দেশের আর্থিক খাতের মূল ভিত্তি ব্যাংক ব্যবস্থা এখন খেলাপি ঋণে হাবুডুবু খাচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপির কারণে মূলধন ঘাটতি ও তীব্র তরল্য সংকটে ভুগছে দেশের ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকের বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। এতে খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষে চলে এসেছে বাংলাদেশ। ফলে থমকে যাচ্ছে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খেলাপি ঋণের বড় অংশ একদিনে তৈরি হয়নি। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নিয়মিত দেখানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র এখন বেরিয়ে আসছে। আর এতেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাদের মতে, দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আর্থিক খাতের এই ভঙ্গুরতা পুরো দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্বকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কেবল কাগুজে নীতিমালা প্রণয়ন করে এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ খেলাপি ঋণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এসব টাকা অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখছে না। আমানতকারীদের এই টাকা ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। পরের তিন মাসেই তা ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠেছিল।
সবচেয়ে ঝুঁঁকিতে যেসব ব্যাংক: সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি। এর বাইরে সরকারি খাতের বেসিক, জনতা ও বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশের বেশি।
গত রোববার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ৬টি ব্যাংক (অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসি-এর ৩০শে জুন ২০২৬ ভিত্তিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকে ২৯০২৯.৬৭ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৮৮৮.৭৯ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৮১৩১.০৯ কোটি, জনতা ব্যাংকের ৭৫৩৯৬.৬৭ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১৯২৮১.৭৪ কোটি এবং সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫০৪৮.৩৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ১১টিই চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।
রাজনৈতিক প্রভাবে দেয়া ভুয়া ও বেনামি ঋণ, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায় মন্দা এবং জ্বালানি সংকটও খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
কৃষি ঋণে ভয়াবহ চিত্র: কৃষি ঋণ বিতরণ বাড়লেও তা আদায়ে বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংকে কৃষি খাতে বকেয়া ঋণের বড় একটি অংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। কোনো ব্যাংকে মোট বকেয়া ঋণের ৯৪ শতাংশের বেশি খেলাপি, আবার কোনোটিতে এই হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে মোট কৃষি ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশই এখন খেলাপির খাতায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে ব্যাংকিং খাতে কৃষি ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট কৃষি ঋণের ২৯.২২ শতাংশই খেলাপি।
সিপিডি’র বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলমান সম্পদ মান পর্যালোচনার ফলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত দুর্বলতা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
খেলাপিরা বারবার ছাড় পান: ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়ার সময় বরাবরই বলা হয়েছে, এতে ব্যাংকের আটকে থাকা টাকা ফেরত আসবে এবং খেলাপি ঋণ কমবে। বাস্তবে ব্যাংকের খাতায় খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কমলেও সেই হারে আদায় বাড়েনি; বরং পুনঃতফসিল করা ঋণের বড় অংশ আবার খেলাপি হয়েছে।
যেভাবে বাড়লো খেলাপি ঋণ: ২০০৯ সালের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর ১৫ বছরের শাসনের পর সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে আর্থিক খাতের গোপন করা তথ্য ও প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র বের করে। এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট তৈরি হয়। এই অচলাবস্থা কাটাতে বিশেষ ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফ করে এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতা আসার পর এই সুবিধা আরও বাড়ানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ছাড়: গত ৩১শে অগাস্ট ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে নীতি সহায়তা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণগ্রস্তকে ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর পরিশোধের জন্য ১৫ বছর সময় দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি দেয়া লাগবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। যারা এই সুযোগ নিতে চান তাদের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই আবেদন করতে বলা হয়েছে। যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নিষ্পত্তি করবে ব্যাংকগুলো। এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বরও একটি প্রজ্ঞাপন দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে ব্যাংকার ও গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের স্থিতির ওপর কমপক্ষে দুই শতাংশ নগদ অর্থ জমা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। ঋণ নিয়মিত হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ (ঋণ পরিশোধে বিরতি) তা পরিশোধে ১০ বছর সময় দেয়া হবে বলে জানানো হয়েছিল। বড় ঋণ খেলাপিদের এসব সুযোগ দেয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মূলত অনেক আগের অনাদায়ী ঋণ হিসাবভুক্ত হওয়ায় খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। তবে খেলাপি কমাতে ইতিমধ্যে ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিগত সুযোগ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চায়, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসুক। একইসঙ্গে গ্রাহকরা যেন কম সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন এবং ব্যাংকগুলোও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। এতে ভবিষ্যতে খেলাপির হার কিছুটা কমে আসবে বলে তিনি আশা করেন।
শাস্তি হয় না: ২০২৪ সালে আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খারাপ অবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকার পরিবর্তনের পর খাতা-কলমে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমার পরিবর্তে বরং এখনো বেড়েই চলেছে। মূলত বাংলাদেশে অর্থঋণ আদালত এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে আইন থাকলেও বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়ার উদাহরণ কম।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব বলেন, বিদ্যমান আইনে আমরা উইলফুল ডিফল্টারের (স্বেচ্ছায় যারা ঋণ পরিশোধ করে না) ক্ষেত্রে কঠিন পদক্ষেপ এখনো পর্যন্ত নিতে পারিনি, এটা একদম পরিষ্কার। এ ছাড়া এই ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে বেশকিছু আইনি জটিলতা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। এ ছাড়া অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে পাঁচ থেকে সাত বছরের দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে ব্যাংকগুলো নিজেরাই মামলা করতে খুব একটা আগ্রহী হয় না।
পরিত্রাণের উপায়: পরিস্থিতি সামাল দিতে অবিলম্বে শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালায় কঠোরতা আনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংক খাতের এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
এমএম মাসুদ
