বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) গতকাল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল)-এ দুর্নীতির অভিযোগে দু’জনকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে। বিপিএলের ১২তম আসরের দল চট্টগ্রাম রয়্যালসের সাবেক স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাইয়ুম এবং ১১তম আসরের দল দুর্বার রাজশাহীর কর্মকর্তা আমিন খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন বিধিমালার চারটি ধারা লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তিমূলক প্রক্রিয়ায় চার্জ গঠন করা হয়েছে। আমিন সবশেষ আসরে চট্টগ্রাম রয়্যালসেরও কর্মকর্তা ছিলেন। অন্যদিকে কাইয়ুম ক্রিকেটারদের পাওনা পরিশোধ না করে টুর্নামেন্ট শুরুর প্রাক্কালে মালিকানা ছাড়েন এবং ব্যবহৃত মুঠোফোন জমা না দিয়ে তদন্তকাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আমিন খানের বিরুদ্ধে খেলোয়াড়দের দুর্নীতিতে প্ররোচিত করা এবং যোগাযোগের প্রমাণ ও বার্তা মুছে ফেলে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের জেনারেল কাউন্সেলর ব্যারিস্টার মাহিন এম রহমান বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা দুজনের বিরুদ্ধেই সুনির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী চার্জ গঠন করেছি। সম্পূর্ণ জানা সত্ত্বেও ফিক্সিং সংক্রান্ত তথ্য তারা গোপন করেছেন এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। উপরন্তু, তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলামত নষ্ট করেছেন এবং তদন্তে সম্পূর্ণ অসহযোগিতা করেছেন। এসব সুনির্দিষ্ট বিধিলঙ্ঘনের কারণেই তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কার্যধারা শুরু করা হয়েছে।’
বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিট কাইয়ুম এবং আমিন খানকে অভিযোগের আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়ার জন্য ১৪ দিন সময় বেঁধে দিয়েছে। নোটিশ জারির পর থেকেই এই দুই কর্মকর্তার জবাব দাখিলের সময় গণনা শুরু হয়েছে। তারা অভিযোগের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পূর্ণ সুযোগ পাবেন। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না এলে বোর্ড নিজস্ব ট্রাইব্যুনালে গিয়ে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এই সময়সীমা ও সমঝোতামূলক শাস্তির বিধান নিয়ে ব্যারিস্টার রহমান বলেন, ‘অভিযুক্তরা যদি স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার করেন, তবে সমঝোতামূলক শাস্তির (এগ্রিড স্যাংশন) ক্ষেত্রে তা নমনীয়ভাবে দেখার আইনগত সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই ১৪ দিনের মধ্যে সাড়া দিতে ব্যর্থ হলে তাদের অনুপস্থিতিতেই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। আমাদের ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রক্রিয়া এখন চলমান। যারা দায় স্বীকার করবেন না, তাদের বিচার ও শাস্তির বিষয়টি ট্রাইব্যুনালেই চূড়ান্ত হবে।’ বিসিবির দুর্নীতি দমন ইউনিট এর আগেও ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্মকর্তা ও ক্রিকেটারদের অনিয়মের বিরুদ্ধে বিস্তৃত তদন্ত পরিচালনা করেছে। চলতি মাসের শুরুতেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে বিসিবির সাবেক পরিচালক মোখলেছুর রহীমসহ তিনজন নিষিদ্ধ হন। অন্য দুজন হলেন সাবেক লিয়াজোঁ কর্মকর্তা জাকির হাসান এবং অডিট কমিটির সাবেক সদস্যসচিব রাকিবুল ইসলাম সানি। ফিক্সিং ও তদন্তে অসহযোগিতার কারণে বিসিবি তাঁদের সব ধরনের ক্রিকেটীয় কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার নির্দেশ দেয়। এর আগে আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হলে অনেকেই অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত ও দায় স্বীকারের প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে রহমান বলেন, ‘শাস্তির বিষয়টি মূলত এভাবেই কার্যকর হয়েছে।
তারা সমঝোতামূলক ব্যবস্থার (এগ্রিড স্যাংশন) পথ বেছে নিয়েছেন। অপরাধের দায় স্বীকার করায় পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতেই তাদের ওপর এই শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে।’
বিপিএলে ফিক্সিংয়ের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিচারের স্বার্থে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বিসিবি। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ১৪ দিনের মধ্যে জবাব না দিলে তাঁদের অনুপস্থিতিতেই এই বিচারকাজ পরিচালিত হবে, যেখানে দুর্নীতির সব তথ্য, প্রমাণ ও নথিপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। ক্রিকেট বোর্ডের সংবিধিবদ্ধ বিধিতেই এমন স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রূপরেখা, বিচারক প্যানেল ও চেয়ারম্যান নিয়োগ প্রসঙ্গে মাহিন রহমান বলেন, ‘এই ট্রাইব্যুনালকে আপনারা মূলত একটি আলাদা ও স্বতন্ত্র আদালত হিসেবেই বিবেচনা করতে পারেন। আমাদের নিজস্ব আইন মেনেই এটি গঠন করা হচ্ছে, যেখানে একটি বিচারক প্যানেল এবং একজন চেয়ারম্যান থাকবেন। ট্রাইব্যুনাল গঠনের সার্বিক প্রক্রিয়া এখন বাস্তবায়নাধীন এবং খুব দ্রুতই এটি সবার সামনে দৃশ্যমান হবে।’ বিসিবি নিশ্চিত করেছে যে কাইয়ুম এবং আমিন খান আত্মপক্ষ সমর্থনের সবরকম আইনি সুযোগ পাবেন। উত্থাপিত অভিযোগের বিপরীতে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ নেই বলে দাবি থাকলে তাঁরা ট্রাইব্যুনালের সামনে নিজেদের যুক্তি ও বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন। জবাব না এলে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই শাস্তি
চূড়ান্ত করবে বোর্ড। ফিক্সিংয়ের এই ঘটনায় সার্বিক শুনানির পরই ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করবে। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অধিকার ও ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যারিস্টার রহমান বলেন, ‘কেউ অভিযোগ স্বীকার না করলে পাল্টা প্রমাণের দায় স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ওপর বর্তাবে। আর সে জন্যই তাঁদের এই ১৪ দিনের মধ্যে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগটি দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক জবাব দাখিলের পর পরবর্তীতে গঠিত ট্রাইব্যুনালেও তারা নিজেদের স্বপক্ষে সবরকম যুক্তি ও বক্তব্য উপস্থাপনের পূর্ণ অধিকার পাবেন।’
