অজানা গন্তব্যে দেশের শিল্প খাত- ডা. শফিকুর রহমান

অজানা গন্তব্যে দেশের শিল্প খাত- ডা. শফিকুর রহমান

ফন্ট সাইজ:

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকসহ পুরো শিল্প উৎপাদনে চরম ধস নেমেছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এবং বাংলাদেশ থেকে অর্ডার অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কারখানা বন্ধ, ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাই এবং ব্যাংক ঋণখেলাপির পরিমাণ বেড়ে দেশ এক অনিশ্চিত অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হবে বলে তিনি সতর্ক করেন। শনিবার বগুড়া সার্কিট হাউজে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, শিল্পের মূল চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ এবং জাতীয় সংসদের সরকারি দলের ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যরাও সংসদে স্বীকার করেছেন যে, শিল্প খাত এখন এক অজানা গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের অজুহাত দিয়ে সরকার ছয় মাস পার করলেও কার্যকর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দেশি-বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম দিয়ে সরকারকে বিনামূল্যে সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়া হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বিদ্যুতের লাইন লম্বা হওয়া সংক্রান্ত নানা দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলে সংকটকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো গুরুতর বিষয়ের পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা চব্বিশের বিপ্লব পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও গণভোটের প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে দেশ এক ভয়াবহ ট্রমা ও যন্ত্রণার মধ্যদিয়ে গেছে। বহু রাজনৈতিক নেতা গুম হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন এবং শত শত পরিবার এখনো স্বজন হারানোর কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশের শাসনযন্ত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে চব্বিশের বিপ্লবের পর একটি ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের সংস্কারকামী দলগুলো এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং দেশের ৮২.২ শতাংশ জনগণ এই সংস্কার ও গণভোটের পক্ষে সুস্পষ্ট রায় দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই জনগণের সঙ্গে করা ওয়াদার বরখেলাপ করেছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করছে। ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায় অমান্য করার কারণেই দেশে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। জনগণের ভোটের রায়কে অবহেলা বা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কারও নেই; গণরায় অমান্য করা মানেই জনগণকে অপমান করা।

বিদ্যুৎ সংকট সমাধান এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ মোট ৬টি মৌলিক দাবিতে জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। বাকি দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশে বিরাজমান বৈষম্য দূরীকরণ, বেপরোয়া দলীয়করণ বন্ধ করা, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে আনা এবং কৃষকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত করা।

আন্দোলনের কৌশল ব্যাখ্যা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদের ভেতরে দাবি আদায়ের পথ রুদ্ধ দেখে তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। আন্দোলনের প্রথম পর্যায় শেষে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রতীকী কাফেলা নিয়ে লংমার্চ কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। লংমার্চের গাড়ি ব্যবহার ও জ্বালানি খরচ নিয়ে সরকারের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, আন্দোলনরত মানুষেরা জাতীয় প্রয়োজনে ও জনগণের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করছেন। সরকারের নানামুখী ভয়ভীতি ও আশঙ্কার তোয়াক্কা না করে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ এই কর্মসূচিতে যোগ দিলেও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি, আন্দোলন সম্পূর্ণ সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ ছিল। আগামী দিনে ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে দ্বিতীয় পর্বের লংমার্চ কর্মসূচি পালন করা হবে এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই অহিংস আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি ঘোষণা দেন।

বগুড়ার উন্নয়ন ও অবহেলা প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্বাধীনতার আগে বগুড়া ছিল পুরো উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ও শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও এই অঞ্চলটি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে সার্বিকভাবে বঞ্চিত রয়েছে। বগুড়ায় কেবল একটি মেডিকেল কলেজ ছাড়া বড় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিল্পকারখানা গড়ে উঠেনি, রাস্তাঘাটের অবস্থাও নাজুক। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অন্য কোনো কারণে বগুড়াকে অবহেলিত রাখা সমীচীন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দেশের যেকোনো প্রান্তের অসঙ্গতি ও দাবির পাশাপাশি বগুড়ার ন্যায্য পাওনা আদায়েও তিনি সংসদে সোচ্চার ভূমিকা পালন করবেন।

সভায় উপস্থিত ছিলেন, জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগরীর আমীর আবিদুর রহমান সোহেল, ঢাকা মহানগর উত্তরের যুব বিভাগের সেক্রেটারি ড. ফয়সাল পারভেজ, বগুড়া জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক নূর মোহাম্মাদ, মহানগরীর আইন সম্পাদক শাহীন মিয়া, মহানগরীর প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক ইকবাল হোসেন, নুরুল ইসলাম আকন্দ, আইবিডাব্লুএফ’র মহানগরী সভাপতি মাহফুজুল হক মোল্লা।

ভোরে ডা. শফিকুর রহমান বগুড়ার ধুনটে শহীদ আব্দুল মালেকের কবর জিয়ারত করেন। এরপর জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগরীর আমীর আবিদুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডা. শফিকুর রহমান। রুকন সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ সাহাবুদ্দিন, আঞ্চলিক সহকারী পরিচালক নজরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী, কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগের সদস্য ও দারুসসুফফা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল আজিজ, বগুড়া জেলা জামায়াতের আমীর আব্দুল হক, মহানগরের নায়েবে আমীর আব্দুল হালিম বেগ, জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল হাকিম, অধ্যাপক আব্দুল বাসেদ, মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি আসম আব্দুল মালেক। বগুড়া জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মানছুরুর রহমান।