প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র ফিজি। সমুদ্রের কোমল ঢেউ প্রতিনিয়ত দেশটির পা ধুইয়ে দিচ্ছে। শান্ত, স্নিগ্ধ দেশটিকে দেখলে যেকারো মোহ হতে পারে। কিন্তু সেখানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মরণব্যাধি এইডস সংক্রমণের। পরিস্থিতি এত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকার সেখানে এইডস সৃষ্টিকারী এইচআইভি বিষয়ক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। সরকারি হিসাবে, ফিজিতে বর্তমানে প্রতি ৬০ জন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত। অন্তঃসত্তা প্রতি ৫০ জন নারীর মধ্যে একজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী একে ‘মহামারি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এ খবর দিয়ে অনলাইন গার্ডিয়ান বলছে, এইচআইভি সংক্রমণের হঠাৎ বৃদ্ধি এবং এর সঙ্গে মেথামফেটামিন ব্যবহারের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে জাতীয় এইচআইভি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে ফিজি।
দেশটির স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা বিষয়ক মন্ত্রী ড. রাতু আন্তোনিও লালাবালাভু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন, পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় নেয়া পদক্ষেপ দিয়ে আর সংকট সামাল দেয়া সম্ভব নয়। তিনি এটিকে একটি ‘মহামারি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমি আনুষ্ঠানিকভাবে ফিজিতে জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছি। এই সিদ্ধান্ত মহামারির ভয়াবহতা এবং বর্তমানে আমাদের দেশের যে জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেটিকে স্বীকৃতি দেয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে ফিজির প্রতি ৬০ জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগে এই হিসাব ছিল প্রতি ১৬৭ জনে একজন। ২০২৫ সালে আমরা নতুন করে ২ হাজার ৬০টি এইচআইভি সংক্রমণ শনাক্ত করেছি।
তিনি আরও জানান, দেশটিতে প্রতি ৫০ জন গর্ভবতী নারীর একজন এইচআইভিতে আক্রান্ত। তিনি বলেন, ৯ই সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভার নেয়া সিদ্ধান্তের পরই জরুরি অবস্থা ঘোষণার সিদ্ধান্ত আসে। এর ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হবে। ১০ লাখেরও কম জনসংখ্যার দেশ ফিজিতে নতুন এইচআইভি সংক্রমণ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের এইডসবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডস। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটিতে নতুন এইচআইভি সংক্রমণ ১২ গুণ বেড়েছে। মাদক পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ফিজির অবস্থান এবং দেশটির অভ্যন্তরে মেথামফেটামিনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এইচআইভির দ্রুত বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। নিরাপত্তাহীনভাবে মাদক ইনজেকশন নেয়া এবং পরিষ্কার সুচের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কলঙ্ক এবং পর্যাপ্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগের অভাব সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, ফিজিতে যেসব এইচআইভি সংক্রমণের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ধরন জানা গেছে, তার অর্ধেকেরও বেশি যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে হয়েছে।
আর ৪২ শতাংশের বেশি সংক্রমণের সঙ্গে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ফিজিতে প্রায় ৯ হাজার ১০০ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ জানতেন যে তারা এইচআইভিতে আক্রান্ত। আর মাত্র ২২ শতাংশ অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ইউএনএইডসের নির্বাহী পরিচালক উইনি বিয়ানইমা বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, ফিজির পরিস্থিতি বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে এইডস এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তিনি বলেন, এইচআইভির মহামারি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই দেশগুলোর এমন স্বাস্থ্য ও কমিউনিটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে প্রস্তুত থাকে। ফিজি এই মুহূর্তের জরুরি প্রয়োজনটি উপলব্ধি করেছে এবং তাদের কার্যক্রম জোরদার করছে।
ইউএনএইডস জানিয়েছে, ফিজিতে সুচ ও সিরিঞ্জ সরবরাহ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাকে তারা স্বাগত জানায়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের প্রস্তাব শিগগিরই দেশটির পার্লামেন্টে তোলা হতে পারে। এর পাশাপাশি এইচআইভি প্রতিরোধ, পরীক্ষা এবং চিকিৎসার সুযোগ আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগকেও স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাটি।
