গ্যাস নিয়ে সুখবর, আরও বাড়ছে সরবরাহ

গ্যাস নিয়ে সুখবর, আরও বাড়ছে সরবরাহ

ফন্ট সাইজ:

দেশে গেল সপ্তাহ থেকেই ধীরে ধীরে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ছে। এতে শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসন গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এদিকে, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের নতুন ২৮ নম্বর কূপ থেকে আজ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। যা গ্যাসের চলমান সংকটের মধ্যে একটি নতুন সুখবর। এছাড়া আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ কূপ থেকে আরও ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে নতুন করে সরবরাহ বাড়ানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল)-এর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিতাসের ২৭টি কূপ থেকে আগের থেকেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করে আসছে। বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন কূপ খনন ও বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল হিসেবে এ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব মানবজমিনকে বলেন, নতুন করে তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ থেকে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে শনিবার থেকে যুক্ত হচ্ছে। এটা আপতত সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে সংকটের মধ্যে আমাদের জন্য এটা যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ থেকে ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন গ্যাস পাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

এদিকে, বিজিএফসিএল’র কর্মকর্তারা জানান, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে আজ শনিবার জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। যা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উদ্বোধন করা কথা রয়েছে। এছাড়া আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ কূপ থেকে আরও ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মকর্তারা জানান, তিতাস-২৮ কূপ খনন কাজ শেষ হয়েছে। তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ কূপ খননের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে মোট প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বিজিএফসিএল’র মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, বিজিএফসিএল’র আওতাধীন তিতাস-২৮ নম্বর কূপ শনিবার উদ্বোধনের পরপরই কূপটি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। এতে আমদানি-নির্ভরতার চাপ কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। তিতাস ও কামতা ফিল্ডে ৪টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী একেএম জসীম উদ্দিন বলেন, তিতাস-২৮ নম্বর কূপের খননকাজ প্রায় এক মাস আগে শেষ হয়েছে। কূপটির গভীরতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। উদ্বোধনের পরপরই এটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাসসহ বেশ কয়েকটি কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। অন্য কূপগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজিএফসিএল’র গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানান, তিতাস-৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপের খননকাজ গত ১৯শে এপ্রিল শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কূপটির খনন গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৯২০ মিটারে পৌঁছেছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৫ হাজার ৬০০ মিটার, যা প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে। তিনি বলেন, গভীরতার কারণে কূপটির খনন ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে। কোনো ধরনের ভূতাত্ত্বিক জটিলতা দেখা না দিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ করার আশা রয়েছে। কূপটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

তিনি জানান, তিতাস-২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে কূপটির লগিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চলছে। এসব কাজ শেষ করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। তিতাস-২৯ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া তিতাস-৩০ নম্বর কূপের কাজও আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কূপটি থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বিজিএফসিএল।

বিজিএফসিএল’র কর্মকর্তারা জানান, তিতাস-৩১ এর কাজ শেষ হওয়ার পর বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ১১ নম্বর গভীর কূপের খননকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৪ হাজার ৫০০ মিটার, যা প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে। সফলভাবে খনন ও পরীক্ষা সম্পন্ন হলে বাখরাবাদ-১১ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

এদিকে, পেট্রোবাংলা সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় দেশীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত গ্যাসের পাশাপাশি আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। ১৫ই সেপ্টেম্বরের আগের তুলনায় দেশে এখন দিন দিন গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতিতে ইতিবাচক অগ্রগতি ঘটেছে। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, ১৪ই সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রিডে রাত ১০টার দিকে ২ হাজার ৫৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এরমধ্যে দেশীয় উৎপাদন থেকে ১ হাজার ৬০২ মিলিয়ন ঘনফুট এবং কক্সবাজারের এলএনজি টার্মিনাল থেকে দেয়া হয় ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। পরের দিন একই সময় ২ হাজার ৬২৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এতে আগের দিনের তুলনায় ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বৃদ্ধি পায়। এরমধ্যে দেশীয় উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৬১৬ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি টার্মিনাল থেকে এসেছে এক হাজার ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। গতকাল বিকাল ৪টায় দেশে গ্যাসের সরবরাহ আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট। এরমধ্যে দেশীয় উৎপাদন থেকে এসেছে ১ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন এবং এলএনজি টার্মিনাল থেকে এসেছে এক হাজার ২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শাসমুল আলম এ ব্যাপারে মানবজমিনকে বলেন, এসব উদ্যোগ বা কর্মসূচি ইতিবাচক তখনই হবে যখন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে কর্মসূচি নেয়া যাবে। জ্বালানি সেক্টরে লুণ্ঠন দূর করতে না পারলে এরকম বহুমুখী কর্মসূচিতেও কাজে আসবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।