আকাশপথে বিমানে করে রাশিয়া থেকে ইউক্রেনে যেতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দূতেরা। এর পরিবর্তে তারা কিয়েভে গিয়েছেন ট্রেনে চড়ে। কিন্তু কেন? আকাশপথই তো সহজ ও সময় সাশ্রয়ী। কিন্তু ঘটনা অন্য জায়গায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আকাশপথ নিরাপদ নয়। রুশ ড্রোন হামলার ঝুঁকি ছিল আকাশপথে। তাই ডনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাই জ্যারেড কুশনার ট্রেনে করে কিয়েভ যেতে বাধ্য হলেন। অথচ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ক্রেমলিনে যে ব্যক্তির সঙ্গে তারা আলোচনার টেবিলে বসেছিলেন, সেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশেই এসব ড্রোন ছোড়া হচ্ছে। অনলাইন বিবিসি বলছে, এরপর কিয়েভে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ছিল প্রতীকী তাৎপর্যে ভরপুর।
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দূতদের ইউক্রেনের মাটিতে পা রাখার দৃশ্য দেখা গেল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কিয়েভের সেন্ট সোফিয়া ক্যাথেড্রালে ডনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারকে স্বাগত জানান। ইউক্রেনের প্রাচীন ইতিহাসের প্রতীক এই স্থাপনাটি আবার শুক্রবার রুশ ড্রোন হামলায় দেশটির নিরাপত্তা সংস্থার সদর দপ্তরের ক্ষতিগ্রস্ত স্থান থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে। জেলেনস্কি কী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন, তা বুঝতে খুব বেশি হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন হয়নি।
দুই পক্ষ কয়েক ঘণ্টা ধরে বৈঠক করে। পরে তাদের সঙ্গে ইউরোপের কয়েকটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারাও যোগ দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বৃটেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল। বৈঠক শেষে সব পক্ষই আলোচনাকে উষ্ণ ভাষায় বর্ণনা করে জানায়, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে নিয়ে অতীতে অনুষ্ঠিত ‘ত্রিপক্ষীয় আলোচনা’ আবারও শুরু করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। তবে মৌলিক মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতেরা মস্কো থেকে সরাসরি কিয়েভে যান। সেখানে ভ্লাদিমির পুতিন তাদের বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করছে।
তবে ইউক্রেন থেকে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্রের কথা শুনেছেন। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, আগস্ট মাসে তারা যতটা ভূখণ্ড হারিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি ভূখণ্ড পুনর্দখল করেছেন। একই সময়ে রাশিয়ার প্রায় ৪২ হাজার সেনা হতাহত হয়েছে। পুতিন মার্কিন দূতদের আরও বলেন, সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করতে হবে। এটি মূলত তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত দাবিগুলোরই সংক্ষিপ্ত রূপ। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের ভূখণ্ডের একটি অংশ রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দেয়া, ন্যাটোতে যোগ দেয়ার আশা পরিত্যাগ করা এবং ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর আকার কমিয়ে আনা। আলোচনা শেষে জেলেনস্কি জোর দিয়ে বলেন, ইউক্রেনের প্রয়োজন হবে শক্তিশালী ও স্পষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। এর অংশ হিসেবে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীও থাকতে হবে।
পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস অঞ্চল নিয়ে ইউক্রেন কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে প্রস্তুত- এমন কোনো ইঙ্গিতও তিনি দেননি। বিষয়টি নিয়ে তিনি সংক্ষেপে বলেন, এটি কঠিন একটি ইস্যু। অন্যদিকে উইটকফ দাবি করেন, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে এবং সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোও সেখানে রয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, দুই পক্ষের মতপার্থক্য কমাতে উভয় পক্ষকেই কিছু বিষয়ে আপস করতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে কোন পক্ষই এমন আপস করতে প্রস্তুত এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
তাই আপাতত কিয়েভে প্রত্যাশা হলো, যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে এবং ইউক্রেনকে সামনে একটি কঠিন শীত মোকাবিলা করতে হবে। কিছু কূটনীতিক আগামী বসন্তে সম্ভাব্য সমঝোতার জন্য একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন। তবে অন্যরা এ বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম আশাবাদী। ডনাল্ড ট্রাম্পের দূতদের সফরের জন্য জেলেনস্কি তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কারণ দুই পক্ষের সম্মতিতে বিমান হামলায় যে স্বল্পমেয়াদি বিরতি দেয়া হয়েছিল, তা কিয়েভের বাসিন্দাদের সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে।
