মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি

ফন্ট সাইজ:

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ফের চালুর উদ্যোগে আশার আলো দেখা দিলেও কাটেনি অনিশ্চয়তা। ২৫টি প্রধান রিক্রুটিং এজেন্সিসহ মোট ৩৩৮টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ এবং আগামী তিন মাসে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া, অভিবাসন ব্যয়, সহযোগী এজেন্সির ভূমিকা ও দালাল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি। এরই মধ্যে চাকরির প্রলোভনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। ফলে প্রতারণার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বিদেশগামীদের মধ্যে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৮ই সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার কর্মী পাঠানো নিয়ে একটি নির্দেশনা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মালয়েশিয়ায় চাকরির নানা বিজ্ঞাপন ও দ্রুত কর্মী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অথচ সরকার এখনো কর্মী পাঠানোর সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।
পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে সতর্কতা জারি করেছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত কাউকে পাসপোর্ট জমা না দিতে, টাকা না দিতে এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করাতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতারক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানানো হযেছে। গতকাল মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বায়রার সাবেক সদস্যরা মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বিভিন্ন দাবি নিয়ে সচিব মো. মোখতার আহমেদের কাছে স্মারকলিপি দেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে তালিকাভুক্ত ৩১২টি এজেন্সিসহ সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিকে সমান সুযোগ দেয়া, সিন্ডিকেট ও একচেটিয়া আধিপত্য বন্ধ করা, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া সব যোগ্য মেডিকেল সেন্টার উন্মুক্ত করা এবং বোয়েসেলের মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর দাবিও জানানো হয়।
সচিব মো. মোখতার আহমেদ বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে এই সুযোগে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী যেন ফায়দা লুটতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দালাল ও প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

এরই মধ্যে অবৈধ ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ‘ত্রিপল এ ওভারসিজ’ নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস সিলগালা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানার পাশাপাশি তিন বক্স পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। তালিকায় ২৫টি প্রধান এজেন্সি, তাদের অধীনে ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং বোয়েসেলের অধীনে ৬২টি এজেন্সি রয়েছে। কিন্তু এসব সহযোগী এজেন্সি সরাসরি মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতার কাছ থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ ও কর্মী পাঠাতে পারবে কিনা, নাকি প্রধান এজেন্সির অধীনেই কাজ করবে-তা নিয়ে স্পষ্টতা এখনো নেই।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতেও সহযোগী এজেন্সির কাঠামোর আড়ালে সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ উঠেছিল। আবার সরকারের বক্তব্য হলো- ৩৩৮টি এজেন্সি বাংলাদেশ সরকার নির্বাচন করেনি; বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে তালিকা তৈরি করেছে।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এজেন্সিগুলো যাচাই করেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তালিকা প্রকাশের পরও মূল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে- বাস্তবে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে। কোন এজেন্সি চাহিদাপত্র আনবে, কর্মীর কাছ থেকে কতো টাকা নেয়া যাবে, সহযোগী এজেন্সির ক্ষমতা কতোটুকু থাকবে এবং দালালদের ভূমিকা কীভাবে বন্ধ করা হবে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না এলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।
বিশেষ ব্যবস্থায় আগামী তিন মাসে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ১লা জুনের সময়সীমার আগে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে প্রথম দফায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিমানভাড়াসহ অন্যান্য অভিবাসন ব্যয়ও বহনের কথা রয়েছে।

এই উদ্যোগ সফল হলে কম খরচে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে। তবে সেটি বৃহত্তর শ্রমবাজারে কতোটা কার্যকর হবে, সেটিই দেখার বিষয়।
বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীদের বিএমইটিতে নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, জেলা কর্মসংস্থান অফিস ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-টিটিসিতে। কিন্তু সরকারি সেবা হাতের কাছে থাকার পরও অনেক চাকরিপ্রত্যাশী দালাল ও এজেন্সির ওপর নির্ভর করছেন। এর পেছনে সরকারি তথ্য দ্রুত ও সহজ ভাষায় মানুষের কাছে না পৌঁছানোও একটি কারণ।

অতীতের অভিজ্ঞতাও কম উদ্বেগের নয়। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ভিসা কেনাবেচা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালের মাধ্যমে অর্থ আদায়, মেডিকেল ও বিমান টিকিটে বাড়তি টাকা নেয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের কারণে কয়েক দফা বাজার বন্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া কিংবা বেতন না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ সচিব জানিয়েছেন, ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় জনশক্তি পাঠানো শুরু হবে, তার প্রশাসনিক কার্যক্রম এখনো প্রক্রিয়াধীন। এ বিষয়ে নিশ্চিত ও সঠিক তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে।

গতকাল বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেয়া হয়। এতে তারা বলেন, ৩১২ সহযোগী এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (এফডব্লিউসিএমএস) অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, তারা যদি মূল ২৫ এজেন্সির মাধ্যমে না গিয়ে নিজেদের লাইসেন্স ও কাজের চাহিদাপত্র (জব অর্ডার) অনুযায়ী সরাসরি কর্মী পাঠাতে না পারে, তবে এই অন্তর্ভুক্তিতে কোনো সুফল আসবে না।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, আমরা আবার সেই একই পুরোনো সিন্ডিকেট ব্যবস্থার লক্ষণ দেখছি। মূল নিয়ন্ত্রক হবে ওই ২৫ এজেন্সি, আর বাকি ৩১২ রিক্রুটিং এজেন্সিকে শুধু আইওয়াশ হিসেবে রাখা হয়েছে।

এসব বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা মাহ্‌দী আমিন মানবজমিনকে বলেন, কর্মী পাঠানোর বিষয় নিয়ে এখনো দুই দেশের মধ্যে নেগোসিয়েশন চলছে।