ব্র্রেকফাস্ট খাইতে ইন্ডিয়া, লাঞ্চ খাইতে ইন্ডিয়া, ডিনার খাইতে ইন্ডিয়া- তাহলে নিজ দেশের খাবার কখন খাবেন

ব্র্রেকফাস্ট খাইতে ইন্ডিয়া, লাঞ্চ খাইতে ইন্ডিয়া, ডিনার খাইতে ইন্ডিয়া- তাহলে নিজ দেশের খাবার কখন খাবেন

ফন্ট সাইজ:

ভারত প্রসঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ভারত প্রীতি থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ, বাংলাদেশের নতুন রূপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, রোহিঙ্গা সংকট, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠন, সীমান্ত পরিস্থিতি, ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকের নির্বাচন এবং পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদ ফেরত আনার উদ্যোগ নিয়েও কথা বলেন তিনি। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নানা বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উত্তর দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে একাধিকবার ভারত প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। প্রসঙ্গক্রমে এক সাংবাদিক জানতে চান- যেহেতু জাতিসংঘ বহুপক্ষীয় ফোরাম, তাই সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাইডলাইনে বৈঠক হবে কি না। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারত প্রীতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। ভারত একটি ভিন্ন দেশ। আমরা তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভালো করতে কাজ করছি। এখন আপনি যদি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট খাইতে ইন্ডিয়া, লাঞ্চ খাইতে ইন্ডিয়া, ডিনার খাইতে ইন্ডিয়া করেন- তাহলে ভাই আপনার নিজের দেশের খাবার কখন খাবেন। খালি ইন্ডিয়া ইন্ডিয়া করেন। নিজের দেশের চিন্তা করেন।

ভারত প্রীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের ফ্যাসিনেশন থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ভারত বাংলাদেশের একটি প্রতিবেশী দেশ, যার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভালো করতে কাজ করছে বাংলাদেশ। হুমায়ুন কবির বলেন, যার সঙ্গে যখন দ্বিপক্ষীয় বা বহুপাক্ষিকভাবে কথা বলা দরকার, বাংলাদেশ অবশ্যই তা বলবে। তবে সাইডলাইনে সবার সঙ্গে বৈঠক করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর অনেক আমন্ত্রণ থাকবে এবং অনেক দেশের সঙ্গে আলোচনা হবে।

ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পুরনো ধারা থেকে বের হয়ে আসার ওপর জোর দেন। বলেন, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে চায়। গত ১৫ বছর ধরে একটি স্বৈরাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত ও লুটেরা সরকারের সঙ্গে যে অস্বস্তিকর সম্পর্ক ছিল, সেখান থেকে বের হয়ে নতুন সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যেতে চায় ঢাকা। এক্ষেত্রে সবার আগে ভারতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই সম্পর্ক দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে পুনর্গঠন করা উচিত, বহুপাক্ষিক ফোরামের মাধ্যমে নয়। ভারতের সঙ্গে প্রথম আলোচনা সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফরের মাধ্যমে হওয়াই সবচেয়ে ভালো।

আরেক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, বহুপাক্ষিক ফোরামে গিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করা হবে না- আগে এমন কোনো কথা বলেননি তিনি। তার বক্তব্য শুধু ভারতের ক্ষেত্রে ছিল। প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো বহুপাক্ষিক অনুষ্ঠানে গেলে কারও সঙ্গে বৈঠক হবে না- এমন কথা কখনো বলা হয়নি। দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সাংবাদিকদের শব্দ ব্যবহারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তার বক্তব্য সঠিকভাবে না বোঝা বা খেয়াল করে না শোনার কারণে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সীমান্তে সামপ্রতিক হতাহতের ঘটনা নিয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করা হবে। আন্তর্জাতিক আইন, সীমান্তবিষয়ক প্রটোকল এবং দুই দেশের চুক্তি মেনে ভারতের সঙ্গে প্রতিটি পর্যায়ে এসব উদ্বেগ তুলে ধরা হবে। কূটনৈতিক চ্যানেলেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

১০১টি চুক্তি পুনর্নিরীক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসব চুক্তি সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি চিফ হুইপের আওতাধীন। এ বিষয়ে তিনিই সঠিক উত্তর দিতে পারবেন।

জাতিসংঘের অধিবেশনে নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী:
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে রওনা হবেন এবং ২৬শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিউ ইয়র্কে অবস্থান করবেন। সেখানে তিনি ব্যস্ত সময় পার করবেন। জাতিসংঘে দেয়া বক্তব্যে বাংলাদেশের নতুন রূপ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার নির্বাচিত হয়েছে। নতুন বাংলাদেশ কেমন হবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের চিন্তা ও পরিকল্পনা কী-এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসবে। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের চিন্তা ও ভাবনাও ভাগ করে নেবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশ্বশান্তি, টেকসই সমাধান এবং বিভিন্ন সংকট নিরসনে বাংলাদেশ কীভাবে আরও প্রভাবশালী ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়গুলোও থাকবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন আশার সৃষ্টি এবং জলবায়ু সুরক্ষায় বাংলাদেশের নেতৃত্বের বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। জলবায়ু অর্থায়ন ও জলবায়ু তহবিলের দাবিও সেখানে থাকবে বলে জানান তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাইডলাইনে বৈঠকের সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রধান উদ্দেশ্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেয়া। সাইডলাইনের বৈঠকগুলো অনেক সময় শেষ মুহূর্তে ঠিক হয়। ফলে এ বিষয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত তথ্য দেয়া সম্ভব নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় পুতুলের নিয়োগটাই দুঃখজনক: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই পদে তার নিয়োগ অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিতর্কিত ছিল। এত উচ্চপর্যায়ের একটি পদের জন্য তার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা ছিল না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

হুমায়ুন কবির অভিযোগ করেন, একটি স্বৈরাচারী সরকার স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তাকে ওই পদে বসিয়েছিল। ওই পরিবারের দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিভিন্ন খবর এখন একের পর এক সামনে আসছে। সায়মা ওয়াজেদের নিয়োগ নিয়ে তদন্ত হওয়া বিস্ময়কর নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বৈরাচারী আমলে জালিয়াতি, তথ্য গোপন এবং প্রভাব খাটিয়ে তাকে ওই পদে বসানো হয়েছিল।

পাচার হওয়া অর্থ সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হবে: দেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ ও সম্পদ ফেরত আনার বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি অংশীদারিত্ব তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি যেসব দেশের আইনি ও ফরেনসিক দক্ষতা রয়েছে, তাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের চুরি হওয়া টাকা ও সম্পদ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর। এসব অর্থ কোনো ব্যক্তির পকেটে না গিয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হবে।