দালিয়ানে বক্তব্য। নিউইয়র্কে দরকষাকষি। ঢাকায় বাস্তবায়ন। তিনটি বাক্য। কিন্তু বাংলাদেশের নতুন জলবায়ু কূটনীতির পুরো রূপরেখা যেন এর মধ্যেই আছে।
চীনের দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছেন, সেটি ছিল অবস্থান জানানোর বার্তা। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চ হতে পারে সেই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক দরকষাকষির শক্তিতে পরিণত করার জায়গা। আর ঢাকায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এই তিনটি যদি একই সুতোয় বাঁধা যায়, তাহলে বাংলাদেশ সত্যিই জলবায়ু কূটনীতিতে নতুন অবস্থান তৈরি করতে পারে
বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত। এই পরিচয়ের পেছনে বাস্তবতা আছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। কিন্তু শুধু ক্ষতির কথা বললে গল্পের অর্ধেক বলা হয়। অন্য অর্ধেক হলো বাংলাদেশ কী করতে পারে এবং বিশ্বকে কী দিতে পারে।
চীনের দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রী সেই দ্বিতীয় গল্পটি সামনে এনেছেন। বাংলাদেশ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ নয়; জলবায়ু অভিযোজন, সবুজ অর্থনীতি এবং সহনশীল উন্নয়নের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে চায়। এই বার্তা বাংলাদেশের কূটনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কারণ জলবায়ু এখন আর শুধু পরিবেশের বিষয় নয়।
এটি বিনিয়োগের বিষয়। জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়। এটি প্রযুক্তির বিষয়। কর্মসংস্থানের বিষয়। এটি বাণিজ্যের বিষয়। এমনকি ভূরাজনীতিরও বিষয়।
তাই দালিয়ানের বক্তব্যকে শুধু জলবায়ুবিষয়ক বক্তৃতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় সবুজ অর্থনীতির অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।
কিন্তু বক্তব্যের পরের ধাপ কী? নিউইয়র্ক। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই অধিবেশনের সভাপতি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নতুন সরকারের পর প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন।
এটি কেবল প্রটোকল বা মর্যাদার বিষয় নয়। এটি কূটনৈতিক পুঁজি। এই মঞ্চে বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতিকে এবার আরও স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। বাংলাদেশ কত টাকা জলবায়ু অর্থায়ন চাইছে, শুধু সেটি নয়। কী ধরনের অর্থায়ন চাইছে, সেটিও বলতে হবে। অনুদান কত? স্বল্পসুদের ঋণ কত? প্রযুক্তি স্থানান্তর কীভাবে হবে? বেসরকারি বিনিয়োগ কীভাবে আসবে? ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে অর্থ কীভাবে দ্রুত পাওয়া যাবে?
অর্থাৎ এবার আবেদনের ভাষা থেকে দরকষাকষির ভাষায় যেতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক জলবায়ু রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতির অভাব নেই। অভাব বাস্তব অর্থপ্রবাহে।
বছরের পর বছর উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি শুনেছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর হাতে পাওয়া অর্থ এক জিনিস নয়। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি সংগ্রহ না করে পুরনো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের হিসাবও চাওয়া।
এখানে বাংলাদেশ একা নয়। বৈশ্বিক দক্ষিণের বহু দেশ একই সমস্যার মুখোমুখি। বাংলাদেশ চাইলে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি কার্যকর কূটনৈতিক জোট গড়ে তুলতে পারে।
এটি বাংলাদেশের কণ্ঠকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে নিউইয়র্কে দরকষাকষি করতে হলে ঢাকার হাতেও কিছু থাকতে হবে। এটাই তৃতীয় ধাপ বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বলে যে আমরা সবুজ অর্থনীতির দিকে যাচ্ছি, তাহলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে তার প্রমাণ থাকতে হবে। যদি জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর কথা বলা হয়, তাহলে নদী, উপকূল ও নগর ব্যবস্থাপনায় তার বাস্তব প্রতিফলন থাকতে হবে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।
সরকার ব্যাটারিসহ রুফটপ সোলার ব্যবস্থায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করেছে। নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার সুযোগ এবং তার বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা মানুষকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভোক্তা থেকে উৎপাদক হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এটি ছোট কোনো পরিবর্তন নয়।
যদি দেশের লাখ লাখ ছাদ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে, তাহলে একটি বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। এতে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। সবচেয়ে বড় কথা, জলবায়ু নীতি মানুষের ঘরে পৌঁছাবে।
একজন নাগরিক তখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করবেন নিজের ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে। এটাই হতে পারে বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তাগুলোর একটি।
কিন্তু এখানেও প্রশ্ন আছে। সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে—মানুষ কতটা সহজে তা পাবে? আবেদন কি সহজ হবে? গ্রিড সংযোগ কত দ্রুত হবে? উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের মূল্য কি সময়মতো পাওয়া যাবে? ব্যাংক কি সহজ অর্থায়ন করবে? সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির মান কে নিশ্চিত করবে? এসব প্রশ্নের সমাধান না হলে ভালো নীতি কাগজেই আটকে থাকবে।
তাই বাস্তবায়নের অর্থ শুধু প্রকল্প শেষ করা নয়। বাস্তবায়নের অর্থ হচ্ছে, একজন সাধারণ মানুষ যেন রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রেখে বিনিয়োগ করতে পারেন। এই আস্থাই জলবায়ু অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পুঁজি।
বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় সুরক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ শিল্প এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতেও একই দর্শন প্রয়োজন।
দালিয়ানে আমরা বলেছি কী করতে চাই। নিউইয়র্কে বলব কী চাই এবং কেন চাই। ঢাকায় দেখাব আমরা সেটি কীভাবে করেছি। এই ধারাবাহিকতা তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান অনেক শক্তিশালী হবে।
চীনও এই সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দালিয়ান ও বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে তাই শুধু বাণিজ্য বা অবকাঠামোর দৃষ্টিতে দেখা যথেষ্ট নয়। সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোতে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। তবে ভারসাম্য জরুরি।
চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়বে, এটি স্বাভাবিক। একই সঙ্গে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গেও সম্পর্ক শক্ত রাখতে হবে। বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতি কোনো ভূরাজনৈতিক শিবিরের অংশ হওয়ার জন্য নয়; এটি জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ করার জন্য।
এখানেই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির বাস্তব অর্থ।বাংলাদেশের প্রয়োজন যে দেশ থেকে প্রযুক্তি পাওয়া যায়, সেখান থেকে প্রযুক্তি নিতে হবে। যে দেশ থেকে অর্থায়ন পাওয়া যায়, সেখান থেকে অর্থায়ন নিতে হবে। যে বাজারে রপ্তানি বাড়ানো যায়, সেই বাজারে যেতে হবে। বন্ধুত্ব থাকবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের হিসাবও থাকবে। এমন কূটনীতি দুর্বলতার নয়; আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সবুজ পোশাক, পরিবেশবান্ধব পাটপণ্য, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ প্রযুক্তি এসব খাতে বাংলাদেশ চাইলে নতুন বাজার তৈরি করতে পারে।
সুতরাং জলবায়ু কূটনীতির লক্ষ্য শুধু ক্ষতিপূরণ পাওয়া হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষতি মোকাবিলা, বিনিয়োগ আনা এবং নতুন অর্থনীতি তৈরি।
এ জন্য একটি জাতীয় ‘ক্লাইমেট ডিপ্লোমেসি রোডম্যাপ’ দরকার হতে পারে। সেখানে নির্দিষ্ট করা থাকবে—কোন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ কী দাবি তুলবে, কোন দেশ থেকে কী প্রযুক্তি বা বিনিয়োগ চাইবে, কী প্রকল্পে অর্থ ব্যবহার করবে এবং তার ফলাফল কীভাবে পরিমাপ করা হবে। তাহলে কূটনীতি আর প্রকল্প আলাদা থাকবে না।
দালিয়ান, নিউইয়র্ক ও ঢাকা তিনটি একই পরিকল্পনার তিনটি ধাপ হয়ে উঠবে। দালিয়ানে বক্তব্য। নিউইয়র্কে দরকষাকষি। ঢাকায় বাস্তবায়ন।এই তিনটির মধ্যে যদি সংযোগ তৈরি হয়, তাহলে জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বদলাতে পারে। তখন বাংলাদেশ আর শুধু বলবে না ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত।’ বলবে ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু আমরা প্রস্তুত। আমরা বিনিয়োগ চাই, প্রযুক্তি চাই, ন্যায্য অর্থায়ন চাই। আর সেই সহযোগিতাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও আমাদের আছে।’
এটাই হবে নতুন বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা। বিশ্বের কাছে সহানুভূতি চাওয়ার দিন শেষ করার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের ক্ষতির কথা আর বলা হবে না। বরং ক্ষতির নৈতিক দাবিকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
দালিয়ানে সেই রাজনৈতিক বার্তা শুরু হয়েছে। এখন নিউইয়র্কে তার হিসাব চাইতে হবে। আর শেষ পর্যন্ত ঢাকায় তার ফল দেখাতে হবে। কারণ জলবায়ু কূটনীতিতে বক্তৃতা দরজা খুলতে পারে; দরকষাকষি অর্থ আনতে পারে; কিন্তু বাস্তবায়নই একটি দেশের নেতৃত্বের প্রমাণ দেয়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
