স্থানীয় নির্বাচন

জামায়াত প্রস্তুত, মাঠ গোছাচ্ছে এনসিপি

ফন্ট সাইজ:

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আলাদাভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে ১১ দলীয় জোটের প্রধান দুই দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জাতীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নিলেও স্থানীয় নির্বাচনে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দল দু’টির প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে জামায়াত। দলীয় সূত্র বলছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রার্থী বাছাই শেষ হয়েছে। উপজেলা, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিভিন্ন পর্যায়েও ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের মতো প্রার্থী প্রস্তুত। এরই মধ্যে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে তাদের মাঠে কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। ঢাকাসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদেও প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে দলটি।

এদিকে, এনসিপিও স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে ধাপে ধাপে প্রার্থী ঘোষণা করছে। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ রাজশাহী, বরিশাল ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনেও প্রাথমিকভাবে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ৫০০ উপজেলা ও ৩৩০ পৌরসভা থেকে এক হাজারের বেশি আবেদন পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করে প্রথম ধাপের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। দ্বিতীয় ধাপেও আরও প্রার্থীর নাম ঘোষণার প্রস্তুতি রয়েছে।

জামায়াত ও এনসিপি’র সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পৃথকভাবে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে, পৃথকভাবেই নির্বাচনের কথা বলা আছে। স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিটি এলাকায় জোটের পক্ষ থেকে একজন প্রার্থী ঠিক করা বাস্তবে কঠিন। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। প্রত্যেক প্রার্থীই স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সমীকরণ, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

জামায়াতের নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, অতীতেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটগতভাবে হয়নি। সব দলই আলাদাভাবে অংশ নিয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক এলাকায় প্রার্থী নিয়ে সমঝোতা করা কঠিন। উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে স্থানীয় নেতারা পরিস্থিতি বিবেচনায় সমঝোতার ভিত্তিতে প্রার্থী দিলে কেন্দ্রের আপত্তি থাকবে না।
স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি’র বড় পরীক্ষা হতে পারে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন। উত্তরে এনসিপি’র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরে জামায়াতের ঢাকা মহানগর আমীর সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে ডাকসু’র ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করেছে দলটি।

এনসিপি’র একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনও জোটগতভাবে করার বিষয়ে দলটির আগ্রহ রয়েছে। জামায়াতের আগ্রহ তুলনামূলক কম। এ কারণে কৌশলের অংশ হিসেবে ঢাকার সিটি নির্বাচনে প্রার্থী ও ভোটার এলাকার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সূত্র জানায়, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের মতামত, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সততা ও এলাকায় গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনী সমীকরণ বিবেচনায় প্রয়োজনে প্রার্থী পরিবর্তনের সুযোগও রাখা হয়েছে।

সারা দেশকে ১৪টি সাংগঠনিক অঞ্চলে ভাগ করে ১৪ জন নেতাকে অঞ্চল পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে জামায়াত। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছেন তারা।
জামায়াত, এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শরিকরা স্থানীয় নির্বাচনে পৃথকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তা যেন রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ না নেয়, সে বিষয়েও কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে সমন্বয়ের চিন্তা রয়েছে। জোট সূত্রের দাবি, প্রার্থী আলাদা হলেও রাজনৈতিক ঐক্য অটুট থাকবে।

সরকার বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্থানীয় নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হলে তা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করার বিষয়েও শরিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকবে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মানবজমিনকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনের জন্য আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ প্রার্থী ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলায় আমরা ঘোষণা দিয়ে দিয়েছি। যারা মাঠে কাজ করছেন, সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর প্রার্থী-প্রায় জায়গাতেই আমাদের প্রার্থী ঠিক হয়ে গেছে। কিছু বাকি আছে, সেগুলোও হয়ে যাবে। নিয়মিত আমরা তাদের কাজ মনিটরিং করছি এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছি।

নির্বাচন বর্জনের আশঙ্কা প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা নির্ভর করবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আচরণের ওপর। আমরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছি, তাদের সঙ্গে মিটিং করেছি এবং বেশ কিছু বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু মনে হচ্ছে, অদৃশ্য একটা ইশারায় তারা কিছু কাজ করছে। যেমন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারেন, কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনে সুযোগ দেয়া হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, যদি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাটা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে না থাকে এবং তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবো।

এনসিপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্য ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার মানবজমিনকে বলেন, প্রথম দফা প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে, দ্বিতীয় দফা ঘোষণা করব। যেখানে যেখানে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কাজ শুরু করে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অলরেডি প্রার্থীরা কাজ শুরু করেছেন। আর যেখানে প্রার্থী দেয়া হয়নি, সেখানে প্রার্থী দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। জোটে থাকার কারণে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না।