টিকা ও পুষ্টির ঘাটতিতে হামে বাড়ছে জটিলতা

গবেষণা প্রতিবেদন

টিকা ও পুষ্টির ঘাটতিতে হামে বাড়ছে জটিলতা

ফন্ট সাইজ:

দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ নিয়মিত টিকা দেয়ার নির্ধারিত বয়স ৯ মাসে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশই ৯ মাস বয়সের আগে হামে আক্রান্ত হয়েছে। পাশাপাশি মাঝারি ও তীব্র অপুষ্টি হামের গুরুতর জটিলতার অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বুধবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কনফারেন্স হলে এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের আয়োজনে গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চমেকের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপের সহযোগিতায় এবং বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন চমেকের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার। গবেষণায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি ৩০০ আক্রান্ত শিশুর তথ্য গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের বয়স ছিল ২ মাস থেকে ১১ বছর। গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশ বা ৯১ জন ৯ মাস বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ মাসের কম বয়সী ছিল ১১ শতাংশ বা ২৩ জন। ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ছিল ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৪৬ জন। আক্রান্ত শিশুদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ বা ১৪৮ জন এসেছে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে। নিম্ন আর্থ-সামাজিক পরিবারের শিশু ছিল ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ বা ১২৭ জন। গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ বা ১৬৭ জন কোনো হাম টিকা নেয়নি। টিকা না নেয়ার ক্ষেত্রে অসচেতনতা বা টিকা দেয়ার তারিখ ভুলে যাওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে টিকা না নেয়া শিশুর হার ৫২ শতাংশ। এ ছাড়া শিশুর অসুস্থতার কারণে ৩০ শতাংশ, মায়ের অসুস্থতার কারণে ৮ শতাংশ, টিকার ভয় থেকে ৪ শতাংশ এবং টিকাকার্ড হারিয়ে যাওয়ায় ৪ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা নেয়া শিশুদের তুলনায় টিকা না নেয়া শিশুদের গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। টিকা নেয়া শিশুদের মধ্যে কোনো মৃত্যুর ঘটনা পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসাইন বলেন, গবেষণার ফলাফল একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও সতর্কবার্তা। প্রায় অর্ধেক শিশু নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হওয়ায় শুধু টিকাদান নয়, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি বলেন, হাম থেকে শিশুদের সুরক্ষায় টিকাদান, পর্যাপ্ত পুষ্টি, ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা-সবকিছুকে গুরুত্ব দিতে হবে।

গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের অ্যান্টিবডির অবস্থাও পরীক্ষা করা হয়। এতে ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশ বা ৯১ জন মায়ের শরীরে মিজলস আইজিজি অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। তবে মাত্র ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ মা জানিয়েছেন, তারা জীবনে হামের টিকা নিয়েছেন। যেসব মায়ের টিকার ইতিহাস ছিল না, তাদের ৫৫ শতাংশ শিশুই গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছে। আর যেসব মায়ের আইজিজি নেগেটিভ ছিল, তাদের ৪০ শতাংশ শিশু গুরুতর জটিলতার শিকার হয়েছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, মায়ের শরীরে আইজিজি অ্যান্টিবডি থাকলেও তা শিশুকে নিউমোনিয়া বা হামের গুরুতর জটিলতা থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারেনি।

অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন, চমেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. তসলিম উদ্দিন, অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়াসহ গবেষক, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।