ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ আমাদের আবারও একটি বিব্রতকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্নটি শুধু কে হামলা করেছে, কেন করেছে কিংবা হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় কী, সেটি নয়। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, বিদেশের মাটিতে আমরা বাংলাদেশের কী পরিচয় তুলে ধরছি?
একজন শিল্পীর রাজনৈতিক অবস্থান আমাদের পছন্দ না হতে পারে। একজন বুদ্ধিজীবীর বক্তব্যের সঙ্গে আমরা তীব্রভাবে দ্বিমত পোষণ করতে পারি। একজন রাজনীতিবিদের অতীত ভূমিকা নিয়ে আমাদের ক্ষোভ থাকতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি দেশের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপের রাস্তায় শারীরিক আক্রমণ, অপমান, ভয় দেখানো কিংবা দলবদ্ধ হেনস্তায় রূপ নেয়, তাহলে সেটি আর শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। আর সেই প্রদর্শনী মোটেও সম্মানের নয়।
বাঁধনের অভিযোগ অনুযায়ী, ইতালিতে অবস্থানকালে একদল বাংলাদেশি তাঁকে হেনস্তা করেন, তাঁর দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন এবং শারীরিকভাবে আক্রমণ করেন। ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্য ও স্লোগানের অভিযোগও এসেছে। ইতালীয় কর্তৃপক্ষের তদন্তেই নির্ধারিত হওয়া উচিত প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল।
কিন্তু তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় থেকেও একটি বৃহত্তর প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা যায়। কারণ এটি প্রথমবার নয় যে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের মানুষকে ঘিরে উত্তেজনা, প্রতিবাদ, অপমান বা সংঘাতের খবর আমরা দেখছি।
বছরের পর বছর ধরে লন্ডন, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, জেনেভা, রোমসহ বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধের প্রতিফলন দেখা গেছে। কোনো নেতা বিদেশ সফরে গেলে বিক্ষোভ হয়েছে, পাল্টা বিক্ষোভ হয়েছে। কখনো কটূক্তি, কখনো ধাক্কাধাক্কি, কখনো সভা পণ্ড করার চেষ্টা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই বিদ্বেষকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছে।
রাজনীতি করা অপরাধ নয়। প্রবাসে রাজনীতি করাও অপরাধ নয়। বরং গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ একটি মৌলিক অধিকার। একজন বাংলাদেশি প্রবাসী আওয়ামী লীগ করতে পারেন, বিএনপি করতে পারেন, জামায়াত, এনসিপি বা অন্য কোনো দলকে সমর্থন করতে পারেন। তিনি শেখ হাসিনার পক্ষে কথা বলতে পারেন, তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন। জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারেন, সমালোচনা করতে পারেন।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন মত প্রকাশের জায়গা দখল করে নেয় ভয় দেখানো এবং সহিংসতা।
দেশ বদলেছে, রাজনৈতিক আচরণ কি বদলেছে?
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশে বসবাস করেন। তাঁরা এসব দেশের আইনের শাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের সুবিধা ভোগ করেন।
লন্ডনে একজন নাগরিক প্রকাশ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে পারেন। জেনেভায় সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করা যায়। রোমে রাজনৈতিক বিরোধীরা একই শহরে নিজেদের কর্মসূচি পালন করতে পারেন। ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করার কারণে সাধারণত কাউকে রাস্তায় ধরে রাজনৈতিক স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয় না।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যখন এসব সমাজে বসবাস করি, তাদের কাছ থেকে কী শিখি?
শুধু উন্নত বেতন, ভালো রাস্তা, সামাজিক নিরাপত্তা আর শক্তিশালী পাসপোর্টের সুবিধা গ্রহণ করাই কি উন্নত সমাজে বসবাসের অর্থ? নাকি সেই সমাজের সহনশীলতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়ার সংস্কৃতিও আমাদের শেখা উচিত?
আমরা ভৌগোলিকভাবে ইউরোপে চলে এসেছি, কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক মনোজগৎ যদি ঢাকার সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির সবচেয়ে অসহিষ্ণু জায়গাটিতেই আটকে থাকে, তাহলে দেশ পরিবর্তন করলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন হয় না।
প্রবাসে বাংলাদেশের রাজনীতি যেন বাংলাদেশের সংঘাতের শাখা না হয়
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশের রাজনীতির সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন, সরকার পরিবর্তন কিংবা জাতীয় সংকট নিয়ে তাঁদের মতামত থাকবে।
বরং প্রবাসী সমাজ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের অর্থ, দক্ষতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে বড় ভূমিকা রাখে।
কিন্তু প্রবাসের রাজনীতি যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাতের বিদেশি শাখায় পরিণত হয়, তাহলে এই শক্তি সম্পদ না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ভাবুন, কোনো ইউরোপীয় শহরের সাধারণ মানুষ যদি দেখেন কয়েকজন বাংলাদেশি নিজেদের রাজনৈতিক বিরোধের কারণে আরেক বাংলাদেশিকে ঘিরে ধরে অপমান করছেন, তখন তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ব্যাখ্যা জানবেন না। তিনি জানবেন না কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি, কে জুলাই আন্দোলনের সমর্থক।
তিনি একটি দৃশ্যই দেখবেন: বাংলাদেশিরা নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক কারণে সংঘাতে জড়াচ্ছেন।
জাতীয় ভাবমূর্তি এভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাঁধনকে পছন্দ না করাও অধিকার
এই আলোচনায় একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন। আজমেরী হক বাঁধনের রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা তাঁর বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে। তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যাবে। তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে।
কারণ একজন শিল্পী নাগরিকও বটে। তিনি রাজনৈতিক অবস্থান নিলে তাঁর সেই অবস্থানও জনপরিসরে সমালোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু কাউকে অপছন্দ করা এবং তাঁকে আক্রমণ করা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই।
আমি আপনার বক্তব্যের বিরোধিতা করব, কিন্তু আপনার বক্তব্য দেওয়ার অধিকার রক্ষা করব। আমি আপনার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি, কিন্তু আপনাকে নিরাপদে সেই অবস্থান প্রকাশ করতে দিতে হবে।
এই নীতিটি শুধু বাঁধনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
আগামীকাল বিদেশে যদি কোনো আওয়ামী লীগ নেতা বা সমর্থক রাজনৈতিক কারণে আক্রান্ত হন, একই ভাষায় তাঁর নিরাপত্তার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। বিএনপির কেউ আক্রান্ত হলেও একই কথা বলতে হবে। জামায়াত, এনসিপি, বামপন্থি, ইসলামপন্থি, ধর্মনিরপেক্ষ, জুলাই আন্দোলনের সমর্থক কিংবা বিরোধী, সবার জন্য একই নীতি হতে হবে।
মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে প্রতিপক্ষের অধিকারের প্রশ্নে নিজের অবস্থান।
শিল্পী ও সংস্কৃতির জায়গাটিও কি নিরাপদ থাকবে না?
বাঁধনের ঘটনাটি আরও বেদনাদায়ক কারণ তিনি একজন সাংস্কৃতিক কর্মী এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বাংলাদেশি অভিনেত্রী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, সংগীত, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মানুষ যখন আন্তর্জাতিক কোনো মঞ্চে যান, তখন তাঁরা শুধু ব্যক্তিগত পরিচয় বহন করেন না। তাঁদের মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ও পৃথিবীর সামনে উপস্থিত হয়। রাজনীতির বিভাজন যদি সেই জায়গাতেও পৌঁছে যায়, তাহলে আমরা সমাজ হিসেবে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?
বাংলাদেশের ইতিহাসে শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন নয়। রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল, জয়নুল আবেদিন থেকে মুনীর চৌধুরী, অসংখ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাঁদের সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে দ্বিমত হয়েছে। বিতর্ক হয়েছে।
কিন্তু একটি সভ্য সমাজের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিতর্ককে আরও শক্তিশালী করা, বিতর্ককারীকে নিশ্চুপ করা নয়।
স্লোগান যখন ভয় দেখানোর ভাষা হয়
বাঁধনের অভিযোগের মধ্যে রাজনৈতিক স্লোগান ব্যবহারের প্রসঙ্গও এসেছে। বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
কোনো ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক স্লোগান মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, শাসন ও তাঁর দল নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ও ভিন্ন মূল্যায়ন থাকবে। এটাই ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম।
কিন্তু একটি ঐতিহাসিক স্লোগানকে কাউকে অপমান বা ভয় দেখানোর উপকরণে পরিণত করা হলে স্লোগানটির সম্মান বাড়ে না। বরং তার ঐতিহাসিক মর্যাদাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই নীতি সব দলের জন্য প্রযোজ্য।
রাজনৈতিক স্লোগান বিশ্বাসের বিষয়। আনুগত্যের বিষয়। সেটি জোর করে আদায় করা যায় না।
সহিংসতা কখনো এক পক্ষের সম্পত্তি থাকে না
বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা হচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতা কখনো স্থায়ীভাবে একটি দলের হাতে থাকে না।
ক্ষমতা বদলায়। রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায়। আজ যে নিপীড়নের শিকার, কাল সে ক্ষমতায় যেতে পারে। আজ যে শক্তিশালী, কাল সে দুর্বল হতে পারে। কিন্তু সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে যায়।
তাই আজ বাঁধনের ওপর হামলাকে কেউ রাজনৈতিক আনন্দের বিষয় হিসেবে দেখলে তিনি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্তকে বৈধতা দিচ্ছেন। আগামীকাল সেই একই দৃষ্টান্ত তাঁর নিজের রাজনৈতিক পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
গণতান্ত্রিক সমাজে তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়, ‘কে আক্রান্ত হয়েছে?’ প্রশ্নটি হওয়া উচিত, ‘কাউকে রাজনৈতিক মতের জন্য আক্রান্ত করা হয়েছে কি না?’
রাষ্ট্রকেও নিরপেক্ষ হতে হবে
বাংলাদেশের সরকার ও বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর দায়িত্ব এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক হামলা, হুমকি বা রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হলে দূতাবাস ও কনস্যুলেটকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে। সেই নাগরিক সরকারের সমর্থক নাকি বিরোধী, সেটি বিবেচ্য হতে পারে না।
রাষ্ট্রের পাসপোর্টে দলীয় প্রতীক থাকে না।
একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেও পরিষ্কার অবস্থান নিতে হবে। বিদেশে দলের নাম ব্যবহার করে কেউ সহিংসতায় জড়ালে তাকে রাজনৈতিক প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
দলগুলো যদি নিজেদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চায়, তাহলে প্রবাসী শাখার আচরণের দায় থেকেও তারা পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারে না।
বিদেশে বাংলাদেশের নতুন পরিচয় দরকার
বাংলাদেশ আজ আর শুধু দারিদ্র্য, দুর্যোগ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার দেশ নয়। বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা, গবেষণা, শিল্প ও ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আমাদের নতুন প্রজন্ম বিশ্ব নাগরিক হিসেবে বড় হচ্ছে।
এই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় হওয়া উচিত মেধা, সংস্কৃতি, পরিশ্রম, উদ্যোক্তা শক্তি এবং সহনশীলতার পরিচয়।
রাজনৈতিক ঘৃণার নয়। ইতালির ঘটনাটি তাই আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। আজ বাঁধন। কাল হয়তো অন্য কেউ। রাজনৈতিক পরিচয়ও উল্টো হতে পারে। আমরা যদি শুধু নিজের পছন্দের মানুষের ওপর হামলা হলে প্রতিবাদ করি এবং প্রতিপক্ষ আক্রান্ত হলে নীরব থাকি, তাহলে আমরা গণতন্ত্র চাইছি না। আমরা শুধু নিজেদের জন্য নিরাপত্তা চাইছি।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের নীতি এত সংকীর্ণ হতে পারে না। মতের জবাব মত দিয়ে দিতে হবে। লেখার জবাব লেখা দিয়ে। বক্তব্যের জবাব বক্তব্য দিয়ে। রাজনীতির জবাব রাজনীতি দিয়ে। আর ক্ষমতার জবাব ব্যালট দিয়ে।
ঘুষি, ডিম, বোতল, হুমকি কিংবা দলবদ্ধ আক্রমণ দিয়ে নয়। ভেনিস পৃথিবীর শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীকী শহর। সেখানে একজন বাংলাদেশি অভিনেত্রীকে ঘিরে যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি কোনো দলের জয় নয়। এটি আমাদের সবার পরাজয়। কারণ পৃথিবী তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জুলাই কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয় দেখছে না। পৃথিবী দেখছে বাংলাদেশিদের।
তাই ইতালির ঘটনার আইনি সত্য ইতালির কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করুক। দায়ীদের পরিচয় তদন্তে বেরিয়ে আসুক এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে চলুক। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই দিতে হবে। আমরা যারা দেশের বাইরে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করি, আমরা পৃথিবীর সামনে কোন বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চাই?
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, জয়নুলের বাংলাদেশ? ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ? শিল্প, সাহিত্য, মানবিকতা ও বহুত্ববাদের বাংলাদেশ? নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দেখলেই ঘিরে ধরা, অপমান করা এবং আক্রমণ করার বাংলাদেশ? ভেনিসের ঘটনা শেষ পর্যন্ত শুধু আজমেরী হক বাঁধনের ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আয়না। এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের আত্মসমালোচনার উপলক্ষ। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটি পৃথিবীর সামনে আমাদের পরিচয়ের প্রশ্ন। বিদেশের মাটিতে আমরা বাংলাদেশের কী পরিচয় দিলাম?
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।
ই-মেইল: [email protected]
