ইত্তেফাক
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ‘খোলাবাজারেও মিলছে না এলএনজি, দীর্ঘায়িত হচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুৎ ঘাটতি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের গ্যাস-সংকট স্থায়ীভাবে সামাল দিতে অন্তত দুই বছর সময় দরকার হবে বলে জানিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা। এ সময়ের মধ্যে নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্পাদন বাড়ানো এবং বিদ্যুত্ উত্পাদনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের পরিকল্পনার প্রধান দুই ভিত্তি দেশীয় গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি—দুটিই এখনো বড় অনিশ্চয়তার মুখে।
একদিকে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উত্পাদন দ্রুত কমছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে চড়া দাম দিয়েও প্রয়োজনের সময়ে এলএনজি কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সরবরাহের জন্য ডাকা আন্তর্জাতিক দরপত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি। মাসের শেষ সপ্তাহের জন্য পাওয়া দরও আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি, প্রতি ইউনিট ২৫ দশমিক ৯২ ডলার।
ফলে সেপ্টেম্বরেও গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সম্ভাবনা কম। মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে রেশনিং অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। শিল্পকারখানা সচল রাখার জন্য হলেও প্রয়োজনীয় এলএনজি সংগ্রহ করতে পারছে না সরকার।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৩৩-২৩৪ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট। অর্থাত্ চাহিদার প্রায় ৪৪ শতাংশ গ্যাসই সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তবে গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা আরো বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সেক্ষেত্রে ঘাটতি আরো বেশি।
এই ঘাটতির প্রভাব পড়েছে বিদ্যুত্, শিল্প, সিএনজি ও আবাসিক—সব খাতে। কারখানায় উত্পাদন কমছে, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুেকন্দ্র অলস পড়ে থাকছে, বাড়ছে লোডশেডিং। সিএনজি স্টেশনে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি। অনেক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় আবাসিক গ্রাহকের চুলাও জ্বলছে না।
চার কার্গোর দরপত্রে হতাশা
সেপ্টেম্বরে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে চার কার্গো এলএনজি কেনার উদ্যোগ নেয় রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি-আরপিজিসিএল। দুটি কার্গো ৮-৯ সেপ্টেম্বর এবং ১-২ অক্টোবর সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু কোনো সরবরাহকারী এতে অংশ নেননি। অন্য দুটি কার্গো ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর ও ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য দর পাওয়া গেলেও প্রস্তাবিত মূল্য অস্বাভাবিক বেশি। প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম চাওয়া হয়েছে ২৫ দশমিক ৯২ ডলার। জাপান-কোরিয়া মার্কার বা জেকেএম সূচক অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে প্রতি ইউনিট এলএনজির বাজারমূল্য ২২ দশমিক ৯৫ থেকে ২৩ দশমিক ৫০ ডলারের মধ্যে। সে হিসাবে পাওয়া দর বাজারমূল্যের তুলনায় প্রতি ইউনিটে প্রায় আড়াই থেকে তিন ডলার বেশি। এর আগে আগস্টে প্রতি ইউনিট ২৫ ডলারের বেশি দামে একটি কার্গো কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল সরবরাহকারী। অতিরিক্ত মূল্য বিবেচনায় ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুব অল্প সময়ের নোটিশে কার্গো সরবরাহ করতে হলে দাম কিছুটা বেশি হতে পারে। কিন্তু প্রতি ইউনিটে দুই থেকে তিন ডলারের ব্যবধান সরকারের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
সরাসরি ক্রয়ের কার্গোও অনিশ্চিত
ব্ল্যাককিউব ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির আওতায় ৬ সেপ্টেম্বর এক কার্গো এলএনজি সরবরাহের কথা ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কার্গো দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। এর বিকল্প হিসেবে আরপিজিসিএল স্পট মার্কেট থেকে কার্গোটি কেনার চেষ্টা করলেও কোনো সরবরাহকারী আগ্রহ দেখায়নি। ফলে সেপ্টেম্বরের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এই সময়ে শিল্প, বিদ্যুত্, সিএনজি ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে গ্যাস রেশনিং অব্যাহত থাকতে পারে।
পেট্রোবাংলার পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরামকোর একটি কার্গো এবং ৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের একটি কার্গো আসার কথা ছিল। এছাড়া ১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরামকো, ১৩ সেপ্টেম্বর পসকো, ১৬ সেপ্টেম্বর গানভর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গানভরের আরো একটি কার্গো সরবরাহের সূচি রয়েছে। তবে বর্তমান সরবরাহ বাড়াতে এসব নির্ধারিত কার্গোর বাইরে সেপ্টেম্বর মাসে আরো অন্তত দুটি কার্গো প্রয়োজন। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গরম অব্যাহত থাকলে বিদ্যুতের চাহিদাও বেশি থাকবে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এ দুই মাসে অন্তত ২০টি কার্গো দরকার হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী কার্গো ও অর্থায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
সক্ষমতা আছে, এলএনজি নেই
দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে এখন দৈনিক ৭০-৭২ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট। অর্থাত্ শুধু বিদ্যমান টার্মিনাল ব্যবহার করেই দৈনিক আরো প্রায় ৩৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো আমদানি করতে না পারায় এ সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৬৮টি এলএনজি কার্গো এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭১টি। তবে জুলাই ও আগস্টে আমদানির পতন বেশি। এ দুই মাসে এসেছে ১৫টি কার্গো, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২১টি।
এর মধ্যে একটি এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে ১৬ দিন বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়। টার্মিনাল বন্ধ থাকায় এলএনজি গ্রহণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের সক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে জাতীয় গ্রিডের সরবরাহে।
প্রতি কার্গোতে লোকসান ৭০০ কোটি টাকার বেশি
স্পট মার্কেটে প্রতি কার্গো এলএনজি কিনতে বর্তমানে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি থেকে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ সেই কার্গোর গ্যাস বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতি কার্গোয় সরকারের লোকসান ৭০০ কোটি টাকার বেশি।
প্রতি মাসে আমদানি করা প্রায় ১০টি কার্গোর মধ্যে সাত থেকে আটটি স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হলে মাসিক লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কোনো কোনো হিসাবে এই লোকসান প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাচ্ছে।
আগস্টে এলএনজি আমদানির জন্য সরকার পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রয়োজনীয় ভর্তুকির জন্যও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অর্থ চেয়ে চিঠি দেবে জ্বালানি বিভাগ।
এলএনজির দাম বাড়ার কারণে দেশীয় ও আমদানি করা গ্যাস মিলিয়ে প্রতি ইউনিট মিশ্রিত গ্যাসের ব্যয় এখন ৪৫ টাকায় পৌঁছেছে। ছয় মাস আগেও এই ব্যয় ছিল ৩১ টাকা ৪২ পয়সা। অথচ সরকার গড়ে গ্যাস বিক্রি করছে ২৩ টাকা ৯০ পয়সায়। অর্থাত্ প্রতি ইউনিটে ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান ২১ টাকা ১০ পয়সা।
পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি অব্যাহত থাকলে সরকারের লোকসান ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে লোকসান ছিল প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।
দেশীয় উত্পাদনে বড় পতন
এলএনজির সংকটকে আরো গভীর করেছে দেশীয় গ্যাস উত্পাদনের ধারাবাহিক পতন। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উত্স থেকে পাওয়া যেত ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। বর্তমানে মোট সরবরাহ নেমেছে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে। এর মধ্যে দেশীয় উেসর সরবরাহ ১৬২ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৭১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট।
সাড়ে ছয় বছরের ব্যবধানে মোট সরবরাহ কমেছে ৮৩ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট বা ২৬ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ কমেছে প্রায় ৯৫ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। এলএনজি আমদানি করে পতনের একটি অংশ পূরণ করা হলেও মোট সরবরাহ ২০২০ সালের পর্যায়ে ধরে রাখা যায়নি।
পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উত্পাদন প্রাকৃতিকভাবে কমছে। কিন্তু সেই হারে নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার ও উত্পাদনে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিবছর দেশীয় উত্পাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা ও ভর্তুকির বোঝা বাড়ছে।
প্রথম আলো
‘পেনশনের নামে সরকারি টাকা আত্মসাৎ’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আক্তার হোসেন। চলতি বছরের জুনে পেনশন বাবদ ব্যাংক হিসাবে ১৫ হাজার ৪০৬ টাকা পাওয়ার কথা তাঁর। তবে ওই মাসে নিয়মিত পেনশনের পাশাপাশি আরও প্রায় ৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত পান তিনি। পেনশন কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে হওয়া চুক্তির অংশ হিসেবে এই অতিরিক্ত অর্থ পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ থেকে কমিশন হিসেবে এক লাখ টাকা রাখেন। বাকি টাকা সিসিডিএফ কার্যালয়কেন্দ্রিক জালিয়াত চক্রের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেন।
এভাবে এক বছরের বেশি সময়ে পেনশনের বাইরে প্রায় ৭২ লাখ টাকা পেয়েছেন আক্তার হোসেন। এই অর্থ থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন রেখে বাকি টাকা ওই চক্রকে ফেরত দিয়েছেন তিনি। অথচ ওই সময়ে পেনশন ও উৎসব ভাতা মিলিয়ে দুই লাখ টাকার কিছু বেশি পাওয়ার কথা ছিল তাঁর।
শুধু আক্তার হোসেন নন, সশস্ত্র বাহিনীর আরও অনেক অবসরপ্রাপ্ত সদস্যের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ সরানো হয়েছে। এ-সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে ২৬ পেনশনভোগীর নামে ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল তৈরি করে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে।
বকেয়া পেনশন পরিশোধের সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থা আইবাস প্লাস প্লাস (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম) ব্যবহার করে অভিনব এ জালিয়াতি করা হয়েছে। প্রথমে অনুমোদনহীন বকেয়া বিল তৈরি করে পেনশনভোগীর ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হতো। এরপর তাঁকে কমিশন দিয়ে বাকি টাকা নেওয়া হতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে। পরে ভুয়া ট্রেজারি চালান দেখিয়ে অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত এসেছে বলে নথিতে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়।
প্রথমে ২৩ পেনশনভোগীর ব্যাংক হিসাবে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত লেনদেনের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পরে প্রাথমিক তদন্তে ২৬ জনের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা সরানোর তথ্য পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২ সেপ্টেম্বর কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্সের (সিজিডিএফ) অধীন চিফ কন্ট্রোলার অব ডিফেন্স ফাইন্যান্স (পেনশন অ্যান্ড ফান্ড) বা সিসিডিএফ কার্যালয়ের সাবেক অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান ও ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার ইশরাত জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার ধারণা, এটিই চূড়ান্ত হিসাব নয়। আইবাস প্লাস প্লাসের পুরোনো লেনদেন ও বকেয়া পেনশন বিলগুলো পরীক্ষা করলে একই কৌশলে সরকারি অর্থ সরানোর আরও ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে। সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো সূত্রের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমল থেকে হিসাবগুলো তদন্ত করা হলে এ রকম অন্তত শতকোটি টাকার জালিয়াতির তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নুরুল ইসলাম প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘সবই তদন্ত করতে বলা হয়েছে’। যদিও যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাতে কেবল গত দুই অর্থবছরের (২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬) এ–সংক্রান্ত লেনদেন যাচাই করতে বলা হয়েছে।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘স্বপ্নের প্রকল্পেও সিঁধ কাটে চক্র’। প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপির প্রশংসনীয় উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম ছিল খাল খনন প্রকল্প। সরকার গঠনের পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৬ মাসে প্রায় ১২শ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও কতিপয় নেতার অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে খাল খনন প্রকল্পটি শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রকল্পে ভাগ বসিয়েছেন আওয়ামী সমর্থিত ইউপি সদস্য এবং চেয়ারম্যানরাও। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ শ্রমিকের হাতে সম্পন্ন করার বাধ্যতামূলক শর্ত থাকলেও তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় এক্সকেভেটর (ভেকু) দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে চলছে অর্থ লোপাটের আয়োজন। বেশ কয়েক স্থানে খালের অস্তিত্ব নেই, তবুও দেওয়া হয়েছে বরাদ্দ। অনেক এলাকায় প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা না বাড়িয়ে কেবল পাড়ের ঘাস চেঁছে এবং আগাছা পরিষ্কার করে পুরো কাজ সমাপ্ত দেখানো হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে এমন কাজের কারণে খাল খননের পরই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে খননের কারণে পাড় ধসে হুমকিতে পড়েছে বসতবাড়ি ও সড়ক। অনেক স্থানে খাল খনন প্রকল্প কৃষকের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে দুর্নীতি ঢাকতে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরতের নামে চলছে আই ওয়াশ (Eye wash বা লোকদেখানো কাজ)। ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ উপজেলা থেকে বরাদ্দের অব্যয়িত টাকা কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। কোষাগারে টাকা ফেরতের আড়ালেও রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অনেক এলাকা থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে। ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা ইতোমধ্যে লুটে নেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েক স্থানে ভুয়া শ্রমিকের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের যোগসাজশে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে টাকা। এর পাশাপাশি সরকারদলীয় স্থানীয় নেতারা প্রকল্পে ভাগ বসানোয় প্রশংসনীয় এ উদ্যোগটি ভেস্তে যেতে বসেছে। নামমাত্র খননের কারণে প্রান্তিক কৃষক কতটুকু সুফল ভোগ করবেন, এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। স্থানীয় প্রতিনিধিদের সরেজমিন পাঠানো খবর অনুযায়ী এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সাশ্রয় দেখাতে টাকা ফেরত যেন শুভংকরের ফাঁকি: রাজশাহী থেকে তানজিমুল হক জানান, বাগমারায় দুই খাল পুনঃখননে ঘটেছে নজিরবিহীন লুটপাট। ভয় দেখিয়ে প্রকল্পের সুবিধাভোগী শ্রমিকদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে স্বাক্ষর করা চেকের পাতা। এরপর ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে সিংহভাগ টাকা। মাত্র আধা কিলোমিটার খাল খনন করে তিন কিলোমিটার কাগজে-কলমে দেখিয়ে লুট করা হয়েছে বরাদ্দের মোটা অঙ্কের টাকা। লুটপাট আড়াল করতে স্বচ্ছতা প্রমাণে সাশ্রয় দেখিয়ে কিছু টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এটিকে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা। অভিযোগ উঠেছে, এ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত বাগমারার প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা (পিআইও), রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধিসহ সংঘবদ্ধ একটি শক্তিশালী চক্র। আর এ চক্রটি নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর প্রতারণার কৌশল নিয়ে দুটি খাল পুনঃখননে সবমিলিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি টাকারও বেশি। ঝিকরা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক দ্বীন ইসলাম বলেন, ‘ফাঁকা চেকে শ্রমিকদের স্বাক্ষর নিয়ে অন্তত অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ১২ ও ২৩ জুলাই বাগমারার ইউএনও এবং জেলা প্রশাসকের কাছে শ্রমিকরা লিখিত অভিযোগ দিলেও প্রতিকার পাননি।
এদিকে শুভডাঙ্গা ইউনিয়নেও সাত কিলেমিটার খাল খননের পরিকল্পনা থাকলেও বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। সেখানে কাগজে-কলমে তিন কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্নচিত্র। আধা কিলোমিটার খাল খনন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে টাকা। খাল খনন প্রকল্পে সাশ্রয় দেখাতে টাকা ফেরতেও রয়েছে ‘শুভংকরের ফাঁকি’। ঝিকরা ইউনিয়নে খননে এক্সকেভেটরের (ভেকু) জন্য বরাদ্দ ছিল ৯০ লাখ ৭১ হাজার ৮৪৩ টাকা। সেখানে এক্সকেভেটর কাজ করেছে বড়জোর ছয় থেকে সাতটি। প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে এক্সকেভেটর বাবদ বরাদ্দ ছিল সাড়ে ১২ লাখ টাকা। অথচ এক্সকেভেটর মালিকদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ছয় থেকে সাত লাখ টাকা। শুধু খননেই সাশ্রয় হওয়ার কথা ২৮ থেকে ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া শ্রমিক বাবদ সাশ্রয় হওয়ার কথা ৪৮ থেকে ৫০ লাখ টাকা। অথচ পিআইও সাশ্রয় দেখিয়েছেন মাত্র ১৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮০০ টাকা। এ প্রকল্পে অন্তত ৭০ লাখ থেকে ৭৫ লাখ টাকা তছরুপ করা হয়েছে।
বরাদ্দে নয়ছয়, যোগসাজশে আত্মসাৎ: যশোর থেকে তৌহিদ জামান জানান, এ জেলায় খাল খনন কর্মসূচিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। খাল নির্বাচনে ব্যর্থতা ও পরিমাপে অসামঞ্জস্যসহ বেশকিছু অনিয়ম ছাড়াও টাকা ফেরতের ঘটনা ঘটেছে। যশোর সদর, শার্শা, বাঘারপাড়া, মণিরামপুর ও কেশবপুরে ১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তরের আওতায় এই তিন উপজেলার ছয়টি খাল সম্পূর্ণরূপে খনন করতে না পারায় বড় অঙ্কের টাকা ফেরত গেছে। কেশবপুরে ব্যাসডাঙ্গা খাল খননের বরাদ্দ অর্থের বেশির ভাগই প্রকল্প চেয়ারম্যান এবং ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যেনতেনভাবে খনন করে ২২ লাখ ৭২ হাজার ৪৪৩ টাকা উত্তোলন করেন প্রকল্প চেয়ারম্যান। শুধু এক্সকেভেটর ড্রাইভার জয়নাল গাজীকে ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং শ্রমিকদের মজুরি বাবদ আড়াই লাখ টাকা কাজের বিল দিয়েছেন। অবশিষ্ট টাকা ভাগবাঁটোয়ারা হয়েছে। একই উপজেলার বাঁশবাড়িয়া খালটি খননেও অনিয়ম হয়েছে। মনিরামপুরে নকশা পরিকল্পনা অনুযায়ী খাল পুনঃখনন করতে না পেরে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৫৮ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ভুয়া ব্যাংক হিসাবে শ্রমিকের টাকা আত্মসাৎ: নোয়াখালী প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান চৌধুরী জানান, সোনাইমুড়ীর শিমুলিয়া-গজারিয়া দুই কিলোমিটার খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে শ্রমিকের পরিবর্তে এক্সকেভেটর (ভেকু) দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। ভুয়া শ্রমিকের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া খালের পাড়ের মাটি বিক্রি এবং বৃক্ষরোপণ না করারও অভিযোগ রয়েছে।
কালের কণ্ঠ
‘মাদক চক্র নিয়ন্ত্রণে নারীরাও’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, গাজীপুরের মাদক কারবার নিয়ে কথা উঠলে শুরুতেই আসে টঙ্গীর নাম। যোগাযোগব্যবস্থা ও ভৌগোলিক কারণে রাজধানীসংলগ্ন টঙ্গীর হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক, এরশাদ নগরসহ সেখানকার বস্তিগুলো দেশের অন্যতম মাদকের হাট হয়ে উঠেছে।
বস্তির খুপরি ও ঘিঞ্জি ঘরগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই, প্রতিদিন এসব স্থানে কোটি কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা হচ্ছে। আর মাদকের এই বিশাল সাম্রাজের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন মোমেনা বেগম, আফরিনা আক্তার, ময়না খাতুন, কুলসুম ও কারিমা বেগম—এই পাঁচ নারী মাদক মাদক কারবারি। মাদক সেবন করে অনেকের অকালমৃত্যু হয়েছে। আবার অনেকে ধন-সম্পদ খুইয়ে নিঃস্ব হলেও এই নারী মাদক কারবারিরা হয়ে উঠেছেন কোটিপতি।
টঙ্গীর বাইরে গাজীপুর মহানগরীর লক্ষ্মীপুরা এলাকার তাহমিনা ও আশা এবং কাশিমপুরের ডালিয়া বেগমও মাদক কারবার করে হয়ে উঠেছেন কোটিপতি। এই নারী মাদক কারবারিদের সহায়তায় কাজ করেন আরো শতাধিক নারী।
মোমেলা বেগম: টঙ্গীর কোটিপতি মাদক কারবারির একজন মোমেলা বেগম (৪৬)। তিনি টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী। টঙ্গীর বড় পাইকারি মাদক কারবারিদের একজন তিনি। গাঁজা দিয়ে কারবার শুরু করলেও পরে দেশের সীমান্ত এলাকা থেকে মোমেলা বেগম ফেনসিডিলের বড় চালান আনতে শুরু করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় হেরোইনের কারবার। আর সর্বশেষ তাঁর কারবার গড়ায় ইয়াবায়। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সরাসরি ইয়াবা আনেন এমন ১৯টি মাদক মামলার আসামি তিনি।
মাদক কারবারিদের পুলিশের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে মোমেলা বেগমের নাম। দেড় যুগের মাদক কারবারে মোমেলা গড়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। টঙ্গীর ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের মরকুনের কুদ্দুস খলিফা সড়কে ‘জাহিদ হাসান ভিলা’ নামে রয়েছে তাঁর বহুতল বিলাসবহুল বাড়ি। একই ওয়ার্ডের শিলমুন পূর্বপাড়া যোগীবাড়ি সড়কে অর্ধকোটি টাকায় কিনেছেন আরো একটি বাড়ি। পুবাইলের করমতলা পূর্বপাড়া আবাসিক এলাকায় পৌনে চার কাঠা জমিতে রয়েছে তাঁর আধাপাকা আরেকটি বাড়ি। ব্যাংক মাঠ বস্তিতে রয়েছে একাধিক আধাপাকা ঘর। স্বামী জাহাঙ্গীর আলমকে কিনে দিয়েছেন চারটি মিনিট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশা। মেয়েজামাই পুলিশের সোর্স হৃদয়কে কিনে দিয়েছেন ২০ লাখ টাকা দামের প্রাইভেট কার। এ ছাড়া টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় মোমেলার নামে-বেনামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। একাধিক বাড়ি-গাড়ি থাকার পরও বস্তি ছাড়েননি মোমেলা। হয়েছেন বহুবার গ্রেপ্তার। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর ৪০০ ইয়াবা ও ৪০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হন মোমেলা।
ময়না খাতুন: ব্যাংক মাঠ বস্তির আরেক নারী মাদক কারবারি ময়না খাতুন (৫৫)। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ মহিলা আওয়ামী লীগের স্থানীয় ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক। এক ডজন মামলার আসামি ময়না খাতুনের পুরো পরিবার মাদক কারবারে জড়িত। মেয়ে নার্গিস ও পুত্রবধূ রোজীর নামও রয়েছে শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকায়। বিপুল মাদকসহ একাধিকবার র্যাব ও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন নার্গিস। ময়না খাতুনের ভাই শফিকুল ইসলাম টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালান আনতে গিয়ে কক্সবাজার পুলিশের হাতে ছয় হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের পর দুই বছর জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে এসে ফের রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিপুল ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। ময়না খাতুনের কাছ থেকে পাইকারি কিনে খুচরা বিক্রি করেন রানী (৪০) ও তাঁর ছেলে রাব্বানি (২৫)। ময়নার ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুও মাদকের ডিলার। তাঁর বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা। ময়না ও তাজুল মাদকের টাকায় গাজীপুর ও মাদারীপুরে গড়ে তুলেছেন কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। টঙ্গীর শিলমুন জাম্বুরেরটেক এলাকায় তাজুল ইসলাম শ্বশুর সোলেমান ফরাজির নামে কিনেছেন ৮.৫৯ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একটি টিনশেড বাড়ি। মাদারীপুরের শিবচরের হিন্দুপাড়ায় রয়েছে কয়েক বিঘা জমি। বেশির ভাগ সম্পত্তিই তাজুল তাঁর স্ত্রী রোজীর নামে কিনেছেন বলে জানা গেছে।
আফরিনা আক্তার: টঙ্গীর আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি আফরিনা আক্তার (৪০)। থাকেন টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তিতে। তিনি ওই বস্তির জামাল হোসেনের স্ত্রী। এলাকায় তিনি পরিচিত ‘বড় আপা’ নামে। মাদক কারবারে তাঁকে সহযোগিতা করেন স্বামী জামাল ও ভাই শ্রাবণ। একসময় টঙ্গীর বড় পাইকারি ফেনসিডিল কারবারি ছিলেন তিনি। বর্তমানে বিক্রি করেন ইয়াবা। মাদকের টাকায় তিনিও কোটিপতি।
কুলসুম: টঙ্গীর কেরানীরটেক বস্তির শীর্ষ মাদক কারবারি কুলসুম (৩৫)। মাদক কারবারে তাঁর রয়েছে বিশাল বাহিনী। মাদক কারবার করে একসময়কার অতি দরিদ্র কুলসুমের ভাগ্য বদলে যায়। রেলওয়ের সরকারি জায়গা দখল করে কুলসুম এবং তাঁর বাহিনী গড়ে তুলেছে মাদক স্পট। কিনেছেন জমি, বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ি। করছেন বিলাসী জীবন যাপন। গত জুলাই মাসে আট কেজি গাঁজাসহ তাঁর বোন নার্গিসকে আটক করে টঙ্গী পূর্ব থানার পুলিশ। কুলসুমের মাদক কারবারের অন্যতম সহযোগী তাঁর বোনের ছেলে রাকিব।
কারিমা বেগম: টঙ্গীর কেরানীরটেক বস্তির আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি কারিমা বেগম (৩৫)। গত ১৮ জুলাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। মাদকের ডিলার কারিমার বিরুদ্ধে রয়েছে এক ডজন মাদক মামলা। দীর্ঘদিন মাদক কারবার করে গড়ে তুলেছেন একাধিক বহুতল ভবনসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ।
ডালিয়া: ছয়-সাত বছর আগেও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর নয়াপাড়ার কাঁঠালতলা মহল্লার ডালিয়া (৩৮)। তাঁর স্বামী ওয়াশিম চালাতেন রিকশাভ্যান। এখন ওই এলাকায় তাঁদের রয়েছে পাঁচটি বাড়ি। এর মধ্যে দুটি ছয়তলা, বাকিগুলো টিনশেড ভবন।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গাজীপুর মহানগরীতে ছোটবড় অনেকগুলো বস্তি রয়েছে, যেগুলোতে মাদক কারবার চলে। এই কারবার বন্ধে গত আট মাসে অসংখ্য অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে বিপুল মাদকসহ ছোটবড় অনেক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। কিছুদিন আগে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন এবং গত সোমবার বস্তির মাদকের আস্তানাগুলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সহায়তায় উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে সব বস্তিতে পর্যায়ক্রমে অভিযান চালানো হবে।’
সমকাল
‘এল নিনোর প্রভাব শ্রীলঙ্কায়, ঝুঁকিতে বাংলাদেশের কৃষি’—এটি দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, এল নিনোর প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় তীব্র শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করছে। দেশটির সাত জেলায় ইতোমধ্যে এক লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। সংকটে পড়া ৩৪ হাজার ৬০৮ পরিবারের এক লাখ ১৩ হাজার ৩৫৪ জনকে খাবার পানি সরবরাহ করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে আট হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার একর চাষের জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে শ্রীলঙ্কা সরকার প্রায় ৩০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনোর প্রভাবের এমন চিত্র বাংলাদেশের জন্যও সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন কৃষি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এল নিনোর প্রভাব একেক অঞ্চলে একেকভাবে প্রকাশ পায়। কোথাও খরা ও পানির সংকট বাড়তে পারে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। চলতি বছর বাংলাদেশে আবহাওয়ার ধরন ইতোমধ্যে অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের পর হঠাৎ অতিবৃষ্টি, বর্ষায় বৃষ্টির ঘাটতি, তাপপ্রবাহ এবং স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক বেশি বৃষ্টিপাত কৃষির প্রচলিত মৌসুমি ছন্দে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং আগামী বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বাংলাদেশের সামনে খরা, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং সেচের পানির সংকটের মতো একাধিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রে এখন চলতি আমন মৌসুমের শেষ ভাগ, শীতকালীন ফসল এবং সবচেয়ে বেশি বোরো মৌসুম। কারণ, বোরো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ধান উৎপাদন মৌসুম এবং শুষ্ক মৌসুমের এই ফসল সেচের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ কোথায়
আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত খুব কম হয়েছে। এর পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। মার্চে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৮ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়। এপ্রিলে ৭৮ শতাংশ এবং মে মাসে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বর্ষার মাস জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। জুলাইয়ে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি হলেও এর বড় অংশ অল্প সময়ের মধ্যে নেমেছে। চট্টগ্রামে পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতা আরও স্পষ্ট। ওই অঞ্চলে বছরে গড়ে প্রায় দুই হাজার ৯১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু ৫ থেকে ১২ জুলাই মাত্র আট দিনে সেখানে এক হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ, আট দিনেই বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ পানি নেমেছে।
গত আগস্ট মাসে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এই মাসে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং দেশের কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
২১ আগস্ট প্রকাশিত বিবিসি ওয়েদারের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান এল নিনো ‘জীবিত মানুষের স্মৃতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী’ এল নিনোতে পরিণত হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতোমধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি এবং তা ৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৭ সাল হতে পারে বিশ্বব্যাপী রেকর্ড উষ্ণতম বছর।
বাংলাদেশে এখন উদ্বেগের বড় জায়গা আমন ধানের শেষ ভাগ, শীতকালীন ফসল এবং পরবর্তী বোরো মৌসুম। দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনোর কারণে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে গেলে আমন ধানের চারা রোপণ ও বেড়ে ওঠায় পানির সংকট দেখা দিতে পারে। আবার বেশি তাপমাত্রায় মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে গেলে সেচের প্রয়োজন বাড়বে। এতে আলু, পেঁয়াজ, গম, ভুট্টা, সরিষা ও শীতকালীন সবজি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। উষ্ণ শীত এসব শীতকালীন ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি’। খবরে বলা হয়, সরকারের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে চার লাখ ৭৬ হাজার ২৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ফলে এক অর্থবছরেই সরকারের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ১১ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সরকারি রাজস্ব প্রাপ্তিসংক্রান্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন, এপ্রিল-জুন ২০২৬ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল চার লাখ ২২ হাজার ৬৩৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে আদায় বেড়েছে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিক থেকে এ প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়।
শেষ প্রান্তিকে আদায় বাড়লেও প্রশ্ন রয়ে গেছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক এপ্রিল-জুনে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৩৮৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিক জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় এটি ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি এবং আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ অর্থবছরের শেষ তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য গতি দেখা গেছে।
তবে এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে এনবিআর কর এবং অ-কর রাজস্ব থেকে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আদায়কৃত কর থেকে। অ-এনবিআর করের অবদান মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ। আর অ-কর রাজস্বের অংশ ১২ দশমিক ৭ শতাংশ।
এতে স্পষ্ট হয়, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থায় এখনো এনবিআর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। রাজস্বের বিকল্প উৎসগুলো এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে এনবিআরের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
এনবিআর ৮২ শতাংশের কিছু বেশি লক্ষ্য পূরণ করেছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের জন্য সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে বছর শেষে আদায় হয়েছে চার লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এনবিআর তার লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮২ দশমিক ছয় শতাংশ আদায় করতে পেরেছে।
একই সময়ে এনবিআর কর রাজস্ব আগের অর্থবছরের তিন লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে চার লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
এনবিআরের এ আদায় বৃদ্ধির মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত বিষয় রয়েছে-রাজস্ব বৃদ্ধির বড় অংশ এখনো পরোক্ষ করনির্ভর।
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এনবিআর এক লাখ ২৭ হাজার ৬১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা কর আদায় করেছে। আগের প্রান্তিকের তুলনায় তা ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ১৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
কিন্তু এ রাজস্বের মধ্যে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ ৪৭ হাজার ১১৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বিপরীতে পরোক্ষ কর আদায় হয়েছে ৮০ হাজার ৪৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এনবিআরের শেষ প্রান্তিকের কর আদায়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে পরোক্ষ কর থেকে।
বণিক বার্তা
‘সরকারের সবচেয়ে বড় পাঁচ বিভাগই ভঙ্গুর ও অদক্ষতায় পরিপূর্ণ’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৬৩১ জন প্রাথমিক শিক্ষা খাতে কর্মরত।
সরকারের ১৪ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অর্ধেকের বেশি নিয়োজিত পাঁচটি খাতে। প্রাথমিক শিক্ষা, পুলিশ, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও রেল—নাগরিকের গড়ে ওঠা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এসব খাতে কর্মরত সরকারি জনবলের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার। কিন্তু বেশি জনবল কর্মরত থাকলেও এ পাঁচ খাতই কাঠামোগত দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও সেবা প্রদানে বিভিন্নমুখী ঘাটতিতে জর্জরিত। বিপুল জনবল ও অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে নাগরিক সেবায় প্রত্যাশিত দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে এসব বিভাগ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে।
চার লাখেরও বেশি কর্মী নিয়োজিত থাকা প্রাথমিকে শিশুদের মৌলিক শিক্ষা অর্জনের মান অনেক দিন ধরেই নিম্নমুখী। এ পর্যায়ে শিক্ষকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রাথমিকের দুর্বলতা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পুলিশের বিরুদ্ধে রয়েছে পেশাগত অদক্ষতা, জবাবদিহির ঘাটতি ও ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিপুল জনবল নিয়োজিত থাকার পরও চিকিৎসাসেবা নিয়ে নাগরিকের ভোগান্তি কাটছে না। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে দেখা দিয়েছে সেবা ও সরবরাহ ব্যবস্থার বড় ধরনের সংকট। আর বিপুল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও জনবল নিয়েও রেল পরিচালিত হচ্ছে ধারাবাহিক লোকসান ও ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতার বোঝা নিয়ে।
নিম্নমানের সেবা, অদক্ষতা, হয়রানি ও ঘুস-দুর্নীতির মতো অভিযোগ থেকে এখনো সরকারের বিভিন্ন সেবা বিভাগ কাঙ্ক্ষিত উত্তরণ ঘটাতে পারেনি। সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ সরকারের বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামোয় এ খাতে সরকারের ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বাড়বে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। সরকারের বর্ধিত এ ব্যয় জনগণকে জোগান দিতে হবে। এমন প্রেক্ষাপটে ভঙ্গুর ও অদক্ষতায় আক্রান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে জনগণ কতটা কার্যকর সেবা পাবে তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিশ্লেষক মহলে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যার সমাধান কেবল জনবল ও বেতন-ভাতা বাড়ানোয় হওয়ার নয়; বরং জরুরি প্রয়োজন কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার প্রশাসন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এতে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং জনগণের মানসম্মত সেবা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৬৩১ জন প্রাথমিক শিক্ষা খাতে কর্মরত। বিশ্বব্যাংকের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে সংস্থাটির বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন শিক্ষা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাও তীব্র। দেশের প্রাথমিক শিক্ষা বড় ধরনের লার্নিং ক্রাইসিসে (শিখন ঘাটতি) রয়েছে। ১০ বছর বয়সী শিশু শিক্ষার্থীদের ৫১ শতাংশই তাদের বয়স উপযোগী সাধারণ বাংলা-ইংরেজি লেখা পড়তে ও বুঝতে পারে না। পাশাপাশি তারা শ্রেণী উপযোগী গাণিতিক দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির পেছনে যেসব কারণ রয়েছে, তার অন্যতম দুর্বল পাঠদান পদ্ধতি ও দক্ষ-প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকদের প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। তা সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় এক লাখ শিক্ষক প্রশিক্ষণবিহীন, যা মোট শিক্ষকের ২৫ শতাংশ। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) তথ্য বলছে, অনেক সময় শিক্ষকদের দক্ষতা থাকলেও তার শ্রেণীকক্ষে তা প্রয়োগ করতে পারছেন না।
চলতি বছর নেপ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ডিজিটাল শিক্ষা ও একুশ শতকের দক্ষতা প্রয়োগে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন দেশের শিক্ষকরা। প্রায় ৬০ শতাংশ নিজেদের দক্ষ দাবি করেন। তবে বাস্তবে শ্রেণীকক্ষে তা দেখাতে পারছেন কেবল এক-চতুর্থাংশ শিক্ষক। আট বিভাগের ১৬টি উপজেলার ১৩ হাজারের বেশি শিক্ষকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ২১ শতকের দক্ষতার উপলব্ধি এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ অনুসন্ধান’ বিষয়ক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাথমিকসহ সব শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। নতুন পে-স্কেলে তাদের বেতন বাড়তে যাচ্ছে। কিন্তু বেতন বৃদ্ধি মানেই সেবার মান বৃদ্ধি পায়—বিষয়টি এমন নয়। সেবার মান বৃদ্ধির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষত শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে তাদের সেই দক্ষতার প্রয়োগ নিশ্চিত করা। শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে সঠিকভাবে পাঠদান করছেন কিনা সে বিষয়টি যেমন দেখতে হবে, তেমনি কোথাও তাদের ভুলত্রুটি হলে সেখানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হবে।’
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনা: নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই সংস্থার রশি-টানাটানি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মেট্রোরেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) মধ্যে আবার রশি টানাটানি চলছে। মেট্রোরেল পরিষেবাকে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ ঘোষণার জন্য মেট্রোরেল আইন, ২০১৫ সংশোধনে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ডিএমটিসিএলের প্রস্তাব ঘিরে এবারের এই বিরোধ।
ডিটিসিএ বলছে, আইন অনুযায়ী মেট্রোরেল নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ তারা। মেট্রোরেল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ডিএমটিসিএল তাদের অধীন সংস্থা। তাই সংশোধনের প্রস্তাব ডিটিসিএর মাধ্যমে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত। মতামত চাওয়ায় ডিটিসিএ তা না দিয়ে বরং আপত্তি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে।
ডিটিসিএর আপত্তিতে আইন সংশোধনের বিষয়টিও ঝুলে আছে। সূত্র জানায়, মেট্রোরেলকে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ ঘোষণা এবং মেট্রোরেল আইন, ২০১৫ সংশোধনের জন্য ডিএমটিসিএল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত জানতে চেয়ে ডিটিসিএ-কে চিঠি দেয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ও ২০২৫ সালের মে মাসে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এমন চিঠি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের ৪ জুন ডিটিসিএ তাদের আপত্তি ও মতামত মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এসব চিঠিতে প্রস্তাবিত সংশোধনে জোরালো আপত্তি জানিয়ে ডিটিসিএ বলেছে, আইন সংশোধনের প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে ডিটিসিএর মাধ্যমেই প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো যুক্তিযুক্ত।
চিঠিগুলোতে বলা হয়েছে, মতামতের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ১৮ আগস্ট মন্ত্রণালয় থেকে আবারও মতামত চাওয়া হয়। এর জবাবে ২৭ আগস্ট চিঠি দিয়ে আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ডিটিসিএ।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ডিটিসিএর অধিভুক্ত একটি কোম্পানি ডিএমটিসিএল। নিয়ম অনুযায়ী অধীনস্থ কোনো কোম্পানি বা সংস্থা সরাসরি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা নয়। এ ধরনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে হয়। এর আগে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্তেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার অধীন কোম্পানিগুলো যেমন সরাসরি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে না, ডিএমটিসিএলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। ডিটিসিএর পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বিষয়টি কঠোরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ডিটিসিএ বলছে, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১২-এর ধারা ১৯ অনুযায়ী ডিএমটিসিএল হলো ডিটিসিএর গঠিত একটি কোম্পানি। মেট্রোরেল আইন, ২০১৫-এর ধারা ২(৩) অনুযায়ী ডিটিসিএ হলো ডিএমটিসিএলের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ।
দেশ রূপান্তর
‘৭৪% ফাঁসিই হাইকোর্টে টেকে না’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ফেনীর আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় মোট ১৬ আসামিকে প্রাণদণ্ড দিয়েছিলেন জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। তবে সাত বছর পর গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট মাত্র দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করে। ২০১৯ সালে বিচারিক আদালতে যারা ফাঁসির দণ্ড পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে চারজনের সাজা কমে হয়েছে যাবজ্জীবন, আর বাকি ১০ জন পেয়েছেন খালাস। হাইকোর্টের এই রায় নতুন করে সামনে এনেছে গুরুতর একটি প্রশ্ন। দেশে চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন মামলায় বিচারিক আদালতে ‘গণহারে’ ফাঁসি দেওয়ার প্রবণতার পেছনে দায় কার?
নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণার সময় হাইকোর্টও বিষয়টি আমলে নিয়েছে। উচ্চ আদালত বলেছে, রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারক মামুনুর রশিদ তার বিচারিক মানসিকতা ও বিচারিক বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করেননি। এ কারণে তাকে ফৌজদারি মামলা পরিচালনা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা নিতে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশও দিয়েছে হাইকোর্ট। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার এ বিচারিক কর্মকর্তা সবশেষ নিম্নতম মজুরি বোর্ডে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি এই প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে যোগ দেন।
তবে উচ্চ আদালতের রায়ের পরেও বিচারিক আদালতে একই সঙ্গে অনেক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রবণতায় খুব একটা ভাটা পড়েনি। ঢাকা, জামালপুর, ভোলা ও ময়মনসিংহে গত মঙ্গলবার একদিনে হত্যা ও ধর্ষণের চারটি মামলায় ১০ জন আসামির প্রাণদণ্ড হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আসামিদের যথাযথ শাস্তি হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি আবার ঢালাও ফাঁসি দেওয়ার প্রবণতা আইনের শাসনের পরিপন্থী।
পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিচারিক আদালতে অনেক মামলায় ঢালাও ফাঁসির রায় দেওয়া হলেও উচ্চ আদালতে সেগুলোর বেশিরভাগই টিকছে না। নমুনা বিশ্লেষণের জন্য দেশ রূপান্তর বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে গত মধ্য জুন থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হওয়া ২০টি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আসামিদের আপিল ও জেল আপিল মামলার রায় পর্যালোচনা করেছে। দেখা গেছে এসব মামলায় গত কয়েক বছরে বিচারিক আদালত ৪৯ জনের ফাঁসির রায় দিয়েছিল। তবে হাইকোর্টের রায়ে মাত্র ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রয়েছে। অর্থাৎ বিচারিক আদালতের প্রায় ৭৪ শতাংশ ফাঁসির আদেশ রহিত হয়েছে হাইকোর্টে।
এই ২০টি মামলার প্রায় সবই ছিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে। এর মধ্যে ১০টি স্ত্রী হত্যা মামলা, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলা চারটি, নারী হত্যা একটি, ধর্ষণের একটি, অপহরণের একটি, দলবদ্ধ ধর্ষণের একটি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার একটি এবং ডাকাতিসহ হত্যার ঘটনায় একটি মামলা রয়েছে। বিচারিক আদালতে ৪৯ জনের ফাঁসির রায়ের মধ্যে হাইকোর্টের রায়ে ৩৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা রহিত হয়েছে। এই ৩৬ জনের মধ্যে যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে ১৮ জনের। খালাস পেয়েছেন ১৭ জন। একজন আসামির আট বছর কারাবাসকে সাজা হিসেবে গণ্য করে তাকে মুক্তির আদেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৩ জনের মধ্যে এক আসামি ছিলেন শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযুক্ত। তবে সাজা বহাল থাকার পর জানা যায় তিনি কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। পরে তার রায়টি বাতিল করে হাইকোর্ট।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা, একজন ফৌজদারি আইন বিশ্লেষক, একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বর্তমানে কর্মরত ও অবসরে যাওয়া দুজন জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ, হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের দুজন আইনজীবীর অভিমত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিচারিক আদালতের কিছু বিচারকের মধ্যে ব্যাপকহারে প্রাণদণ্ড দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের জনচাপও এই প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রাখছে। তবে বিচারিক আদালত যে দণ্ডই দিক না কেন, মামলাগুলো হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে যাওয়ার পর গভীর পর্যবেক্ষণ, নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তদন্তে দুর্বলতা, সাক্ষীদের বক্তব্যে অসঙ্গতি, আসামির বয়স ও অসুস্থতা, আসামিদের দীর্ঘদিন কনডেমড সেলে রাখা, নারী আসামি, উচ্চ আদালতের পূর্ববর্তী নজির, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কি না সেসব বিবেচনায় নেয় উচ্চ আদালত।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মনে করেন, বিচারিক আদালতে যেভাবে সাজা হয়, তার বিপরীতে উচ্চ আদালতে বিচারিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে আমলে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে অনেক নজিরভিত্তিক পর্যালোচনাও হয়। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এসব বিষয় প্রাধান্য পায়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো ফৌজদারি মামলায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে কয়েকটি আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে উচ্চ আদালত বিচারিক আদালতের রায়ের বিষয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে থাকে। এ কারণেই হয়তো রায়ের ক্ষেত্রে বৈপরীত্য দেখা যায়। তবে কোনো মামলায় বিচারিক ও উচ্চ আদালতের রায়ের মধ্যে ব্যাপক বৈপরীত্য থাকা উচিত নয়।’
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘ঘুরে বেড়াচ্ছেন ৫২ ফাঁসির আসামি’। খবরে বলা হয়, কারাবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যেসব আসামির কনডেম সেলে থাকার কথা, তাদের অনেকেই দুই বছরের বেশি সময় মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মৃত্যুর বিভীষিকায় আচ্ছন্ন কারাগারের চার দেয়ালের বন্দিজীবনে না ফিরতে গাঢাকা দিয়ে রয়েছেন তারা। অথচ জেল পলাতক সেসব আসামির অনেকেরই এত দিনে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা। আবার অনেকের চরম উৎকণ্ঠায় ফাঁসির প্রহর গুনতে গুনতে সৃষ্টিকর্তার কাছে পাপমোচনের দোয়া চাইতে থাকার কথা। স্বজন হারানো অনেক পরিবার শেষ সান্ত্বনা হিসেবে হয়তো দীর্ঘ বছর ধরে অপেক্ষা করছিল এসব আসামির মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ পাওয়ার। কিন্তু এই আসামিরা কোথায় আছেন, কেউ দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন কি না-এর সঠিক কোনো তথ্য নেই কারও কাছে। কারা সূত্র বলছে, একাধিক কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৯৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে ৪৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ৫২ জন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
জানা গেছে, পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কেউ হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি, কেউ সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িত, আবার কারও বিরুদ্ধে রয়েছে জঙ্গিবাদের অভিযোগ। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের ছোট কাজরা গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (৩০) তেমনি একজন। গণ অভ্যুত্থানের সময় গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে সংঘটিত দাঙ্গা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিনি অন্যান্য বন্দিদের সঙ্গে কারাগারের দেয়াল টপকে পালিয়ে যান। রাজধানীর মতিঝিলের একটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন তিনি। প্রায় দুই বছর মুক্ত বাতাসে ঘোরার পর তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়।
একই কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন গোপালগঞ্জের আব্দুল্লাহ শিকদার। সুদের টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীকে হাতুড়িপেটা ও পরে কুপিয়ে হত্যার দায়ে আব্দুল্লাহ এবং তার তিন সহযোগীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে তাকে রাখা হয়েছিল হাই সিকিউরিটি কারাগারে। আব্দুল্লাহ শিকদারও গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে যারা পলাতক রয়েছে তারা মোয়াজ্জেম ও আব্দুল্লাহ শিকদারের চেয়েও দুর্ধর্ষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পলাতকদের অনেকে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করছেন, নিয়মিত অবস্থান বদলাচ্ছেন এবং আত্মগোপনে থাকতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। তাই তাদের খুঁজে বের করা সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং কারা অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ’২৪-এর জুলাই-আগস্টের সেই অস্থির সময়ে দেশের অন্তত ১৭টি কারাগারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। কোথাও বাইরের হামলায় নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, কোথাও আবার ভিতরের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই ধারাবাহিক ঘটনার সুযোগে কারাগার থেকে পালিয়ে যায় দুই হাজারের বেশি বন্দি। তাদের মধ্যে ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, জঙ্গি, শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত বন্দিরা। অর্থাৎ যাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়, তাদের একটি অংশই কারাগারের বাইরে চলে যায়।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সেই সময় ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দি পালিয়ে যান। যাদের মধ্যে ৬৯০ জন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ জন বন্দির মধ্যে ১৬৬ জনের কোনো পরিচয় বা নথিপত্র কারা কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। এ ছাড়া বিভিন্ন কারাগার থেকে নয়জন জঙ্গি সদস্য পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জনকে পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও তিনজন পলাতক রয়েছেন। আর এখনো যারা পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ ৫২ জনের অবস্থান কোথায়, সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর নেই। তাদের কেউ কেউ ফাঁসি কার্যকর হওয়ার ভয়ে দেশ ছেড়েছেন বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে পালিয়ে যায় ২০২ জন বন্দি। তাদের মধ্যে ৮৮ জনই ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
আগামীর সময়
ডিসেম্বরে ফেরা হচ্ছে না হাসিনার। আগামীর সময়ের প্রতিবেদন । এতে বলা হয়, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছিলেন ভারতে অবস্থানকারী ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি, ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক সমীকরণ এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তিনি ডিসেম্বরে ফিরছেন না। তার দেশে ফেরার পথ মূলত আইনি, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক— তিন দিক থেকেই বন্ধ।
খোঁজ নিয়ে এও জানা গেছে, ঢাকা এখন আর শুধু শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে আটকে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করতে পারেন; কিন্তু সেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া, রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া কিংবা কোনো ধরনের সাংগঠনিক তৎপরতায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ যেন তাকে দেওয়া না হয়। অর্থাৎ ঢাকার বর্তমান অবস্থান অনেকটাই পরিষ্কার— শেখ হাসিনাকে ভারত রাখবে কি না, সেটি ভারতের বিষয়; কিন্তু ভারতের মাটি ব্যবহার করে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারবেন না।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা দেশ ছেড়ে যান। অনেকে আছেন কারাগারে, কেউ আত্মগোপনে। আকস্মিক এ পটপরিবর্তনের পর দলটি কার্যত নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক সংকটে পড়ে।
এরপরও ভার্চুয়াল মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন শেখ হাসিনা। তৃণমূল নেতাকর্মীদের হতাশা কাটাতে গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। ঘোষণাটি আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ে নতুন আশার সঞ্চার করে। কিন্তু সে ঘোষণা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই এখন পর্যন্ত।
ফেরার ঘোষণা, কিন্তু বাস্তব প্রস্তুতি নেই
বিদেশে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা এবং মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দিতে বছরের শেষভাগে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার যে বার্তা প্রচার করা হয়েছিল, সেটি এখন মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই সীমাবদ্ধ। দলীয় পর্যায়ে তার ফেরাকে কেন্দ্র করে দৃশ্যমান কোনো বড় প্রস্তুতি নেই। বরং দলের ভেতরেই ধরে নেওয়া হচ্ছে, ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না। এখন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন প্রশ্ন— ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে না ফিরলে কী ব্যাখ্যা দেবে দল এবং কীভাবে সামাল দেবে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা।
ঢাকার চাওয়া: ভারত রাখুক, রাজনীতি করতে না দিকরাজনৈতিক সংবাদ পড়ুন
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন বিষয় হচ্ছে, ভারতকে ঘিরে সরকারের অবস্থান। ঢাকা এখন আর শুধু শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে আটকে নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের কাছে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হচ্ছে— ভারতের ভূখণ্ড যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার উৎস না হয়। সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লিকে জানানো হয়েছে, ভারত চাইলে শেখ হাসিনাকে সেখানে রাখতে পারে; কিন্তু তার অবস্থানকে কোনোভাবেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা বা প্রভাব বিস্তারের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের আশঙ্কা, শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে অবস্থান করে নিয়মিত রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে নির্দেশনা দেওয়া অব্যাহত রাখলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ঢাকার অবস্থান তাই পরিষ্কার— শেখ হাসিনা ভারতে থাকলে থাকুন; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ যেন না পান। এ নিশ্চয়তাই এখন বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তারেক রহমানের ভারত সফরেও ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’
এ অবস্থান সরাসরি প্রভাব ফেলছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরেও। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের মধ্যেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে হলে ভারতের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে ঢাকা চায়, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও তিনি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে না পারেন— সে বিষয়ে দিল্লির সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। অর্থাৎ তারেক রহমানের সফরের আলোচনায় এখন শুধু বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি কিংবা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়; শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এ কারণেই শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ফেরার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়েছে।
সরকারের একজন উপদেষ্টা আলাপকালে এ প্রসঙ্গে আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা যদি ভারতে থাকেন এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের অস্বস্তি বাড়বে। আর ভারত যদি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমা আরোপ করে, তাহলে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা কার্যত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরা আটকে থাকার পেছনে একাধিক দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কারণ রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের রায় ও আইনি চাপ
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার অন্যতম বাধা এখন আইনি। জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হয়েছে। একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে। ফলে দেশে ফিরলেই তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। গ্রেপ্তার এড়ানো কিংবা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ তার সামনে নেই। এ বাস্তবতায় স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শূন্য।
প্রত্যর্পণ এখন দিল্লির সিদ্ধান্তের বিষয়
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে বাংলাদেশ তার আইনি অবস্থান জানিয়েছে। কিন্তু তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ফলে তার দেশে ফেরার বিষয়টি এখন বাংলাদেশের একক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ নেই। ভারতের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া, কূটনৈতিক বিবেচনা এবং দুই দেশের সম্পর্ক— সবকিছুর ওপর বিষয়টি নির্ভর করছে। তাই ডিসেম্বরের মতো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে, এমন কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা
গত সাড়ে ১৫ বছরে একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক যে রাজনৈতিক কাঠামো আওয়ামী লীগে সৃষ্টি হয়েছিল, ৫ আগস্টের পর তা দ্রুত ভেঙে পড়ে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বহু নেতা কারাগারে, অনেকে বিদেশে, কেউ আত্মগোপনে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বড় অংশ মামলা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এ অবস্থায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করার মতো আগের সেই সংগঠিত শক্তি আওয়ামী লীগের নেই। তৃণমূলে সমর্থন থাকলেও সেটিকে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা এখন প্রশ্নের মুখে।
নিরাপত্তাঝুঁকি
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা মানেই শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন নয়; এটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা। তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, পাল্টা কর্মসূচি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে যে জনক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।
কী ভাবছে আওয়ামী লীগ
বিদেশে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ প্রতিবেদককে বললেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা ছিল অনেকটাই তার নিজের সিদ্ধান্ত। এর আগে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু মামলা, গ্রেপ্তার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে কেউই তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ফলে শেখ হাসিনা নিজেই দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। কিন্তু ঘোষণার পর বাস্তবতা বদলায়নি। ওই সদস্যের ভাষায়, ‘নেত্রী ফিরতে চান; কিন্তু এখন বিষয়টি শুধু তার চাওয়ার ওপর নির্ভর করছে না।’
দলের সম্পাদকমণ্ডলীর দুজন নেতার ভাষ্যও একই ধরনের। তাদের একজন বললেন, ‘শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সঙ্গে এখন কূটনৈতিক নানা বিষয় জড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সমর্থন, ভারতের অবস্থান এবং আইনি প্রক্রিয়া— সবকিছু বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।’
অন্যজনের মতে, ‘ডিসেম্বরে তিনি না ফিরলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার ফেরার প্রত্যাশা ধরে রাখা হবে।’
তবে কট্টরপন্থীদের হিসাব অন্যরকম
আওয়ামী লীগের একজন কট্টরপন্থী সম্পাদক অবশ্য ভিন্ন হিসাব দিচ্ছেন। তার দাবি, দেশে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। মানুষ বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনা করতে শুরু করেছেন।
তার মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার রাজনৈতিক পটভূমি তৈরি হতে পারে। তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এখনো রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের অবস্থান তুলে ধরার সক্ষমতা তার আছে। তবে দলের এই অংশের রাজনৈতিক মূল্যায়ন ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে।
কী বলছেন বিশ্লেষকরা
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় রাজনীতি বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে। ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার ফেরা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তিনি। বললেন, ‘শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পরদিনই বলেছিলেন, ওনারা বাংলাদেশ সম্পর্কে আর আগ্রহী নন। ওনার ছেলেও লাইভে এসে জানিয়েছিলেন, তার মা আর রাজনীতিতে আগ্রহী নন। তিনি (শেখ হাসিনা) বাকি জীবন প্রবাসেই কাটিয়ে দিতে চান। সেজন্য ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফিরে আসা একটা কথার কথা মাত্র।’
এই বিশ্লেষক আরও বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা বিদেশে বসে গণতন্ত্রের কথা বললেন, দায়বদ্ধতার কথা বললেন। কিন্তু তার ক্ষমতায় থাকার জন্য বহু মানুষের জীবন চলে গেছে। তিনি এখনো তার দায় নিচ্ছেন না। দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচার করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। এর জন্য দায়বদ্ধ হতে তার ফিরে আসা অথবা তাকে ফিরিয়ে আনা উচিত।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বললেন, ‘শেখ হাসিনার ফিরে আসার বিষয়টি এখন আর তার একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক, উভয় দেশের চাওয়া, ভূরাজনীতি এবং ভারতের আইনি দিকগুলোও জড়িত— যা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। কিন্তু ডিসেম্বর খুব একটা বেশি দূরে নয়। আর এ স্বল্প সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনার ফিরে আসার তেমন কোনো আলামত এখনো স্পষ্ট নয়। তার ফেরা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও তেমন কোনো প্রস্তুতি চোখে পড়ছে না। সার্বিক পরিস্থিতি তার ফেরার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।’
