বিশ্ব কূটনীতির সবচেয়ে বড় মঞ্চে বাংলাদেশের জন্য তৈরি হয়েছে এক বিরল মুহূর্ত। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির আসনে এখন বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান। আর কয়েক দিনের মধ্যেই একই মঞ্চে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একজন সভাপতির আসনে বসে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের বিতর্ক পরিচালনা করবেন, অন্যজন তুলে ধরবেন বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থান ও স্বার্থ।
একই মঞ্চে দুই বাংলাদেশ। একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় কূটনৈতিক দৃশ্য খুব বেশি আসে না।
৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পুরো এক বছরের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’ আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ।
এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য প্রতীকী অর্জন নয়। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই দায়িত্বের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ওজনও অনেক বেশি।
কারণ জাতিসংঘ এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, জলবায়ু সংকট, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট একসঙ্গে চাপ তৈরি করছে। এমন সময়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব হলো বিভক্ত রাষ্ট্রগুলোকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখা, মতপার্থক্যের মধ্যেও সংলাপের জায়গা তৈরি করা এবং সাধারণ পরিষদের মর্যাদা ও কার্যকারিতা ধরে রাখা।
ড. খলিলুর রহমানের সামনে তাই শুধু সভাপতির চেয়ার নয়, আন্তর্জাতিক আস্থা ধরে রাখার পরীক্ষাও।
এই আসনে বাংলাদেশের যাত্রাও সহজ ছিল না। গত ২ জুন সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনে ড. খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিস পান ৯১ ভোট। মোট ১৯০টি ব্যালট পড়েছিল; কোনো অবৈধ ভোট বা বিরত ভোট ছিল না। অর্থাৎ ব্যবধান মাত্র আট ভোট।
এই ফলের মধ্যে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও আছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো জয়ই নিশ্চিত নয়। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমর্থন ধরে রাখা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় অঙ্গনে আস্থা তৈরি করাই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের জন্য এই জয় তাই শুধু একটি পদ পাওয়া নয়; এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি পরিমাপও। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বাংলাদেশ এর আগে বসেছিল ১৯৮৬ সালে। ৪১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
চার দশক পর আবার বাংলাদেশের একজন এই আসনে। পার্থক্য হলো, তখনকার বিশ্ব আর আজকের বিশ্ব এক নয়। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ পর্বের সেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বদলে আজকের বিশ্ব বহুমেরুকেন্দ্রিক, সংঘাতপ্রবণ এবং অনেক বেশি বিভক্ত। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের একজন কূটনীতিকের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাঁর নিরপেক্ষতা।
ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর নিজ বক্তব্যে জোর দিয়েছেন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্বের ওপর। তিনি তাঁর দপ্তরে ভৌগোলিক, লিঙ্গ ও ভাষাগত ভারসাম্য নিশ্চিত করার কথা বলেছেন এবং ছোট দেশগুলোর প্রতিনিধিদের প্রয়োজনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন। এখানেই তাঁর জন্য বড় সুযোগ।
কারণ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বড় শক্তিগুলোর পাশাপাশি ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোরও সমান ভোট রয়েছে। বাংলাদেশের নিজের অভিজ্ঞতাও উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে অভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, উন্নয়ন অর্থায়ন, অভিবাসন, ঋণ, বাণিজ্য এসব ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান বৃহত্তর গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মিলে যায়।
খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের সময়েই জাতিসংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া সামনে এসেছে। নতুন মহাসচিব নির্বাচন।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬। ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছেন। এখন সেই প্রক্রিয়া হস্তান্তর করা হয়েছে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের কাছে।
এটি নিঃসন্দেহে তাঁর সভাপতিত্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল দায়িত্বগুলোর একটি।
এখানে সামান্য ভুলও সভাপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কোনো প্রার্থী বা কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতি পক্ষপাতের ধারণা তৈরি হলে তা শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতা নয়, বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সুতরাং বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশল হওয়া উচিত—সভাপতির পদকে বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য ব্যবহার না করে, সভাপতির নিরপেক্ষতাকে বাংলাদেশের মর্যাদার শক্তিতে পরিণত করা।
এর মধ্যেই জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কের প্রস্তুতি চলছে। ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হবে সাধারণ বিতর্ক। চলবে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং ২৮ সেপ্টেম্বর আবার অধিবেশন বসবে। বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা এই পর্বে তাঁদের দেশের অবস্থান ও বৈশ্বিক অগ্রাধিকার তুলে ধরবেন।
এই মঞ্চেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পাবে। কারণ এবার বাংলাদেশের অবস্থান শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। একই অধিবেশনের সভাপতির আসনে থাকবেন বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক।
এখানেই ‘একই মঞ্চে দুই বাংলাদেশ’-এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব। একজনের দায়িত্ব পুরো পরিষদের ভারসাম্য রক্ষা করা। অন্যজনের দায়িত্ব বাংলাদেশের স্বার্থ, নীতি ও প্রত্যাশা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।
এই দুই ভূমিকার মধ্যে দূরত্ব যেমন থাকতে হবে, সমন্বয়ও থাকতে হবে। সভাপতির নিরপেক্ষতা যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের বক্তব্যে দেশের পররাষ্ট্রনীতির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও থাকা দরকার।
কী বলবে বাংলাদেশ? প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিরল আন্তর্জাতিক সুযোগে বাংলাদেশ কী বলতে চায়? শুধু অর্জনের কথা বললে হবে না। বাংলাদেশকে এখন দেখাতে হবে, বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোতে তার নিজস্ব অবস্থান কী।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি আগামী দিনের বড় আন্তর্জাতিক সংকটগুলোর একটি। একই সঙ্গে উন্নয়ন অর্থায়ন, বাণিজ্য, অভিবাসন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্যের প্রশ্নও সামনে রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা। বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয়ের বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের মঞ্চে এই সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, প্রবাসী শ্রমবাজার এবং বৈদেশিক বাণিজ্যেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
অর্থাৎ তারেক রহমানের বক্তব্যে যদি জাতীয় স্বার্থ, বৈশ্বিক দক্ষিণের দাবি এবং বাস্তবসম্মত বহুপক্ষীয় সহযোগিতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে উঠে আসে, তাহলে তা শুধু আনুষ্ঠানিক ভাষণ হয়ে থাকবে না; বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি রূপরেখাও হয়ে উঠতে পারে।
ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই গর্বের। ১৯৩ দেশের ভোটে ৯৯ ভোট পাওয়া ছোট অর্জন নয়। জাতিসংঘও তাঁর নির্বাচনকে এমন এক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরেছে, যখন বিশ্বব্যাপী সংকট তীব্র এবং জাতিসংঘ সংস্কার ও নেতৃত্বের বড় প্রশ্ন সামনে রয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পদ পাওয়া আর প্রভাব তৈরি করা এক জিনিস নয়।
সভাপতির চেয়ার থেকে বাংলাদেশ কতটা আস্থা তৈরি করতে পারে, কতটা সংলাপ এগিয়ে নিতে পারে, কতটা ছোট ও উন্নয়নশীল দেশকে নিজেদের কথা বলার জায়গা দিতে পারে, সেটিই হবে আসল সাফল্যের মাপকাঠি।
আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সেই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশের বক্তব্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য ও ভবিষ্যতমুখী করে তুলতে পারেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একজনের হাতে থাকবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হাতুড়ি। অন্যজনের কণ্ঠে থাকবে বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থান।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ তাই এবার শুধু অতিথি নয়, মঞ্চের একেবারে কেন্দ্রে। চার দশক পর আবার বাংলাদেশের একজন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে। আর সেই সময়েই দেশের সরকারপ্রধানও বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের কথা বলবেন।
এ সুযোগ ইতিহাসে বারবার আসে না। এখন প্রশ্ন একটাই বাংলাদেশ কি এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে শুধু উদ্যাপন করবে, নাকি এটিকে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রভাব তৈরির সুযোগে পরিণত করবে?
উত্তরটি নির্ভর করবে নিউইয়র্কের সেই একই মঞ্চে দুই বাংলাদেশের ভূমিকা কতটা বিচক্ষণ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দৃশ্যমান হয় তার ওপর।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
