সরকারি হাসপাতালের নতুন পরিদর্শক: ভাতের হোটেল মিজান শুধু বাকি!

সরকারি হাসপাতালের নতুন পরিদর্শক: ভাতের হোটেল মিজান শুধু বাকি!

ফন্ট সাইজ:

এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক রম্যরচনা। এখানে ব্যবহৃত চরিত্র ও সংলাপ প্রতীকী ও কাল্পনিক। মূল প্রতিবাদের বিষয়—সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শনের নামে ক্যামেরা-কেন্দ্রিক প্রদর্শনী, একতরফা মিডিয়া ট্রায়াল এবং চিকিৎসক-নার্সদের প্রকাশ্যে হেয় করার সংস্কৃতি।

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সম্ভবত নতুন এক ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতি চালু হয়েছে। এর নাম দেওয়া যেতে পারে—‘ক্যামেরা থেরাপি’। রোগীর শয্যা নেই? ক্যামেরা আনুন। চিকিৎসক-নার্স কম? ক্যামেরা আনুন। আইসিইউ নেই? ক্যামেরা আনুন। ওষুধ নেই? ক্যামেরা আনুন। সিটি স্ক্যান, এমআরআই কিংবা এনজিওগ্রাম মেশিন নষ্ট? আরও বড় ক্যামেরা আনুন! মন্ত্রী, এমপি কিংবা আমলা—যিনিই পরিদর্শনে যান, সঙ্গে থাকবে মাইক্রোফোনের বহর, ক্যামেরার ঝলকানি এবং আগে থেকে প্রস্তুত কয়েকটি বজ্রকণ্ঠের ধমক।

হাসপাতালের শয্যা, জনবল, ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও বাজেট কে অনুমোদন করেন—তা জানার প্রয়োজন নেই। ক্যামেরা চালু হলেই সামনে পাওয়া কোনো চিকিৎসক বা নার্সকে এমনভাবে জেরা করতে হবে, যেন হাসপাতালের সব শয্যা, ওষুধ ও সচল যন্ত্রপাতি তিনি নিজের বাড়ির আলমারিতে লুকিয়ে রেখেছেন! এই মহাযজ্ঞে এখন কেবল একজনের অংশগ্রহণ বাকি—‘ভাতের হোটেল মিজান’। তাঁকেও একটি সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া হোক। গলায় ফুলের মালা, সামনে দশটি মাইক্রোফোন এবং পেছনে ক্যামেরার বিশাল বহর নিয়ে তিনি জরুরি বিভাগে প্রবেশ করবেন। রোগী মেঝেতে কেন? জরুরি বিভাগে ঢুকেই মিজান বজ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করবেন— “রোগী মেঝেতে কেন?” কর্তব্যরত চিকিৎসক বিনয়ের সঙ্গে বলবেন—

“স্যার, হাসপাতালের অনুমোদিত শয্যা ৫০০টি; কিন্তু ভর্তি রোগী ১ হাজার ৩০০ জন।” মিজান সঙ্গে সঙ্গে ধমক দেবেন— “এসব অজুহাত শুনতে চাই না! রোগীকে বিছানা দেন!” চিকিৎসক জানতে চাইবেন— “বিছানাটা কোথা থেকে দেব, স্যার?” তখন তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেবেন— “ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা! আমাকে সাত দিন সময় দিন—সব ঠিক করে দেব!”

সাত দিন পর হাসপাতাল আগের মতোই থাকবে। শয্যা বাড়বে না, জনবল নিয়োগ হবে না, যন্ত্রপাতিও সচল হবে না। তবে পরিদর্শনের ভিডিওটি কয়েক লাখ ভিউ পাবে এবং আমাদের নতুন পরিদর্শক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অ্যাকশন হিরো’ হয়ে উঠবেন! টেবিলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই—ভয়ংকর অপরাধ! এরপর মিজানের চোখ পড়বে চিকিৎসকের টেবিলে রাখা চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বইয়ের ওপর। বিস্ময়ে চোখ বড় করে তিনি চিৎকার করে উঠবেন— “আপনার টেবিলে বই কেন? আপনার তো সাহস কম নয়!” হতভম্ব চিকিৎসক বলবেন— “স্যার, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। রোগীকে সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বইটি দেখছিলাম।” মিজান আরও উত্তেজিত হয়ে বলবেন— “চিকিৎসক হয়ে আবার বই দেখতে হয়? এত বছর পড়াশোনা করেছেন কী জন্য? বই দেখে রোগী দেখবেন—এটা চলবে না!”

ক্যামেরাগুলো সঙ্গে সঙ্গে টেবিলে থাকা ‘অপরাধের আলামত’—অর্থাৎ বইটির ক্লোজআপ নেবে। পরদিন সম্ভাব্য শিরোনাম— “হাসপাতালে বইসহ হাতেনাতে ধরা পড়লেন চিকিৎসক!” এরপর কোনো এক অতিউৎসাহী পরিদর্শকের নাটকীয় ভঙ্গিতে তিনি ঘোষণা করবেন— “আপনার ডাক্তাররা ফ্যাসিস্ট! আমি সব দেখে ফেলেছি!” কী দেখে ফেলেছেন, কোন তদন্তে দেখেছেন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বইয়ের সঙ্গে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটির সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্নের সুযোগ থাকবে না। কারণ এই নতুন বিচারব্যবস্থায়—

* প্রমাণের চেয়ে চিৎকার শক্তিশালী;

* তদন্তের চেয়ে ভিডিও আকর্ষণীয়;

* সত্যের চেয়ে ভাইরাল হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ!

এ দেশে চিকিৎসক বই না দেখলে বলা হবে—তিনি নিজেকে হালনাগাদ রাখেন না। বই দেখলে বলা হবে—তিনি কিছুই জানেন না। প্রতিবাদ করলে ‘অসহযোগী’, চুপ থাকলে ‘দোষী’ এবং সংকটের প্রকৃত কারণ তুলে ধরলে মুহূর্তেই ‘ফ্যাসিস্ট’!

চিকিৎসকের অপরাধ প্রমাণের জন্য তথ্য, তদন্ত কিংবা যুক্তির আর প্রয়োজন নেই। একটি ক্যামেরা, কয়েকটি মাইক্রোফোন এবং একজন উচ্চকণ্ঠ পরিদর্শকই যথেষ্ট!

নষ্ট মেশিন চালুর বৈপ্লবিক পদ্ধতি

এরপর মিজান নষ্ট সিটি স্ক্যান মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করবেন— “মেশিন নষ্ট কেন?” চিকিৎসক বলবেন— “মেরামতের বরাদ্দ নেই, স্যার। বহুবার কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।” মিজানের তাৎক্ষণিক সমাধান— “চিঠি দিয়ে কী হবে? মেশিন চালু করেন!” ব্যস, সমস্যার সমাধান!

বাজেট নেই—তবু মেশিন চলবে। টেকনিশিয়ান নেই—তবু পরীক্ষা হবে। শয্যা নেই—তবু রোগী মেঝেতে থাকতে পারবে না। চিকিৎসক-নার্স নেই—তবু চব্বিশ ঘণ্টা সেবা চলবে।

মনে হয়, চিকিৎসকের গলায় স্টেথোস্কোপের পাশাপাশি একটি জাদুর কাঠিও ঝোলানো আছে। সেটি ঘোরালেই শূন্য থেকে শয্যা, আইসিইউ, ওষুধ, নার্স, টেকনিশিয়ান ও নতুন যন্ত্রপাতি বেরিয়ে আসবে!

রোগীর খাবারে ‘ফুঁ থেরাপি’

যন্ত্রপাতি পরিদর্শন শেষ করে মিজান এবার হাসপাতালের রান্নাঘরে ঢুকবেন। রোগীদের জন্য সদ্য রান্না করা তরকারির হাঁড়ি দেখে তাঁর ভেতরের খাদ্যবিশেষজ্ঞ হঠাৎ জেগে উঠবে।

স্বাস্থ্যবিধি, গ্লাভস কিংবা মাস্কের তোয়াক্কা না করে কোনো এক আলোচিত ‘ফুঁ-দেওয়া পরিদর্শকের’ ভঙ্গিতে তিনি গরম তরকারিতে কয়েকবার ফুঁ দেবেন। একই চামচ দিয়ে ঝোল মুখে নিয়ে সেই চামচ আবার হাঁড়িতে ডুবিয়ে দেবেন। মুহূর্তের মধ্যেই রোগীদের জন্য রান্না করা খাবারটি তাঁর হাতেই হয়ে উঠবে জীবাণুদূষণের ঝুঁকিপূর্ণ!

তারপর বাবুর্চিকে ডেকে গর্জে উঠবেন— “আমার নাম ভাতের হোটেল মিজান! তোমরা আমাকে রান্না করা শেখাচ্ছ? তোমাদের সাহস তো কম নয়!”

বাবুর্চি বিনয়ের সঙ্গে বলবেন—

“স্যার, হাসপাতালে ভর্তি অনেক রোগীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম। খাবারে ফুঁ দেওয়া কিংবা ব্যবহৃত চামচ আবার হাঁড়িতে দেওয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়।”

মিজান আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বলবেন— “আমাকে স্বাস্থ্যবিধি শেখাবেন না! আমি ফুঁ দিয়েই বুঝতে পারি খাবার স্বাস্থ্যসম্মত কি না!” ক্যামেরাগুলো অবশ্য তাঁর ফুঁ দেওয়া কিংবা ব্যবহৃত চামচ হাঁড়িতে ডোবানোর দৃশ্য এড়িয়ে যাবে। শুধু মিজানের হুংকার এবং বাবুর্চির অসহায় মুখের ক্লোজআপ দেখাবে।

পরদিন সম্ভাব্য শিরোনাম— “হাসপাতালের খাবারে অনিয়ম ধরলেন সাহসী পরিদর্শক!” নিজে স্বাস্থ্যবিধি ভাঙুন, তারপর বাবুর্চিকে ধমক দিন। নিজে খাবার দূষণের ঝুঁকি তৈরি করুন, তারপর রান্নাঘরকে দায়ী করুন।

নিজে সমস্যার অংশ হয়ে উঠুন, তারপর ক্যামেরার সামনে নিজেকেই সমাধান হিসেবে তুলে ধরুন! এটিই নতুন ‘ফুঁ থেরাপি’—যেখানে স্বাস্থ্যবিধির চেয়ে হুংকার বড়, রোগীর নিরাপত্তার চেয়ে ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব সংস্কারের চেয়ে অভিনয় বেশি আকর্ষণীয়!

হাসপাতালের টয়লেটে ‘হারপিক বিপ্লব’

রান্নাঘরের অভিযান শেষে মিজানের পরবর্তী গন্তব্য হাসপাতালের টয়লেট। দরজায় ঢুকেই নাক চেপে বজ্রকণ্ঠে বলবেন—

“টয়লেট অপরিষ্কার কেন? হারপিক নিয়ে আয়! আমি নিজেই হারপিক দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করব!”ক্যামেরাগুলো সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুত হয়ে যাবে। একটি মাইক্রোফোন থাকবে মিজানের মুখের সামনে, আরেকটি টয়লেটের দরজায়। মনে হবে, জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংস্কারটি বুঝি এখনই শুরু হতে যাচ্ছে!

পরিচ্ছন্নতাকর্মী বিনয়ের সঙ্গে বলবেন—

“স্যার, রোগী ও দর্শনার্থীর সংখ্যা হাসপাতালের ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ। অথচ পরিচ্ছন্নতাকর্মী খুবই কম। পর্যাপ্ত জীবাণুনাশক, সুরক্ষা উপকরণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটও নেই।”

মিজান ধমক দেবেন— “জনবল-বাজেটের গল্প শুনতে চাই না! হারপিক নিয়ে আয়—আজ আমি নিজেই পরিষ্কার করে দেখিয়ে দেব!” ক্যামেরার সামনে বোতল হাতে কয়েক ফোঁটা হারপিক ঢেলে, ব্রাশে দুবার ঘষে এবং নাকে রুমাল চেপে তিনি বিজয়ীর ভঙ্গিতে বেরিয়ে আসবেন।

পরদিন শিরোনাম— “নিজ হাতে হাসপাতালের টয়লেট পরিষ্কার করে ইতিহাস গড়লেন জনদরদি পরিদর্শক!” কিন্তু ক্যামেরা চলে যাওয়ার পর— পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা আগের মতোই কম থাকবে। পরিচ্ছন্নতার বরাদ্দ বাড়বে না। জীবাণুনাশক ও সুরক্ষা উপকরণের ঘাটতি থাকবে। ভাঙা পানির লাইন, অচল ফ্লাশ ও নষ্ট দরজা মেরামত হবে না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অতিরিক্ত ব্যবহারে টয়লেট আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

একটি টয়লেটে একদিন হারপিক ঢেলে ছবি তুললেই হাসপাতালের স্যানিটেশনব্যবস্থার সংস্কার হয় না। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরবচ্ছিন্ন পানি, নিয়মিত জীবাণুমুক্তকরণ, নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট ও কার্যকর তদারকি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ক্যামেরায় নাটকীয় দেখায় না। বোতল হাতে একটি ছবি অনেক বেশি আকর্ষণীয়! বরাদ্দ দেবেন না—হারপিকের বোতল দেখাবেন। জনবল নিয়োগ করবেন না—ক্যামেরার সামনে হাতা গুটাবেন। স্থায়ী ব্যবস্থা গড়বেন না—এক দিনের অভিনয়কে বিপ্লব বলবেন। নীতিগত ব্যর্থতা ঢাকবেন—দায় চাপাবেন হাসপাতালের কর্মীদের ওপর।

এটিই নতুন ‘হারপিক বিপ্লব’—যেখানে পরিচ্ছন্নতার চেয়ে প্রচারণা বড় এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল বেশি গুরুত্বপূর্ণ!

নতুন ‘চিকিৎসা বিপ্লবের’ দর্শন

পরিদর্শনের একপর্যায়ে মিজানের সঙ্গে যোগ দেবেন রম্যজগতের আরেক কাল্পনিক দার্শনিক—দাঁড়ি-চুলওয়ালা গফুর। তিনি ঘোষণা করবেন—

“আমার দার্শনিক চিন্তায় কোনো স্বাস্থ্যনীতি না থাকলেও সমস্যা নেই। কম শয্যা, কম জনবল, অপর্যাপ্ত ওষুধ ও অকেজো যন্ত্রপাতি দিয়ে চিকিৎসক-নার্সদের কাছ থেকে সীমাহীন সেবা আদায় করার নামই চিকিৎসা বিপ্লব!” মিজান হাততালি দিয়ে বলবেন— “এই তো চাই! সমস্যার সমাধান নয়—সমস্যার জন্য চিকিৎসককে দায়ী করাই আসল সংস্কার!” এই বিপ্লবের নীতিগুলো সহজ—

* শয্যা বাড়াবেন না; মেঝেতে রোগী দেখলেই চিকিৎসককে ধমক দেবেন।

* জনবল নিয়োগ করবেন না; উপস্থিত চিকিৎসককে অলস বলবেন।

* নষ্ট যন্ত্র মেরামত করবেন না; কেন চলছে না, চিকিৎসককে জিজ্ঞাসা করবেন।

* ওষুধের বরাদ্দ দেবেন না; ওষুধ না পেলে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভিডিও বানাবেন।

* পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাড়াবেন না; হারপিকের বোতল হাতে ছবি তুলবেন।

* স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করবেন না; ভাইরাল ভিডিওকেই জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি বানাবেন!

যেসব প্রশ্ন ক্যামেরার সামনে করা হয় না

কিন্তু পরিদর্শনের সময় সাধারণত প্রশ্ন করা হয় না—

* অনুমোদিত শয্যার তুলনায় ভর্তি রোগী কতজন?

* রোগীর অনুপাতে চিকিৎসক ও নার্স কতজন?

* কতটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র নষ্ট এবং কত দিন ধরে?

* আইসিইউ, সিসিইউ ও জরুরি বিভাগের সক্ষমতা কত?

* পর্যাপ্ত ওষুধ, টেকনিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন কি?

* রক্ষণাবেক্ষণের পর্যাপ্ত বাজেট দেওয়া হয়েছে কি?

* সমস্যা জানানোর পরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?

* হাসপাতাল পরিচালকদের কতটুকু প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে?

* নীতিনির্ধারক ও বরাদ্দদাতাদের জবাবদিহি কোথায়?

এসব প্রশ্ন করলে ক্যামেরার নাটক জমে না। প্রকৃত উত্তর খুঁজতে গেলে দায় শুধু হাসপাতালের চিকিৎসকের ঘাড়ে চাপানো যায় না; নীতিনির্ধারক, প্রশাসন ও বরাদ্দদাতাদের দিকেও আঙুল ওঠে।

মিডিয়া ট্রায়াল হাসপাতাল সংস্কার নয়

হাসপাতালে অনিয়ম থাকলে অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু তদন্তের আগেই ক্যামেরার সামনে অপমান, রাজনৈতিক তকমা, হুমকি ও একতরফা বিচার কোনো পরিদর্শন নয়—এটি নিছক মিডিয়া ট্রায়াল।

চিকিৎসককে অপমান করলে নতুন শয্যা তৈরি হয় না। নার্সকে ধমক দিলে আইসিইউর সক্ষমতা বাড়ে না। পরিচালককে হেয় করলে নষ্ট সিটি স্ক্যান সচল হয় না। বাবুর্চিকে হুমকি দিলে খাবারের মান বাড়ে না। হারপিক হাতে ছবি তুললে স্যানিটেশনব্যবস্থা বদলে যায় না।

বরং এতে চিকিৎসক-নার্সদের মনোবল ভাঙে, কর্মপরিবেশ বিষাক্ত হয় এবং সরকারি হাসপাতালে দক্ষ জনবল ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই দরিদ্র রোগী, যাঁর বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।

শেষ কথা: হুংকার নয়, স্বাস্থ্যনীতি চাই

সরকারি হাসপাতাল কোনো সার্কাস নয়। রোগীর দুর্ভোগ কোনো রিয়েলিটি শো নয়। চিকিৎসক-নার্সেরা ক্যামেরার সামনে দাঁড় করানো আসামি নন। ফুলের মালা দিয়ে নতুন পরিদর্শক তৈরির আগে হাসপাতালগুলোকে পর্যাপ্ত শয্যা, জনবল, ওষুধ, আইসিইউ, কার্যকর যন্ত্রপাতি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও প্রয়োজনীয় বাজেট দিন। হাসপাতাল পরিচালকদের বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষমতা দিন। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করুন।

কারণ—

ভাইরাল ভিডিও রোগ নির্ণয় করে না। মাইক্রোফোন অস্ত্রোপচার করে না। ধমক দিয়ে নষ্ট যন্ত্র সচল করা যায় না। ফুঁ দিয়ে খাবারের মান পরীক্ষা করা যায় না। হারপিকের বোতল দেখিয়ে স্যানিটেশনব্যবস্থা সংস্কার করা যায় না। চিকিৎসকদের অপমান করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন হয় না। রোগীর জীবন রক্ষা করেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাঁদের হাতে ক্যামেরার ভয় নয়—প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ তুলে দিন। হাসপাতাল সংস্কার করুন—চিকিৎসকদের অপমান নয়। সংকটের সমাধান করুন—মিডিয়া ট্রায়াল নয়। হুংকার নয়—বাস্তবসম্মত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি চাই।

লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।