বর্ডার হাট এখন জঙ্গল

প্রায় ৭ বছর বন্ধ

বর্ডার হাট এখন জঙ্গল

ফন্ট সাইজ:

ঘাস, লতাপাতা ও আগাছায় ভরে গিয়ে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে কসবার তারাপুর ও ভারতের ত্রিপুরার কমলাসাগর এলাকার মধ্যেকার বর্ডার হাট। প্রায় ৭ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে এটি। তবে সম্প্রতি এই হাটের হাল অবস্থা জানতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনে চিঠি পাঠানো হয়। ২০১৫ সালের ৭ই জুন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই হাটের উদ্বোধন করেন। এরপর করোনা মহামারির কারণে ২০১৯ সালে হাটটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালে আগস্টের প্রথম দিকে পুনরায় হাট চালুর কথা থাকলেও সরকার পতনের কারণে সেটি হয়নি।

বুধবার কসবার তারাপুর গিয়ে হাটের জঙ্গলের অবস্থা চোখে পড়ে। কসবা স্টেশন থেকে অল্প এগুতে দেখা যায় হাটে যাওয়ার পথে বাঁশ বেঁধে রাখা হয়েছে। পাশে ঝুলছে ‘ভিতরে প্রবেশ নিষেধ’ নোটিশ। আদেশক্রমে বিজিবি। এখান থেকে দেড়-দুইশ’ গজ দূরত্বে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের আরেকটি সাইনবোর্ড। এতে লাল রংয়ের ওপর লেখা, ‘বাংলাদেশের শেষ সীমানা, প্রবেশ নিষেধ।’ কিন্তু তারপরও নির্জন পরিত্যক্ত হাটের দিকে হেঁটে যেতে দেখা যায় বেশ কয়েকজন নারী ও তরুণকে। উত্তর-দক্ষিণের এই রাস্তা থেকে অল্প উঁচুতে উঠলেই ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার পাশ দিয়ে হাটে যাওয়ার পাকা রাস্তা। পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে রাস্তাটি শেষ হয়েছে ২০৩৯ নম্বর পিলারের কাছে গিয়ে। হাতের বাঁয়ে হাটে ঢোকার গেট। যাতে ঝুলছে তালা। হাটটিতে উভয়পাশে ৬টি করে মোট ১২টি শেড, গণশৌচাগার ও কনফারেন্স রুম রয়েছে। এ ছাড়াও উভয়পাশে সীমানা বাউন্ডারি ও গেট রয়েছে।

আরও পড়ুন:
ওরা কারা?

শুরুতে দু’দেশের ২৫ জন করে ৫০ জন তাদের ব্যবসা খুলেন এই হাটে। পরে আরও ২৫ জন করে বাড়িয়ে সেটি একশ’ করা হয়। দু’দেশের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়ে উঠে এ হাট। সেখানে এপার-ওপারে থাকা আত্মীয় পরিজনদের দেখা সাক্ষাতের সুযোগ ঘটে। ক্রমেই হাট ঘিরে বাড়তে থাকে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের আগ্রহ। কসবা প্রশাসন থেকে জানা যায়, শুরুতে বর্ডার হাটের দিন বাংলাদেশের পক্ষে ১ হাজার ক্রেতা কার্ড ইস্যু করার প্রস্তাব থাকলেও দু’দেশের দর্শনার্থী ও বিপুলসংখ্যক ক্রেতার সমাগম হওয়ায় পরবর্তীতে বাংলাদেশের ৩/৪ হাজার ক্রেতা কার্ড পাওয়ার আবেদন করেন। সে কারণে ক্রেতা কার্ড সংখ্যা বাড়িয়ে ২ হাজার করা হয়। হাটে বাংলাদেশের মেলামাইন, খাদি কাপড়, বিস্কুট বা বেকারি সামগ্রী, শাকসবজি, ফল ও ফলের জুস, প্লাস্টিক সামগ্রী, লুঙ্গি গামছাসহ গার্মেন্টস সামগ্রী, এলুমিনিয়াম ও ক্রোকারিজ সামগ্রী, স্থানীয় তুলা, গৃহস্থালী সামগ্রী, কসমেটিকস সামগ্রী ও শুঁটকি ইত্যাদি পণ্যসামগ্রী বিক্রয় করা হতো। রোববার সীমান্ত হাটের দিন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা প্রায় ২০ বিশ লাখ টাকার সমমূল্যের পণ্যসামগ্রী বিক্রয় করতেন বলে তথ্য মিলে।
হাটটি চালু থাকাকালীন চোরাচালান কমে গিয়েছিল বলে জানান বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। তাদের ব্যবসাও ছিল ভালো। হাট বন্ধ হওয়ায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। হাট কেন্দ্রিক স্থানীয়দেরও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।

কসবার জলখাবার মিষ্টি দোকানের মালিক সেবক সাহা বলেন, হাট যখন ছিল তখন আমাদের এখানে চোরাকারবারিটা কম হতো। বর্ডার হাটে যে জিনিসটা পাওয়া যেতো সেটি চোরাইভাবে নামতো না। তাছাড়া এখানকার মানুষ হাট থেকে ফল-কলা ইত্যাদি সস্তায় কিনে এনে বিক্রি করে লাভবান হতো। তাছাড়া হাটটি ছিল দু’দেশের মানুষের মিলনমেলা। আমাদের দেশের অনেক দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতো। আবার ওদিকে কলকাতা থেকেও মানুষ এসেছে। আমার দোকানের পেছনে বসে অনেক মানুষ কথা বলতো। দই খেত, মিষ্টি খেত। অন্যরকম ফিলিংস।
তারাপুর গ্রামের গৃহিণী লুৎফা বেগম স্বামীর পাশাপাশি হাটে নিজে একটি দোকান চালাতেন। ক্রোকারিজ ও কাপড়ের ব্যবসা ছিল তাদের। জানান, ভালো টাকা আসতো ব্যবসা থেকে। একই গ্রামের আবদুস সাত্তার জানান, হাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক লোকসানের মধ্যে পড়েন। মালামাল ড্যামেজ হয়ে যায়। হাটে বেকারি আইটেম বিক্রি করতেন তিনি। ভালো লাভবান ছিলেন। খারপার গ্রামের মো. মালু মিয়া হাটে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জানিয়ে বলেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ হাট ছিল। এখন পরিত্যক্ত। এখানে দু’দেশের অনেক মানুষ আসতো। এটি চালু থাকা অবস্থায় চোরাকারবারি হতো না। চুরি, মাদক ছিল না। মাসে ৪টা বাজার। অনেক ভালো ছিলাম। হাটটি চালু করলে উপকৃত হবো। এই ব্যবসায়ীরা জানান, আমাদের দেশের মানুষের বিদেশি পণ্য অর্থাৎ ভারতীয় মালামালের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকায় আমাদের চেয়ে ভারতের দোকানিদের বেচা-বিক্রি ছিল অনেক বেশি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জুন মাসের শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনকে হাটের বিষয়ে জানতে চিঠি দেয়া হয়। এরপর জুলাই মাসে জেলা প্রশাসন থেকে কসবা উপজেলা প্রশাসনকে চিঠি পাঠিয়ে বর্ডার হাটের বর্তমান পরিস্থিতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রেরণ করতে বলা হয়।
কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছামিউল ইসলাম জানান, ডিসি অফিস থেকে হাটের সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এরপর সহকারী কমিশনার-ভূমি সরজমিন দেখে প্রতিবেদন তৈরি করেন। হাটটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।