫ শতাংশ কম। ইইউতে অন্য কোনো দেশের রপ্তানি এতটা কমেনি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩.৩২ শতাংশ কমেছে তুরস্কের। ভারত ও পাকিস্তানের কমেছে যথাক্রমে ১২.২৪ ও ১১.৮১ শতাংশ। কম্বোডিয়ার কমেছে ৬.৬৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভিয়েতনামের, ৩.৯২ শতাংশ। চীনের বেড়েছে ১.৮৯ শতাংশ। বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমে যাওয়ার চিত্রটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিসের (ইউরোস্ট্যাট) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৫ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে ইইউয়ের বিভিন্ন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ১০ শতাংশ কম।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক; মোট রপ্তানির আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে।
অন্যদিকে এই সাত মাসে ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে ২৫৫ কোটি ১৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই তথ্য বলছে, সামগ্রিকভাবে ইইউ’র ব্যবসায়ীরা তৈরি পোশাক কেনা কমালেও চীন ও ভিয়েতনাম থেকে বাড়িয়েছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো। ইইউ’র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দেশ থেকে গড়ে যে তৈরি পোশাক কেনা কমিয়েছেন, তার তুলনায় বাংলাদেশ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ কম কিনেছেন। এই বাজারে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ ১ হাজার ৩৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছিল ১ হাজার ২০১ কোটি ২১ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক। এ হিসাবই বলছে, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩.৬৫ শতাংশ।
