দেশের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত পুরোনো আট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। স্বাধীনতার আগে ও পরের কয়েক দশকে প্রতিষ্ঠিত এসব হাসপাতালই এখনো দেশের অধিকাংশ জটিল, জরুরি ও দরিদ্র রোগীর শেষ আশ্রয়স্থল।
ঢাকা মেডিকেল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল, চট্টগ্রাম মেডিকেল, রাজশাহী মেডিকেল, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল, শের-ই-বাংলা মেডিকেল ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালÑএই আট প্রতিষ্ঠান শুধু চিকিৎসা দেয় না; দেশের চিকিৎসক তৈরি, স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা, গবেষণা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় জরুরি স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশও বহন করে।
সর্বশেষ প্রশাসনিক অনুমোদন বিবেচনায় আট হাসপাতালের মোট শয্যা প্রায় ১০ হাজার ৯০০টি। অথচ বিভিন্ন সময়ের সাম্প্রতিক হাসপাতাল-তথ্য ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন প্রায় ২৪ হাজার থেকে সাড়ে ২৫ হাজার রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন।
অর্থাৎ, অনুমোদিত শয্যার তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ১৩-১৫ হাজার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকেন।
এর সঙ্গে বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগের রোগী যোগ করলে প্রতিদিন কয়েক দশ হাজার মানুষ এই আট হাসপাতালের সেবা নেন। রোগীর স্বজন, দর্শনার্থী, শিক্ষার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রতিদিনের মোট জনসমাগম আরও কয়েক গুণ বেশি।
একনজরে আট হাসপাতাল
রোগীর সংখ্যা দিন, মৌসুম ও রোগের প্রাদুর্ভাব অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। তারপরও আট প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক সক্ষমতা-সংকট এতে স্পষ্ট।
ঢাকা মেডিকেল: ২,৬০০ শয্যায় সাড়ে চার হাজার রোগী
১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। জাতীয় দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ, বড় দুর্ঘটনা, সহিংসতা কিংবা মহামারিÑপ্রতিটি সংকটেই এই হাসপাতালকে সামনে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
হাসপাতালের অনুমোদিত শয্যা ২,৬০০ হলেও প্রতিদিন প্রায় ৪,০০০–৪,৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে প্রায় ৪,০০০-৫,০০০ এবং জরুরি বিভাগে ১,০০০-১,৩০০ রোগী আসতে পারেন। সব মিলিয়ে হাসপাতালটি প্রতিদিন প্রায় ১০-১২ হাজার মানুষকে চিকিৎসা দেয়।
শয্যা না পেয়ে রোগীরা মেঝে, বারান্দা, করিডর ও সিঁড়ির পাশে চিকিৎসা নেন। হাসপাতাল পরিচালকের প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, বহির্বিভাগে প্রায় ৭০ এবং জরুরি বিভাগে সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ চিকিৎসককে বিপুলসংখ্যক রোগী সামলাতে হয়।
হাসপাতালের ক্যাথল্যাব মেশিন ও ৩টি সিটি স্ক্যান মেশিন দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট।
আইসিইউ এর অনেকগুলো ভেন্টিলেটরও দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট।
ঢাকা মেডিকেলকে পাঁচ হাজার শয্যায় উন্নীত করার আগের পরিকল্পনা বাতিল হওয়ার পর চার হাজার শয্যার নতুন পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শয্যার সঙ্গে জনবল, বাজেট, আইসিইউ ও ডায়াগনস্টিক সক্ষমতা না বাড়লে সংকট থেকেই যাবে।
মিটফোর্ড: ৯০০ শয্যায় ১,২০০ রোগী
১৮৫৮ সালের ১ মে যাত্রা শুরু করা মিটফোর্ড হাসপাতাল দেশের প্রাচীনতম হাসপাতালগুলোর অন্যতম। পুরান ঢাকা, কেরানীগঞ্জ ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অসংখ্য মানুষের ভরসা এই প্রতিষ্ঠান।
৯০০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১,০০০-১,২০০ রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে প্রায় তিন হাজার এবং জরুরি বিভাগে প্রায় এক হাজার বা তার বেশি রোগী আসেন। সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে অনুমোদিত ৩৭৫ চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন ৩৫৯ জন; ৭৭৬ নার্স পদের বিপরীতে ছিলেন ৬৩৮ জন এবং ৪৩ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদের বিপরীতে ছিলেন ৩৫ জন।
হাসপাতালের ২৭টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে ২১টি সচল এবং ছয়টি নষ্ট, এমআরআই বন্ধ এবং দুটি সিটি স্ক্যানের একটি নষ্ট থাকায় রোগীদের অপেক্ষা ও বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হয়েছে।
মিটফোর্ডকে দুই হাজার শয্যায় উন্নীত এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জায়গায় নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল: এক হাজার শয্যায় প্রায় সাড়ে চার হাজার রোগী
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬২ সালে। ১৯৭২ সালে চরপাড়ার বর্তমান ক্যাম্পাসে ৫০০ রোগীর চিকিৎসার সক্ষমতা নিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। ২০১৩ সালে নতুন ভবন চালুর মাধ্যমে হাসপাতালটি এক হাজার শয্যায় উন্নীত হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন ২০২৩ অনুযায়ী, হাসপাতালটির শয্যা ব্যবহারের হার ছিল ৩২৬.৫ শতাংশ। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার হাজার রোগী ভর্তি এবং বহির্বিভাগে প্রায় পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ৪২৫ হলেও শতাধিক পদ শূন্য থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বহির্বিভাগের প্রায় পাঁচ হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেন মাত্র ৫০ জন চিকিৎসকÑগড়ে একজনের সামনে প্রায় ১০০ রোগী।
হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে ২০২৬ সালে পৃথক এক হাজার শয্যার আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত হাসপাতালে আইসিইউ, সিসিইউ, ডায়ালাইসিস ও ট্রমা ইউনিট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল: পাঁচ বছরে জরুরি রোগী বেড়েছে ৯১ শতাংশ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে। ২০২২ সালে হাসপাতালটি ১,৩১৩ থেকে ২,২০০ শয্যায় উন্নীত হয়।
২০২৩ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের শয্যা ব্যবহারের হার ছিল ১৩৯.৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন।
২০২৫ সালে হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৩৬৮, জরুরি বিভাগে চার লাখ ১৬ হাজার ৪২২ এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডে তিন লাখ দুই হাজার ৬৪৭ রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন।
২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালেÑ
* বহির্বিভাগের রোগী বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ
* জরুরি বিভাগের রোগী বেড়েছে ৯১ শতাংশ
* ভর্তি রোগী বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ
শিশু বিভাগে ১৩০ অনুমোদিত শয্যার বিপরীতে প্রায় ৪০০ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শয্যায় তিন থেকে চার শিশু এবং একই অক্সিজেন লাইনে একাধিক রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চে হাসপাতালের একমাত্র কার্যকর এমআরআই যন্ত্রটি আবার বিকল হয়। প্রায় ১০ কোটি টাকার যন্ত্রটি এর আগে প্রায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে মেরামত করা হয়েছিল। চট্টগ্রামে ৪৫০ শয্যার ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগ হাসপাতাল এবং ১৫০ শয্যার বার্ন ইনস্টিটিউট দ্রুত চালু হলে মূল হাসপাতালের চাপ কিছুটা কমতে পারে।
রাজশাহী মেডিকেল: আইসিইউ অনুমোদন বাড়লেও জনবলই বড় প্রশ্ন
১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। ২০১৩ সালে হাসপাতালটি ১,২০০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ১০০ শয্যার সরকারি আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের অংশ হিসেবে মোট শয্যা ১,৩০০ করার প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালে সাধারণত প্রায় ৩,০০০-৩,৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। রোগের প্রাদুর্ভাব ও অতিরিক্ত চাপের সময়ে রোগী পাঁচ হাজার ছাড়ানোর তথ্যও রয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ের আগে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ৪৬টি আইসিইউ শয্যা চালু ছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও ৫৪টি যুক্ত করে মোট ১০০ আইসিইউ শয্যার অনুমোদন দিয়েছে। তবে নতুন শয্যা চালাতে আলাদা জনবল কাঠামো প্রয়োজন।
শিশু বিভাগের প্রায় ২০০ সাধারণ শয্যার বিপরীতে এক হাজার পর্যন্ত শিশু চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। শিশুদের জন্য আইসিইউ ছিল মাত্র ১২টি; পরে সংকটের সময় তা ১৮টিতে উন্নীত করা হয়।
রাজশাহী বিভাগের ৯৪ আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৪৪টি প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে অচল থাকায় জেলার সংকটাপন্ন রোগীদের চাপও রাজশাহী মেডিকেলে গিয়ে পড়ে।
ওসমানী মেডিকেল: ৯০০ শয্যায় আড়াই হাজার রোগী
সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সিলেট বিভাগের চার জেলাÑসিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মানুষের প্রধান সরকারি টারশিয়ারি চিকিৎসাকেন্দ্র।
হাসপাতালের অনুমোদিত শয্যা প্রায় ৯০০ হলেও প্রতিদিন আড়াই হাজারের কাছাকাছি রোগী ভর্তি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। জরুরি ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে আরও প্রায় তিন হাজার রোগী প্রতিদিন চিকিৎসা নেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে হাসপাতালের শয্যা ব্যবহারের হার ছিল ১৭৭ শতাংশ; তার আগের বছর তা ২২০ শতাংশ ছাড়িয়েছিল।
হাসপাতালটির ওপর বিপুল চাপের বড় কারণ জেলা পর্যায়ে আইসিইউ, সিসিইউ, বিশেষজ্ঞ, উন্নত পরীক্ষা এবং জটিল অস্ত্রোপচারের সীমিত সক্ষমতা। ফলে বিভাগের অধিকাংশ জটিল রোগী ওসমানী মেডিকেলেই পাঠানো হয়।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল: ৩৬০ শয্যার অবকাঠামোয় তিন হাজার রোগী
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল।
হাসপাতালটি মূলত ৩৬০ শয্যার অবকাঠামো নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিকভাবে প্রথমে ৫০০ এবং পরে ১,০০০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও অবকাঠামো ও জনবল সেই অনুপাতে বাড়েনি।
প্রতিদিন প্রায় ৭০০-৭৫০ জন নতুন রোগী ভর্তি হন এবং হাসপাতালে মোট চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। বহির্বিভাগেও প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগী আসেন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রেজিস্ট্রারের ৪৯ পদের বিপরীতে ৩৩ জন এবং সহকারী রেজিস্ট্রারের ৯৬ পদের বিপরীতে ৬৭ জন কর্মরত ছিলেন। এ পদসংখ্যাও পুরোনো ৫০০ শয্যার কাঠামোর ভিত্তিতে।
২০২৪ সালে হাসপাতালের এমআরআই, একাধিক এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও অন্যান্য যন্ত্র দীর্ঘদিন অচল থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়।
রংপুর মেডিকেল: দুটি সিটি স্ক্যান অচল, ক্যাথল্যাব সার্ভিস অপ্রতুল।
১৯৬৬ সালে ৫০০ শয্যার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১৯ মার্চ হাসপাতাল ভবন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে অনুমোদিত শয্যা এক হাজার।
কিন্তু প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। অথচ জনবল এখনো মূলত পুরোনো ৫০০-৬০০ শয্যার কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
২০২৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদনে হাসপাতালের দুটি সিটি স্ক্যানই অচল।
জুন ২০২৬-এর পরিদর্শনে দেখা যায়Ñ
* ২৬টি এক্স-রে মেশিনের ২৪টি অচল
* তিনটি সিটি স্ক্যানের দুটি অচল
* তিনটি এমআরআইয়ের দুটি অচল
* ১৩টি আলট্রাসনোগ্রামের ১০টি অচল
* আইসিইউ শয্যা মাত্র ১০টি
রংপুরে কিডনি, ক্যানসার ও হৃদরোগের জন্য ৫৬০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে বর্তমান সংকট আরও বাড়বে।
আট হাসপাতালের অভিন্ন সংকট
শয্যা বাড়ে, জনবল বাড়ে না
এই আট হাসপাতালের প্রায় প্রতিটিতেই একই চিত্রÑশয্যাসংখ্যা প্রশাসনিকভাবে বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও সহায়ক জনবল দেওয়া হয়নি।
কোনো হাসপাতাল চলছে ২৫০, ৫০০ বা ৬০০ শয্যার পুরোনো জনবল কাঠামো দিয়ে; অথচ অনুমোদিত শয্যা এক থেকে দুই হাজার এবং প্রকৃত রোগী তারও কয়েক গুণ।
শুধু শয্যার সংখ্যা বাড়ানোকে হাসপাতাল সম্প্রসারণ বলা যায় না। প্রতিটি নতুন শয্যার সঙ্গে প্রয়োজনÑ
* চিকিৎসক
* নার্স
* মেডিকেল টেকনোলজিস্ট
* ফার্মাসিস্ট
* ওয়ার্ডবয় ও আয়া
* পরিচ্ছন্নতাকর্মী
* অক্সিজেন
* ওষুধ ও পথ্য
* ডায়াগনস্টিক সুবিধা
* পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট
আইসিইউ যেন সোনার হরিণ
আন্তর্জাতিক কোনো একক অনুপাত সব হাসপাতালের জন্য প্রযোজ্য না হলেও বড় টারশিয়ারি হাসপাতালে রোগীর ধরন ও জটিলতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ক্রিটিক্যাল কেয়ার শয্যা অপরিহার্য।
কিন্তু রংপুর মেডিকেলে প্রায় তিন হাজার রোগীর জন্য আইসিইউ মাত্র ১০টি। মিটফোর্ডে ২০টি আইসিইউ শয্যার তথ্য পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামে সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রায় ৬০ করা হলেও রোগীর তুলনায় তা অপ্রতুল। রাজশাহীতে ১০০ শয্যার অনুমোদন ইতিবাচক, কিন্তু জনবল ছাড়া সব শয্যা চালু করা সম্ভব নয়।
জেলা পর্যায়ের আইসিইউ জনবলসংকটে বন্ধ থাকায় সংকটাপন্ন রোগী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভিড় করেন। কেন্দ্রীয় হাসপাতালেও শয্যা না পেয়ে পরিবারকে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয় অথবা অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে হয়।
যন্ত্র কেনা হয়, রক্ষণাবেক্ষণ হয় না
সরকারি হাসপাতালের সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ক্যাথল্যাব, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ডায়ালাইসিস মেশিন দীর্ঘদিন অচল থাকা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
রংপুরে প্রায় ৬০০ যন্ত্র অচল থাকার তথ্য এসেছে। চট্টগ্রামের প্রায় ১০ কোটি টাকার এমআরআই প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামতের নয় মাস পর আবার নষ্ট হয়েছে। মিটফোর্ডে এমআরআই বন্ধ ও একটি সিটি স্ক্যান নষ্ট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বরিশালে একসময় বিপুলসংখ্যক যন্ত্র অচল থাকলেও কেন্দ্রীয় কারিগরি দলের মাধ্যমে ৯৫টি যন্ত্র সচল করা সম্ভব হয়েছে।
বরিশালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছেÑদ্রুত কারিগরি উদ্যোগ নিলে অনেক যন্ত্র মেরামত সম্ভব। তাই প্রতিটি পুরোনো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থায়ী বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ও রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিট প্রয়োজন।
রোগীর বরাদ্দ শয্যার হিসাবে, চিকিৎসা কয়েক গুণ বেশি মানুষকে
সরকারি হাসপাতালের খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও পরিচালন ব্যয় সাধারণত অনুমোদিত শয্যা ও বার্ষিক বাজেটের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু ১,০০০ শয্যার হাসপাতালে তিন বা সাড়ে চার হাজার রোগী থাকলে অতিরিক্ত রোগীদের জন্য সমপরিমাণ নিয়মিত খাদ্য, ওষুধ, অক্সিজেন, বিছানাপত্র, পরিচ্ছন্নতা এবং নার্সিং জনবল থাকে না।
ফলে সীমিত বরাদ্দ প্রয়োজন ও মজুত অনুযায়ী কয়েক গুণ বেশি রোগীর মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়।
মেঝেতে চিকিৎসা চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত নয়
একটি শয্যায় একাধিক রোগী, মেঝে, বারান্দা ও করিডরে চিকিৎসাÑএসব দৃশ্যের জন্য সাধারণত চিকিৎসক ও নার্সদের দোষারোপ করা হয়।
কিন্তু শয্যা না থাকলেও রোগীকে ফিরিয়ে না দিয়ে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসক রোগীর জন্য শয্যা, আইসিইউ, নার্স, ওষুধ কিংবা সিটি স্ক্যান তৈরি করতে পারেন না।
এই সংকটের মূল কারণÑ
* অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য বাজেট
* বাস্তবসম্মত জনবল পরিকল্পনার অভাব
* জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের দুর্বলতা
* অকার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা
* যন্ত্রপাতির দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ
* প্রকৃত রোগীর সঙ্গে বরাদ্দের অসামঞ্জস্য
* স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ
জাতীয়ভাবে যা করা জরুরি
১. রিয়েল-টাইম হাসপাতাল শুমারি: প্রতিটি হাসপাতালে প্রতিদিন অনুমোদিত শয্যা, ভর্তি রোগী, মেঝের রোগী, খালি আইসিইউ ও জরুরি শয্যার তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
২. প্রকৃত রোগীভিত্তিক বাজেট: অনুমোদিত শয্যা নয়, গত তিন বছরের প্রকৃত রোগী ও রোগী-দিনের ভিত্তিতে খাদ্য, ওষুধ ও পরিচালন বাজেট দিতে হবে।
৩. নতুন জনবল কাঠামো: আট হাসপাতালের বর্তমান রোগীর ভিত্তিতে পৃথক জনবল নিরীক্ষা করে নতুন অর্গানোগ্রাম অনুমোদন করতে হবে।
৪. আইসিইউ সম্প্রসারণ: আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ, পিআইসিইউ, এনআইসিইউ ও পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ার বাড়াতে হবে। প্রতিটি শয্যার সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ২৪ ঘণ্টার জরুরি ডায়াগনস্টিক: সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে, ল্যাব ও ব্লাড ব্যাংক সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হবে।
৬. বায়োমেডিকেল রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিট: প্রতিটি হাসপাতালে প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, যন্ত্রাংশ ও বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটসহ স্থায়ী ইউনিট করতে হবে।
৭. জাতীয় ক্যাথল্যাব নেটওয়ার্ক: বিভাগীয় মেডিকেল কলেজগুলোতে ২৪/৭ ক্যাথল্যাব, প্রাইমারি পিসিআই ও জরুরি পেসমেকার সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. জেলা হাসপাতাল শক্তিশালীকরণ: জেলা পর্যায়ে আইসিইউ, সিসিইউ, ডায়ালাইসিস, অপারেশন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা চালু করে অপ্রয়োজনীয় রেফারেল কমাতে হবে।
৯. জাতীয় রেফারেল প্রটোকল: কোন রোগী উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় বা জাতীয় হাসপাতালে যাবেনÑতার সুনির্দিষ্ট প্রটোকল ও ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
১০. চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সুরক্ষা: অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বকালীন বিশ্রাম, নিরাপদ কর্মস্থল এবং হামলা–সহিংসতা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
দায় চিকিৎসকদের নয়, ব্যবস্থার
দেশের পুরোনো আট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন চিকিৎসাব্যবস্থার ভারে ন্যুব্জ। প্রায় ১১ হাজার অনুমোদিত শয্যায় ২৪–২৫ হাজার ভর্তি রোগীর চিকিৎসা দেওয়া কোনো স্বাভাবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নয়।
তারপরও চিকিৎসকেরা রোগী দেখছেন। নার্সরা দিন-রাত সেবা দিচ্ছেন। ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকেরা বিশ্রামহীনভাবে ওয়ার্ড ও জরুরি বিভাগ সামলাচ্ছেন। টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা সীমিত সম্পদের মধ্যে হাসপাতালগুলো সচল রাখছেন।
সেবার ঘাটতির জন্য শুধু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়ী করা সহজ। কিন্তু প্রয়োজনীয় শয্যা, জনবল, ওষুধ, আইসিইউ ও সচল যন্ত্র না দিয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে চাপিয়ে রাখা চরম অবিচার।
এই আট হাসপাতালকে বাঁচানো মানে বাংলাদেশের সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার মেরুদণ্ডকে বাঁচানো।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কোনো যন্ত্র ননÑতাঁরাও মানুষ। তাঁদের সীমাহীন ত্যাগের ওপর দেশের হাসপাতালগুলো অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। চিকিৎসাসেবা কোনো অনুগ্রহ নয়Ñএটি মানুষের মৌলিক অধিকার।
লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট,বিভাগীয় প্রধানÑকার্ডিওলজি, পপুলার মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল।
