চলতি বছরের বেশির ভাগ সময় পাকিস্তান অনেকটা দ্বিমুখী কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করে আসছে। একদিকে যুদ্ধরত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গোপন আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে ইসলামাবাদ, অন্যদিকে ইরানের উপসাগরীয় প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও জোরদার করছে। কিন্তু সম্প্রতি সৌদি ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিবিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষ পাকিস্তানের জন্য দুই দিক একসঙ্গে সামলে চলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সপ্তাহান্তে সৌদিকে আশ্বস্ত করতে তড়িঘড়ি উদ্যোগ নেয় পাকিস্তান। ইসলামাবাদ রিয়াদের সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এই উদ্যোগকে কূটনৈতিক ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আক্রান্ত হলে পাকিস্তানকে দেশটির পাশে সামরিকভাবে দাঁড়াতে হবে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনালাপে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের রিয়াদে হামলার ঘটনায় ইসলামাবাদের ‘তীব্রতম নিন্দা’ পুনর্ব্যক্ত করেন।
এর আগে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে পাকিস্তান যে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, পরে তা থেকে সরে আসে ইসলামাবাদ। শেহবাজ শরিফ সৌদির প্রতি ‘পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, হুতিদের হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য হুমকি তৈরি করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
মক্কা চুক্তির পরীক্ষা
সৌদি যুবরাজের সঙ্গে শেহবাজের ফোনালাপের এক দিন আগে ইরাক থেকে পরিচালিত একটি ড্রোন হামলার পর সৌদি সাময়িকভাবে তাদের ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়।
সৌদি তেল রপ্তানির জন্য এই পাইপলাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরে নেয়া যায়।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুইজন আহত হয়েছেন এবং একটি মসজিদসহ বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদির বিরুদ্ধে হুতিদের ব্যাপক অভিযানের অংশ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়। ওই অভিযানে দেশটির বিভিন্ন শহর ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও চালানো হয়েছে।
এই সংঘর্ষ গত মাসে পাকিস্তান, সৌদি ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম বড় পরীক্ষা। এর পাশাপাশি ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে আগে থেকেই একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল। নতুন ব্যবস্থার আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে পাকিস্তান গত সপ্তাহে বলে, মক্কা চুক্তির অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হুতিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক অভিযান নয়। এই অবস্থানের কারণে চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে পাকিস্তানের উদ্যোগ
তবে সর্বশেষ কূটনৈতিক তৎপরতায় শেহবাজ শরিফ সৌদির বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এসব হামলা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি নেতৃত্ব ও দেশটির ‘ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হুতিদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ আরও ব্যাহত হতে পারে।
শেহবাজ আরও বলেন, তিনি, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো ও শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।
পাকিস্তানের উভয়মুখী সংকট
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তুলনায় হুতিদের হুমকি ইসলামাবাদকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি তৈরি করেছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে সৌদির ভেতরে পাকিস্তানি সেনারা মোতায়েন রয়েছে। ফলে তারা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পাকিস্তানের পরিকল্পনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব চুক্তির পাশাপাশি বা পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার ঘটনাও প্রায়ই দেখা গেছে।
তবে পাকিস্তান একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে আসা তেল ও গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ইরান ও হুতিরা যে এসব গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল ব্যাহত করতে সক্ষম, তা তারা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি ইরানকে ক্ষুব্ধ না করারও কারণ রয়েছে ইসলামাবাদের।
