রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ছিনতাইয়ের সময় প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভিন (৫৬) নিহত হওয়ার ঘটনায় এবার আসল দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ। এ ছাড়াও ভুক্তভোগীর ব্যাগ-মোবাইল এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল এবং মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। যদিও এর আগে এ ঘটনায় তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছিল র্যাব (বর্তমান এসআরবি)। পাশাপাশি ‘ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত’ একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের বিষয়টি উল্লেখ করেছিল সংস্থাটি। তবে ডিবি বলছে, আগের গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা এ ঘটনায় জড়িত নয়। উদ্ধারকৃত সেই মোটরসাইকেলটিও ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়নি।
গ্রেপ্তারকৃত আসল দুই ছিনতাইকারী হলো- মো. খোকন (৩৫) ও মো. রাজিব মাতুব্বর (৩৬)। ডিবি জানিয়েছে, ঘটনার পর নিহতের স্বামী মোহাম্মদ আবদুল মতিন বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ঘটনাটি তদন্তে নামে থানা পুলিশসহ ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ ও গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছিনতাইয়ে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়। পরে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবি’র তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে খোকনকে মিরপুর পশ্চিমপাড়া এলাকার নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে খোকন জানায়, ছিনতাইয়ের সময় সে মোটরসাইকেলের পেছনে বসে ছিল এবং ভুক্তভোগীর ব্যাগে টান দেয়। খোকনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিরপুরের বড়বাগ এলাকা থেকে নিহত শিক্ষিকার ছিনতাই হওয়া ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ব্যাগের ভেতর তার ব্যবহৃত পোশাক, টিকিটের অংশ, চশমার খাপ ও কিছু ওষুধ পাওয়া যায়। পরে মিরপুর-১ এলাকা থেকে ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনটিও উদ্ধার করা হয়।
এরপর ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল চালানো রাজিব মাতুব্বরকে বিরুলিয়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজিবের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে জয়নাবপুর/জামানপাড়া এলাকার একটি স্থান থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে ৬২২ পিস ইয়াবাও উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজিবের বিরুদ্ধে অস্ত্র, ছিনতাই, চুরি, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনে মামলাসহ মোট ৮টি মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, খোকনের বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত তিনটি মামলা রয়েছে। ডিবি কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারকৃত দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা ঢাকার অন্য কোনো ছিনতাই বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত কি না- সে বিষয়েও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
এর আগে, গত ৩০শে আগস্ট বিকালে সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান দাবি করেন, স্কুলশিক্ষিকা রনজিলা পারভিন হত্যা মামলার মূল সন্দেহভাজন আসামি মো. মোশারফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ওরফে প্যারা পনি এবং তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-২। এ সময় ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করার দাবি করা হয়। র্যাব জানিয়েছিল, নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় র্যাব-২ জানতে পারে, এ মামলার সন্দিগ্ধ ছিনতাইকারীরা রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকায় অবস্থান করছে। এর ভিত্তিতে র্যাব-২ এর একটি আভিযানিক দল ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যা মামলার সন্দিগ্ধ আসামি ও ছিনতাইকারী চক্রের মূল হোতা মো. মোশারফ হোসেন পনিকে তার সহযোগী সেড্রিক এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলসহ আটক করে। ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদে জানান, ঘটনার দিন মোটরসাইকেলটি পনি গাজীর হেফাজতে ছিল। নিহতের স্বামী আব্দুল মতিনও ঘটনাস্থলে এই মোটরসাইকেলটি ব্যবহৃত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
যদিও পনি গাজী একজন পেশাদার ছিনতাইকারী এবং একাধিক অপরাধে অভিযুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাজধানীর তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ও ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসছিলেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।
বুধবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের মতো করে তদন্ত ও অভিযান শুরু করে। এ ঘটনায় র্যাব ও থানা পুলিশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে আগের একাধিক মামলা থাকলেও জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে তারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর তদন্তকারীরা দ্বিতীয় ধাপে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেন। সেখান থেকেই বর্তমান দুই আসামির বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় এবং তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আরও বলেন, কোনো ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা তদন্তের একটি স্বাভাবিক অংশ। তদন্ত শেষে প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় না, তাদের বাদ দেয়া হয়।
