ভুয়া পরোয়ানা বা ওয়ারেন্টের মাধ্যমে নিরীহ নাগরিকদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধে সেন্ট্রাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস) থেকে পরোয়ানার সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এ বিষয়ে অবিলম্বে একটি সার্কুলার জারি করে সব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠানোর জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার এ সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের ওপর জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলম এবং বিচারপতি মুরাদ এ মাওলা সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
রায়ে আদালত আরও একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তিনি যেন দেশের সব জেলা জজ, মহানগর জজ, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজিএম) ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটসহ (সিএমএম) সব অধস্তন আদালতের বিচারকদের কাছে একটি পরিপত্র পাঠান। এতে বলা হয়, ভবিষ্যতে যেকোনো নালিশি (সিআর) মামলা দায়েরের সময় বাদী ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য নালিশি মামলার সঙ্গে বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) কপি এবং আইনজীবীর প্রফেশনাল পরিচয়পত্রের কপি সংযুক্ত রাখা নিশ্চিত করতে হবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, কোনো নাগরিককে গ্রেপ্তার করতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির সুস্পষ্ট বিধানাবলি পুরোপুরি অনুসরণ করতে হবে; অন্যথায় তা আইনের মারাত্মক ব্যত্যয় ঘটবে। ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে তার মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়, যা রক্ষা করা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আদালত আরও বলেন, আদালতের প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করে যাতে কোনো নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন অত্যন্ত জরুরি। কারণ ভুয়া মামলা বা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে একজন নাগরিকের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তাকে সহায়তা করেন আইনজীবী মোহাম্মদ ছারওয়ার আহাদ চৌধুরী, সঞ্জয় মন্ডল ও নাসরিন সুলতানা। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) জে আর খান রবিন এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) মোহাম্মদ হুমায়ুন হোসেন তুহিন।
শুনানিতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আদালতকে জানান, ২০১২ সালে আরিফ নিয়াজী নামে গুলশানের এক বাসিন্দাকে তার বাসা থেকে একটি ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে সোপর্দের পর তিনি জানতে পারেন তার বিরুদ্ধে পুরো মামলাই ছিল সাজানো ও ভুয়া। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও প্রমাণ মেলে যে ভুয়া প্রক্রিয়ায় পরোয়ানাটি তৈরি করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল ও শত্রুতা হাসিল করতে প্রভাবশালী মহল প্রায়ই এমন ভুয়া ওয়ারেন্টকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বার্থে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং আরিফ নিয়াজীকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় গুলশান থানার ওসির কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের ডিএজি জে আর খান রবিন রুলের বিরোধিতা করে শুনানিতে বলেন, বর্তমানে পুলিশের সেন্ট্রাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম কার্যকর রয়েছে, যার কারণে এখন আর ভুয়া ওয়ারেন্টে কাউকে গ্রেপ্তারের সুযোগ নেই। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজে মামলাটি দায়ের না করায় এর কোনো প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি। শুনানি শেষে আদালত আজ রুলটি নিষ্পত্তি করে উল্লিখিত নির্দেশনাসহ রায় দেন।
উল্লেখ্য, জনস্বার্থে এইচআরপিবির পক্ষে দায়ের করা এই রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, র্যাব ডিজি, ডিআইজি (চট্টগ্রাম রেঞ্জ), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং গুলশান থানার ওসিসহ মোট আটজনকে বিবাদী করা হয়েছিল।
