রাতের নির্জন বাজার। হঠাৎ কয়েকটি মোটরসাইকেল এসে ঘিরে ধরে এক যুবককে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয় তার মাথা ও ঘাড়ে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় একাধিক গুলি।
মৃত্যু নিশ্চিত করে মোটরসাইকেলে করেই পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। চট্টগ্রামের রাউজানের কেরানীরহাট বাজারে বৃহস্পতিবার রাতে এভাবেই খুন হন মো. আবদুল করিম (৩৬)। তিনি উরকিরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং যুবদলকর্মী। নিহত করিম প্রবাসী মো. শফির ছেলে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের কেরানীরহাট বাজারে যান করিম। সেখানে ৪-৫টি মোটরসাইকেল নিয়ে একদল অস্ত্রধারী তাকে ঘিরে ফেলে। হামলাকারীদের একজন কিরিচ দিয়ে তার মাথা ও ঘাড়ে আঘাত করে। পরে কয়েকজন মিলে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য তা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে করিমের শরীরে গুলির তিনটি আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার পেট, ঊরু ও নিতম্বে গুলি লাগে। একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেটের অংশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এ ছাড়া ঘাড় ও কপালে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
স্থানীয়ভাবে তিনি যুবদলকর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বিএনপি’র বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। তবে তার কোনো সাংগঠনিক পদ ছিল না বলে জানিয়েছেন রাউজান উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আজম। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, করিম দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে ফেরেন।
নিহত করিম এক সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। পরে বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় প্রবাসে যান। দেশে ফিরে করিম পরিবার নিয়ে হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের আমান বাজার এলাকায় থাকতেন। দিনে মাঝেমধ্যে নিজ এলাকায় এলেও রাতে তিনি আমান বাজারের বাসায় ফিরে যেতেন। তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর কেরানীরহাট বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরজমিন দেখা যায়, বাজারের প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ। সড়ক ও আশপাশের এলাকাও ছিল অনেকটা জনশূন্য। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শুক্রবার সকালে করিমের স্ত্রী বিলকিস আক্তার বাদী হয়ে রাউজান থানায় মামলা করেন। তবে মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
রাউজান থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। কী কারণে এবং কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে তা বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ। রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, এলাকায় সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ঘটনার সময় বাজার প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। ফলে হত্যার পেছনের কারণ বা হামলাকারীদের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। সকাল ১০টার দিকে তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে কেরানীরহাট বাজারে যান। ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে খোঁজ নেন। ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, নিহত করিমের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও ধর্ষণসহ মোট ৯টি মামলা রয়েছে। হত্যার কারণ এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি রাজনৈতিক বিরোধের কারণে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। হতাহতদের প্রায় সবাই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
