শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় ব্যবসায়ীদের স্বস্তি

শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় ব্যবসায়ীদের স্বস্তি

ফন্ট সাইজ:

দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকট কাটিয়ে দেশের শিল্প খাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৃশ্যমান গতি ফিরতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও এর আশপাশের শিল্পাঞ্চলসহ 
গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা। যদিও সাভারের আশুলিয়াসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট পকেটে সংকট পুরোপুরি কাটতে সামান্য সময়ের প্রয়োজন, তবে অধিকাংশ শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বাড়ায় ব্যবসায়ী ও কারখানা মালিকদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

কয়েক মাস ধরে সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল। ফলে অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হন মালিকরা। সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর কারণে চাপ বাড়তে শুরু করেছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হবে। টেক্সটাইল, ডাইং ও নিটওয়্যার খাতের মালিকরাও উৎপাদনের গতি বাড়ায় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী নেতারা স্বাগত জানিয়ে বলছেন, শিল্পের গতি বজায় রাখতে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য জাতীয় গ্রিডে নিজস্ব গ্যাসের সন্ধান ও উত্তোলন জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বৃহত্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহে গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, আশা করছি পরিস্থিতি খুব দ্রুত আগের মতো হবে। আগের মতো মানে গত জুলাই মাসে যে রকম ছিল।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) নাহিদ আলম বলেন, আমাদের সরবরাহ গত কয়েকদিন ধরেই বাড়ছে। বুধবার আরও বেড়েছে। এখন কোনো এলাকায় অভিযোগ নাই।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় গ্যাস সরবরাহ হয় ২৩৬ কোটি ৯৫ লাখ কোটি ঘনফুট। আগের দিন মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ হয় ২৩১ কোটি ৪৮ লাখ ঘনফুট। গত সোমবারে তা ২৩২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট ও গত রোববার সরবরাহ হয় ২২৭ কোটি ১৩ লাখ ঘনফুট।

নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের শিল্প এলাকাগুলোতে ইতিমধ্যেই গ্যাসের চাপ (পিএসআই) বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়েছে। ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের পাইপলাইনে দীর্ঘদিনের ঘাটতি কাটিয়ে স্বাভাবিক চাপ পৌঁছাতে ১-২ দিন সময় লাগলেও বুধবারের মধ্যে অধিকাংশ কারখানায় পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফিরবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা ড. মাহ্‌দী আমিন বুধবার এক ব্রিফিংয়ে জানান, ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী যে দ্রুততম সময়ে গ্যাস সংকট সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা কার্যকর হতে শুরু করেছে। সরকারের পদক্ষেপের ফলে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হওয়ায় এখনো কিছু ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতে কার্গো পৌঁছানো শেষ হলে এবং বিতরণ লাইনে সমন্বয় সম্পন্ন হলে সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে।

অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইনামুল হক খান বলেন, আগের থেকে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। যদি আগামী কয়েক দিনে স্বাভাবিক হয়ে যায় তাহলে লোকসান কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এ ছাড়া ক্রেতাদের সেই নিশ্চয়তা দিতে পারলে রপ্তানি বাড়বে।
বস্ত্র খাতের কারখানা এপেক্স স্পিনিংয়ের কোম্পানি সচিব দেলোয়ার হোসেন বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকেই চাপ বেশি পাচ্ছি। এখনো সব ঠিক আছে। আশা করি, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এটি হলেই ক্রেতাদের নিশ্চয়তা দিতে পারবো, তারা প্রতিদিন খোঁজ খবর নিচ্ছেন গ্যাস পরিস্থিতির।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত কয়েকদিনের তুলনায় বুধবার নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। সরকার যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে, খুব দ্রুত সবকিছুই স্বাভাবিক হবে।
গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকার কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ বাড়ছে। কোনো লোডশেডিং নাই। কিন্তু সাভারের কয়েকটি এলাকায় এখনো কিছুটা সমস্যা আছে, আশা করছি রাতের মধ্যে তারাও গ্যাস অন্যান্য এলাকার মতো পাবে।

সিইপিজেডের কারখানা ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কর্নফুলী ইপিজেড এলাকার কারখানাগুলো এই দুর্যোগের সময়ে ততটা ভুগতে হয়নি। গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় আমরা আশা করছি, অন্যান্য এলাকার পরিস্থিতিও কেটে যাবে।
এবারের গ্যাস সংকটে ইপিজেডের বাইরে বিশেষ করে গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের শিল্পকারখানা ভুগেছে সবচেয়ে বেশি। এসব অঞ্চলের কারখানার উৎপাদন কমে সক্ষমতার ৪০ শতাংশে নেমে যায়। গ্যাস সংকটে নতুন ক্রয়াদেশ হারিয়েছে সবচেয়ে বেশি বস্ত্র, ডাইং ও স্পিনিং খাত বলে দাবি রপ্তানিকারকদের।

বিজিএমইএ’র পরিচালক ও চট্টগ্রামে অবস্থিত এইচকেসি অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, পরিস্থিতি ভালো হয়েছে। আমার কারখানায় লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হয়নি। উৎপাদন নিয়মিত থাকলে রপ্তানিও বাড়বে আশা করি। যেটা ক্ষতি হয়ে গেছে, তা এখন কীভাবে মেকাপ করবো তার পরিকল্পনা নিতে পারবো যদি সরবরাহ ঠিকমতো পাই।