সররকারি হাসপাতালে বাইরের পরীক্ষা: ভেঙে পড়া রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার বাস্তবতা-যন্ত্র আছে-কিট নেই; জনবল আছে-সেবা নেই, দালালমুক্ত, জবাবদিহিমূলক সংস্কার প্রয়োজন

সররকারি হাসপাতালে বাইরের পরীক্ষা: ভেঙে পড়া রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার বাস্তবতা-যন্ত্র আছে-কিট নেই; জনবল আছে-সেবা নেই, দালালমুক্ত, জবাবদিহিমূলক সংস্কার প্রয়োজন

ফন্ট সাইজ:

সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রুগীকে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে বলা হলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা হয় না কেন? এর পেছনে কি শুধু দালালচক্র, কমিশন বা দুর্নীতি?

সরাসরি উত্তর হলো-অনিয়ম ও অনৈতিক রেফারেলের অভিযোগ অস্বীকার করার সুযোগ নেই; যেখানে আছে, সেখানে কঠোর তদন্ত ও শাস্তি জরুরি। কিন্তু সব বাইরের পরীক্ষা করানোর ঘটনাকে দালালি বলে আখ্যা দিলে মূল সমস্যাটি আড়াল হয়ে যায়। বাস্তবতা হলো, সরকারি রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সক্ষমতাহীনতা, যন্ত্রের অচলাবস্থা, রিএজেন্ট সংকট, জনবল ঘাটতি, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা এবং বিপুল রুগীর চাপ রুগীকে বাইরে যেতে বাধ্য করে।
সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করানো একটি রুগীর অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত না করে শুধু চিকিৎসক, কর্মচারী বা দালালকে দায়ী করলে সংকটের সমাধান হবে না।
জাতীয় চিত্র: যন্ত্র আছে, কিন্তু সেবা নেই
সাম্প্রতিক পিপিআরসি মূল্যায়নে দেশের আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত এক বছরে রোগ নির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশ ব্যবহারই হয়নি। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে যন্ত্রের প্রাপ্যতা ৫৪ শতাংশ হলেও নিয়মিত সেবা পাওয়া গেছে মাত্র ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে।
সেবা ব্যাহত হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রে যন্ত্র অকেজো, ১৪ শতাংশে প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক উপকরণের ঘাটতি এবং ৭ শতাংশে প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্টের অভাব পাওয়া গেছে। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ল্যাব সেবার ধারাবাহিকতাও মাত্র ৪৩-৪৫ শতাংশ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
উপজেলা পর্যায়েও সংকটটি ভয়াবহ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় তথ্যানুযায়ী দেশে ৪৮৫টি এক্স-রে ও ৩৯৫টি আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন অচল ছিল। এগুলো মেডিকেল কলেজের হিসাব নয়, কিন্তু এসব যন্ত্র অচল থাকায় জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর রেফারেল-চাপ বাড়ে।
সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে বড় আকারে যে যন্ত্রগুলো সবচেয়ে বেশি অচল, অনিয়মিত বা সক্ষমতার তুলনায় অপ্রতুল থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়, সেগুলো হলো:
সিটি স্ক্যান
এমআরআই
ডিজিটাল এক্স-রে ও পোর্টেবল এক্স-রে
আল্ট্রাসনোগ্রাফি/ফোর-ডি
ক্যাথল্যাবের অ্যাঞ্জিওগ্রাম মেশিন
ইকোকার্ডিওগ্রাম মেশিন
ল্যাবের বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজি, ইমিউনোঅ্যাসে ও ইলেক্ট্রোলাইট অ্যানালাইজার
রক্তের গ্যাস বিশ্লেষক বা এবিজি মেশিন
এন্ডোস্কপি ও কোলোনোস্কপি মেশিন
মাইক্রোবায়োলজি কালচার ও সেনসিটিভিটি যন্ত্র
হিস্টোপ্যাথলজি ও ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি সুবিধা
রেডিওথেরাপি ও ক্যানসার-রোগ নির্ণয় সম্পর্কিত যন্ত্র কেনা হয়, কিন্তু সেবা চালু থাকে না
সরকারি হাসপাতালে নানা সময়ে আধুনিক এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান, অ্যানালাইজার, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম বা ল্যাব সরঞ্জাম আসে। কিন্তু যন্ত্র কেনার পর তার পূর্ণ জীবনচক্র-ইনস্টলেশন, প্রশিক্ষণ, ক্যালিব্রেশন, সফটওয়্যার, খুচরা যন্ত্রাংশ, সার্ভিস কনট্রাক্ট, মেরামত এবং দক্ষ অপারেটর-নিশ্চিত করা হয় না।
ফলে যন্ত্র থাকলেও তা অচল থাকে, সীমিত সময় চলে, অথবা রিপোর্ট প্রদানের সক্ষমতা তৈরি হয় না। কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্র রোগীর পরীক্ষায় ব্যবহার না হলে সেই বিনিয়োগের লাভ কার-এই প্রশ্নের জবাব রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
বড় যন্ত্রগুলো নষ্ট বা বন্ধ থাকার মূল কারণগুলো হলো-মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্র, সার্ভিস কনট্রাক্ট না থাকা, খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিলম্ব, কুলিং ও বিদ্যুৎব্যবস্থার ত্রুটি, রিএজেন্ট ও কনজ্যুমেবল ঘাটতি, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনোলজিস্টের সংকট, এবং মেরামতের অর্থ অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা।
রিএজেন্ট ও কিট না থাকলে মেশিনও অচল
ল্যাবরেটরির একটি অ্যানালাইজার থাকলেই পরীক্ষা হয় না। প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট রিএজেন্ট, কিট, ক্যালিব্রেটর, কন্ট্রোল, নমুনা টিউব, ফিল্টার ও অন্যান্য ব্যবহার্য সামগ্রী। এগুলোর যেকোনো একটির ঘাটতি হলেই পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়।
সরকারি ব্যবস্থায় চাহিদা নিরূপণের দুর্বলতা, বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ ক্রয়প্রক্রিয়া, সরবরাহে বিলম্ব এবং সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়া-সব মিলিয়ে অনেক ল্যাবে পরীক্ষা বন্ধ থাকে। রোগী তখন দেখেন, মেশিন সামনে আছে; কিন্তু বলা হচ্ছে, “কিট নেই”। এটি রোগীর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও চিকিৎসা ব্যবস্থার কঠিন বাস্তবতা। কিটবিহীন মেশিন চিকিৎসা সেবা দেয় না।
রোগীর চাপের সঙ্গে সক্ষমতার কোনো সামঞ্জস্য নেই
বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যার তুলনায় বহু গুণ রোগী ভর্তি থাকে। বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড, আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার-সব জায়গা থেকে একই ল্যাবে নমুনা যায়। একটি সিটি স্ক্যান মেশিন, একটি ইকো মেশিন বা সীমিতসংখ্যক ল্যাব অ্যানালাইজার দিয়ে হাজারো রুগীর চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়।

ফলে সিরিয়াল দীর্ঘ হয়, রিপোর্ট দেরিতে আসে, কিংবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করা যায় না। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে যে সিটি স্ক্যান ২-৪ হাজার টাকায় হওয়ার কথা, বাইরে সেটির জন্য অনেক সময় দ্বিগুণ বা তারও বেশি খরচ হয়।
স্ট্রোক, মাথায় আঘাত, হার্ট অ্যাটাক, ক্যানসার ও জরুরি অস্ত্রোপচারের রোগীদের জন্য এটি শুধু আর্থিক ভোগান্তি নয়-চিকিৎসা বিলম্বেরও কারণ। জরুরি রোগে পরীক্ষা বিলম্বিত হওয়া মানে কখনও কখনও চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়া; আর চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়া মানে মৃত্যু বা স্থায়ী অঙ্গহানির ঝুঁকি বৃদ্ধি।
সব পরীক্ষা সব হাসপাতালে হওয়া সম্ভব নয়
একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জাতীয় বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটের কাজ ও সক্ষমতা এক নয়। সব প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের পরীক্ষা চালু রাখা বাস্তবসম্মতও নয়।
জেনেটিক পরীক্ষা, ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি, ফ্লো সাইটোমেট্রি, উন্নত মলিকুলার পরীক্ষা, বিশেষ হরমোন, জটিল কালচার-সেন্সিটিভিটি, উন্নত ইমেজিং বা বিশেষায়িত কার্ডিয়াক পরীক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই রেফারেলভিত্তিক হবে। এতে অনৈতিকতার কিছু নেই-যদি রেফারেলটি রুগীর প্রয়োজন অনুযায়ী, স্বচ্ছভাবে এবং লিখিত ব্যাখ্যাসহ করা হয়।
সমস্যা হয় তখনই, যখন সরকারি হাসপাতালে সম্ভব ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা অকারণে নির্দিষ্ট বাইরের প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়।

গুটিকয়েক হাসপাতালে সীমিত আকারে ছাড়া ২৪ ঘণ্টার জরুরি রোগনির্ণয়ের সেবা নেই।
সরকারি হাসপাতালে সকাল ৮টা-দুপুর ১টার পর অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় না।
সরকারি হাসপাতালের অনেক ল্যাবে দিনে কিছু পরীক্ষা হয়, রাতে হয় না; ছুটির দিনে সীমিত কিছু থাকে; অথবা টেকনোলজিস্ট না থাকায় নির্দিষ্ট পরীক্ষা বন্ধ থাকে। অথচ জরুরি বিভাগ রাত-দিন ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে।
স্ট্রোকের জন্য দ্রুত সিটি স্ক্যান, হার্ট অ্যাটাকের জন্য ট্রোপোনিন ও ইকো, সেপসিসে কালচার ও ল্যাকটেট, তীব্র রক্তক্ষরণে কোয়াগুলেশন প্রোফাইল,ইলেক্ট্রোলাইটস দুর্ঘটনায় দ্রুত ইমেজিং-এসব পরীক্ষা সময়মতো না হলে রোগীর ক্ষতি হয়। চিকিৎসক তখন রোগীর জীবন বাঁচাতে বাইরের সক্ষম প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন।
অ্যাকিউট কেয়ার সেবা
সারা দেশে সরকারি হাসপাতাল গুলোতে অ্যাকিউট কেয়ার মেডিসিনের সমন্বিত সেবা নাই। সিসিইউ-আইসিইউ আছে কিন্তু সিট নাই, সিট থাকলে ভেন্টিলেটর নাই। ক্যাথল্যাবে মেশিন নাই, টেকনিশিয়ান নাই, মড্যুলার ওটি নাই।

জনবল ও মাননিয়ন্ত্রণের সংকট
শুধু চিকিৎসক থাকলেই ডায়াগনস্টিক সেবা চলে না। প্রয়োজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, রেডিওগ্রাফার, সনোলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা অপারেটর এবং মাননিয়ন্ত্রণে দক্ষ কর্মী।
অনেক প্রতিষ্ঠানে যন্ত্র আছে, কিন্তু অপারেটর নেই; অপারেটর আছে, কিন্তু রিপোর্ট যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই; আবার কোথাও অভিজ্ঞ টেকনোলজিস্ট না থাকায় যন্ত্র চালু রাখার ঝুঁকি নেওয়া হয় না। ভুল রিপোর্টও রোগীর জন্য বিপজ্জনক। তাই সেবার পরিমাণের পাশাপাশি গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি।
অনিয়ম বন্ধে জিরো টলারেন্স প্রয়োজন
বাইরের পরীক্ষা করানোর পেছনে কাঠামোগত কারণ আছে বলার অর্থ অনিয়মকে বৈধতা দেওয়া নয়। কমিশনের বিনিময়ে রেফারেল, দালালের মাধ্যমে রোগীকে বিভ্রান্ত করা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দেওয়া বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং শাস্তিযোগ্য।
রোগীকে বাইরে পাঠাতে হলে প্রেসক্রিপশন বা রেফারেল স্লিপে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে:
কোন পরীক্ষা প্রয়োজন
সরকারি হাসপাতালে কেন তাৎক্ষণিকভাবে করা যাচ্ছে না
পরীক্ষা জরুরি কি না
রোগী কোথায় অনুমোদিত ও মাননিয়ন্ত্রিত সেবা পেতে পারেন
এটি বাধ্যতামূলক হলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রোগীও সঠিক তথ্য পাবেন।

কীভাবে সমাধান সম্ভব
সমস্যাটি জটিল, কিন্তু সমাধান অসম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সুশাসন, প্রযুক্তি এবং নিয়মিত জবাবদিহি।
১. প্রতিটি হাসপাতালে ‘ডায়াগনস্টিক সার্ভিস ড্যাশবোর্ড’ চালু করতে হবে
হাসপাতালের প্রবেশপথ, ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপে প্রতিদিনের তথ্য প্রকাশ করতে হবে:
কোন পরীক্ষা চালু আছে
কোন যন্ত্র সচল বা অচল
কোন রিএজেন্ট কতদিনের মজুত আছে
রিপোর্ট পেতে সম্ভাব্য সময়
জরুরি পরীক্ষা ২৪ ঘণ্টা কোথায় পাওয়া যাবে
সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য প্রকাশ্য “সচল–অচল যন্ত্রের ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড” চালু করা। সেখানে কোন সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ক্যাথল্যাব, ইকো বা ল্যাব অ্যানালাইজার সচল; কোনটি কেন বন্ধ; এবং কবে মেরামত হবে-তা প্রকাশ করতে হবে। তাহলেই রুগী, চিকিৎসক ও সরকার-সবার কাছে জবাবদিহি স্পষ্ট হবে।
২. যন্ত্র কেনার আগে জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা
যন্ত্র কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে:
প্রশিক্ষিত অপারেটর
বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্ব
অন্তত ৩ থেকে ৫ বছরের সার্ভিস ও মেইনটেন্যান্স চুক্তি
দ্রুত খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের শর্ত
রিএজেন্টের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পরিকল্পনা
যন্ত্র চালু হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা
যন্ত্র সরবরাহ করলেই কাজ শেষ-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
৩. জরুরি পরীক্ষার জন্য আলাদা ২৪/৭ ব্যবস্থা
প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালে ন্যূনতম জরুরি পরীক্ষার প্যাকেজ ২৪ ঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে সিবিসি, ব্লাড গ্রুপিং ও ক্রসম্যাচ, গ্লুকোজ, ক্রিয়েটিনিন, ইলেক্ট্রোলাইট, ট্রোপোনিন, কোয়াগুলেশন প্রোফাইল, এবিজি, জরুরি এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি ও প্রয়োজনীয় সিটি স্ক্যান।
জরুরি পরীক্ষার জন্য রিপোর্ট দেওয়ার সর্বোচ্চ সময়ও নির্ধারণ করতে হবে।
৪. রিএজেন্ট ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল স্টক ব্যবস্থা
কোন হাসপাতালে কোন রিএজেন্ট কতটুকু আছে, কতদিনে শেষ হবে, কতটুকু প্রয়োজন-এসব ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। স্টক শেষ হওয়ার আগেই স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা এবং পুনঃসরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
রিএজেন্ট সংকটকে “হঠাৎ সমস্যা” হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়।
৫. বিভাগভিত্তিক রেফারেল নীতি ও অডিট
সরকারি হাসপাতালে কোন পরীক্ষা করা সম্ভব, কোনটি অন্যত্র পাঠাতে হবে-তার বিভাগভিত্তিক লিখিত নীতিমালা থাকা জরুরি। প্রতি মাসে রেফারেল অডিট করতে হবে:
কত রোগী বাইরে পরীক্ষা করালেন
কোন কোন পরীক্ষা সবচেয়ে বেশি বাইরে গেছে
কেন গেছে
সরকারি হাসপাতালে সেবা চালু করতে কী প্রয়োজন
একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে অস্বাভাবিক রেফারেল হয়েছে কি না
এই অডিটের ফল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দিতে হবে।
৬. রোগীর জন্য অনুমোদিত ‘রেফারেল নেটওয়ার্ক’
যে পরীক্ষাগুলো সরকারি হাসপাতালে সম্ভব নয়, সেগুলোর জন্য মাননিয়ন্ত্রিত, স্বচ্ছ মূল্যতালিকাসহ অনুমোদিত রেফারেল ল্যাবের নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে। সরকারি হাসপাতাল নমুনা সংগ্রহ করবে, নির্ধারিত ল্যাবে পাঠাবে এবং রিপোর্ট হাসপাতালের ডিজিটাল সিস্টেমে ফিরে আসবে।
তাতে গুরুতর রুগীকে নিজে নমুনা নিয়ে শহরময় ঘুরতে হবে না।
৭. দালালমুক্ত হাসপাতাল নিশ্চিত করতে হবে
হাসপাতাল এলাকায় দালাল নির্মূলের দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়; হাসপাতাল প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রয়োজন:
দালালবিরোধী স্থায়ী টিম
অভিযোগের হটলাইন ও কিউআর কোড
সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ
পরিচয়পত্র ছাড়া নমুনা সংগ্রহ বা রোগী ‘ম্যানেজ’ নিষিদ্ধ
প্রমাণিত অনিয়মে দৃশ্যমান শাস্তি
রোগী সহায়তা ডেস্ক
৮. রোগ নির্ণয়কে চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাজেট দিতে হবে
ওষুধ ও ভবনের পাশাপাশি ল্যাব, ইমেজিং, রক্ষণাবেক্ষণ ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগকে স্বাস্থ্য বাজেটের মূল অগ্রাধিকার করতে হবে। চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন দেবেন, কিন্তু পরীক্ষা না হলে সঠিক রোগ নির্ণয় হবে না। আর রোগ নির্ণয় ছাড়া চিকিৎসা অনেক সময় অনুমাননির্ভর হয়ে পড়ে।

শেষ কথা
সরকারি হাসপাতালে বাইরের পরীক্ষা কমানোর একমাত্র পথ হলো হাসপাতালের ভেতরের পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো। সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি নির্ধারণ করা। রোগীকে বাইরের প্রতিষ্ঠানে পাঠানো সবসময় দুর্নীতি নয়; কিন্তু বাইরের পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন যাতে ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসে, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কম জনবল ও কম শয্যার বিপরীতে অধিক সংখ্যক রোগিকে চিকিৎসা দিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীরা যে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, পৃথিবীতে আর কোথাও তা নেই। হাসপাতালে বেড নেই, টেস্টের রিএজেন্ট নেই, মেশিন নেই, টেকনিশিয়ান নেই, ডাক্তারের থাকার কোয়ার্টার নেই, বসার চেয়ার নেই, বিশ্রামের স্থান নেই, টয়লেট নেই, বাহন নেই, নিরাপত্তা নেই, এমন নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেই চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীরা তাদের সেবাদান ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছেন।
আসল সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী না হয়ে নিজের ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রতিদিন মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদের জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছেন, চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিলতায় কোন রোগী মারা গেলে হাসপাতালে মব সৃষ্টি হচ্ছে, তাই চিকিৎসকেরা সাধারণ রুগীকেও অন্যত্র রেফার করে দিচ্ছেন যার ফলে সাধারণ জনগণ প্রকৃত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংবিধানে “স্বাস্থ্য মন্ত্রীর” জন্য আলাদা কোনো অনুচ্ছেদ নেই। তবে মন্ত্রিসভা ও মন্ত্রীদের দায়িত্ব সংবিধানের ৫৫–৫৮ অনুচ্ছেদে নির্ধারিত; স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধি নির্ধারিত হয় রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬ অনুযায়ী।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ ও ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনগণের পুষ্টি, জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা উন্নয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বলা হয়েছে। এটি সরাসরি বিচারযোগ্য “মৌলিক অধিকার” নয়; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাধ্যতামূলক নীতিগত অঙ্গীকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রী সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব বহন করেন।
মন্ত্রী একা নন-তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য। সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী। তাই স্বাস্থ্যসেবার ব্যর্থতা, হাসপাতালের শয্যাসংকট, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঘাটতি, জনবল সংকট বা রোগীর মেঝেতে চিকিৎসা-এসবের দায় এড়িয়ে শুধু ক্যামেরার সামনে কয়েকটি প্রশ্ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হলো-
* বাস্তবসম্মত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করা
* পর্যাপ্ত বাজেট, জনবল, ওষুধ, পরীক্ষা ও যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা
* হাসপাতালগুলোর শয্যা, আইসিইউ ও জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করা
* চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ন্যায়সংগত নিয়োগ, পদায়ন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা
* ওষুধের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান এবং রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি পরিচালনা করা
* অধিদপ্তর ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা

সোজা কথা: স্বাস্থ্য মন্ত্রী চিকিৎসা দেন না; তিনি এমন একটি ব্যবস্থা চালাবেন, যেখানে রোগী চিকিৎসা পাবে মর্যাদার সঙ্গে। রোগীর চিকিৎসা কোনো দয়া নয়, অধিকার। সেই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য দরকার সচল যন্ত্র, নিরবচ্ছিন্ন কিট-রিএজেন্ট, দক্ষ জনবল, ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা, স্বচ্ছ রেফারেল এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
এখন প্রয়োজন একটি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে সরকারি বেসরকারি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা তাহলেই কেবল সরকারি হাসপাতাল সাধারণ জনগণের চিকিৎসার শেষ ভরসা হয়ে উঠবে এবং সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস( ডিএমসি) এমডি ( কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট; বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।