আনোয়ার ইব্রাহিমের জোট থেকে বের হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত উম্নোর

আগাম নির্বাচন দাবি জাহিদ হামিদির

আনোয়ার ইব্রাহিমের জোট থেকে বের হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত উম্নোর

ফন্ট সাইজ:

মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন জোটের অন্যতম প্রধান শরিক ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (উম্নো) আগাম সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন বর্তমান জোট সরকার থেকে ভবিষ্যতে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক ইঙ্গিত দিয়েছে। দলটির সভাপতি ও দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আহমাদ জাহিদ হামিদি আগামী ১৬তম সাধারণ নির্বাচন অবিলম্বে আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টসহ স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শুক্রবার কুয়ালালামপুরের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের উম্নোর সাধারণ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে জাহিদ হামিদি বলেন, “১৬তম সাধারণ নির্বাচন এখনই অনুষ্ঠিত করার সময় এসেছে।” তিনি দলীয় প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, যেহেতু উম্নো ইতোমধ্যে রাজনৈতিক লড়াইয়ে নেমেছে, তাই সেই লড়াই শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে।

জাহিদ হামিদির এই বক্তব্যকে উম্নোর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তিনি বলেছিলেন, বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) আগাম নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও সংসদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। এদিকে মালয়েশিয়ায় পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৮ সালের শুরুর মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও জাহিদের আগাম নির্বাচনের আহ্বান কেবল নির্বাচন এগিয়ে আনার দাবি নয়; এর মাধ্যমে উম্নো বর্তমান পাকাতান হারাপান (পিএইচ)-উম্নো সমন্বিত ঐক্য সরকারের বাইরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। বিশেষ করে বিরোধী ইসলামপন্থী দল পেরিকাতান ন্যাশনালের (পিএন) প্রধান দল প্যান-মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি (পিএএস)-এর সঙ্গে উম্নোর সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা এ আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

উম্নোর সাধারণ সম্মেলনে এবার পিএএস নেতাদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপানের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। পিএএসের নেতাদের উম্নোর সম্মেলনে উপস্থিতি দুই দলের মধ্যে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে কেলান্তানে অনুষ্ঠিত পিএএসের বার্ষিক সম্মেলনেও উম্নোর নেতারা অংশ নিয়েছিলেন—এমনই তথ্য দিয়েছে মালয় মেইল।
দেশটির জাতীয় সংবাদ সংস্থা বারনামা লিখেছে, জাহিদ হামিদি তার বক্তব্যে ‘গ্র্যান্ড কোলাবোরেশন’ বা বৃহত্তর রাজনৈতিক সহযোগিতার ধারণা তুলে ধরেছেন। তিনি এটিকে কোনো রাজনৈতিক দলের একীভূতকরণ নয়, বরং বিভিন্ন দলের মধ্যে ‘তাফাহুম সিয়াসি’ বা রাজনৈতিক বোঝাপড়া হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেই অভিন্ন স্বার্থে সহযোগিতা করতে পারে।

তিনি বলেন, “উম্নো উম্নোই থাকবে, বারিসান ন্যাশনাল বারিসান ন্যাশনালই থাকবে।” একই সঙ্গে তিনি মালয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত কমিয়ে বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন। জাহিদের বক্তব্যে মালয় ভোটকে একত্রিত করার রাজনৈতিক প্রচেষ্টার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে লিখেছে বারনামা। সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে জাহিদ হামিদির বিএন ও উম্নোর সাফল্য দলটির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। জুলাইয়ে জোহর রাজ্য নির্বাচনে বিএন ৫৬টি আসনের মধ্যে ৪৮টি আসনে জয় পেয়েছে। আগস্টে নেগেরি সেম্বিলান রাজ্যে বিএন ও পিএন-এর নির্বাচনী সহযোগিতায় ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টি আসন দখলে আসে। উম্নো সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ১৬টি আসনের সবকটিতেই জয় পায় বলে জানিয়েছে চ্যানেল নিউজ এশিয়া (সিএনএ)।

সিএনএ আরও লিখেছে, এই সাফল্যের পর উম্নোর মধ্যে আবার কেন্দ্রীয় সরকারে নেতৃত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা জোরালো হয়েছে। জাহিদ হামিদি বলেছেন, ‘ব্লু ওয়েভ’ বা নীল ঢেউ কেবল সরকারে উম্নোর একটি সহযোগী দল হিসেবে থাকার জন্য নয়; আগামী ১৬তম সাধারণ নির্বাচন হবে দেশ পরিচালনার নেতৃত্বের ম্যান্ডেট পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, সময় যত এগোবে, উম্নো ও পিএএসের মধ্যে সম্ভাব্য আসন বণ্টন, নেতৃত্ব এবং মালয় রাজনৈতিক জোটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতপার্থক্য বাড়তে পারে। ফলে উম্নোর বর্তমান নির্বাচনী সাফল্য কাজে লাগিয়ে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা দলটির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অন্যদিকে, আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন ঐক্য সরকারে উম্নোর অবস্থান নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ঝুলন্ত পার্লামেন্টের প্রেক্ষাপটে আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বে পাকাতান হারাপান, বারিসান ন্যাশনালসহ কয়েকটি রাজনৈতিক জোট নিয়ে সরকার গঠিত হয়। তবে সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনে উম্নো ও পাকাতান হারাপান পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় দুই পক্ষের রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
এদিকে উম্নোর এবারের সম্মেলনে জাহিদ হামিদি রাজনৈতিক চুক্তি ও অংশীদারদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, দিনের বেলায় কোনো অংশীদারের সঙ্গে সমঝোতা করে রাতে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করা উচিত নয় বলে লিখেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। তবে অনেকের মতে, তার এই বক্তব্য বর্তমান ঐক্য সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের প্রতিও একটি পরোক্ষ বার্তা হতে পারে।

উম্নো এবারের সম্মেলনে ‘এজেন্ডা মালয়েশিয়া বিরু’ বা ‘ব্লু মালয়েশিয়া এজেন্ডা’ও উপস্থাপন করেছে। অর্থনীতি, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক কল্যাণ, সুশাসন ও জাতীয় স্থিতিশীলতাসহ আটটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এ কর্মসূচিতে। বিএন ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় সরকারে নেতৃত্ব পেলে এটি তাদের নীতিগত রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে বলে জানিয়েছে দলীয় নেতৃত্ব। এদিকে সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও উম্নোর সাবেক সভাপতি নাজিব রাজাকের প্রসঙ্গও বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। কারাগারে থাকা নাজিবের স্ত্রী রোসমাহ মানসুরকে সম্মেলনে ভিআইপি মর্যাদায় স্বাগত জানানো হয়। এর এক দিন আগে উম্নোর নারী শাখার প্রধান নোরাইনি আহমাদ বলেছিলেন, দল নাজিবকে ভুলে যায়নি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য ইতিহাস মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই।

সব মিলিয়ে, জাহিদ হামিদির আগাম নির্বাচনের সরাসরি আহ্বান, পিএএসের সঙ্গে উম্নোর বাড়তে থাকা ঘনিষ্ঠতা এবং ‘গ্র্যান্ড কোলাবোরেশন’-এর প্রস্তাব মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে মালয়েশিয়ার আগামী ১৬তম সাধারণ নির্বাচনের আগে আনোয়ার ইব্রাহিমের ঐক্য সরকার কতটা স্থিতিশীল থাকবে এবং উম্নো শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ে যাবে—এখন সেটিই দেশটির রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।