যুক্তরাষ্ট্রে জীবিকার তাগিদে কিংবা উন্নত ভবিষ্যতের আশায় পাড়ি জমানো বাংলাদেশিদের মধ্যে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে হত্যা, ছিনতাই ও হামলার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্রবাসী কমিউনিটিতে। অন্যদিকে গত তিন মাসে ৫ জন বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের পর কমিউনিটির সংগঠন আর স্থানীয় কনস্যুলেটের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্টজনেরা।
কেউ কর্মস্থলে, কেউ খাবার ডেলিভারি দিতে গিয়ে, আবার কেউ বা নিজ বাসাতেই হয়েছেন হত্যার শিকার।
এপ্রিলে ফ্লোরিডাতে দুই শিক্ষার্থী লিমন -বৃস্টি, জুলাইয়ে ফেলোডেলফিয়া ডেলিভারি কাজ করা মাহফুজ হক এবং আগস্ট মাসে নিউইয়র্কে দোকানে কর্মরত অবস্থায় রাজু এবং টেনেসীতে রানা গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।
জামালপুর জেলার জামিল লিমন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং নাহিদা বৃষ্টি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। লিমন ২০২৪ সালে এবং বৃষ্টি ২০২৫ সালে পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাড়ি জমান।
ফিলাডেলফিয়ায় নিহত মাহফুজুলের বাড়ি রাজশাহীতে। তিনি স্ত্রী ও ১৪ বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে ওই এলাকায় বসবাস করতেন। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ফাস্টফুডের দোকান নিহত রাজু নোয়াখালীর বাসিন্দা এবং টেনেসীতে টেনেসির বেলস শহরে বাংলাদেশি মালিকানাধীন গ্যাস স্টেশন কর্মরত অবস্থায় ২৩ আগস্ট সশস্ত্র ডাকাতের গুলিতে নিহত হন শাহেদ রানা। উচ্চতর ডিগ্রি নিতে আমেরিকায় এসেছিলেন তিনি।
নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা বায়তুল আমান ইসলামিক সেন্টারের ইমাম ও খতিব মাওলানা আজিরুদ্দীন জানান, যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকের অবাধ বিস্তার বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। বন্দুকের অপব্যবহার বন্ধ না হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে ।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিহতদের পরিবারগুলো যেন স্বচ্ছ বিচার পায় সেই দাবিও তুলেছেন অনেকে। কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ও নেখক কবি মাসুম আহমেদ জানান, উন্নত জীবনের আশায় আমরা এ দেশে এসেছি। গত কয়েক মাসে যেসব বাংলাদেশি হত্যার শিকার হয়েছেন তাদের পরিবার যেনো সুষ্ঠু বিচার পায়।
তবে বাংলাদেশিদের হত্যাকে টার্গেটেড কিলিং না বলে র্যান্ডম কিলিং হচ্ছে বলে মনে করেন নিউইয়র্ক পুলিশের প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শামসুল হক।
তিনি মানবজমিনকে জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে। তাই যেকোনো সময় সর্তকতার সঙ্গে চলা এবং কারো সঙ্গে তর্ক কিংবা ঝামেলায় জড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে হত্যাকারীর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো অপরাধের পর পুলিশ তদন্ত শুরু করলে অল্প সময়ের মধ্যেই আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারে। আর বিচার কার্যক্রম যেহেতু আদালতের বিষয় তাই সেটার চুড়ান্ত ফলাফল পেতে সময় লাগতে পারে।
এদিকে ফ্লোরিডাতে দুই শিক্ষার্থী লিমন বৃষ্টির হত্যার পর সরকারিভাবে তাদের লাশ দেশে পাঠানো হলেও অন্যদের বেলায় নোয়াখালী সমিতি ছাড়া স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলোর কিংবা কনস্যুলেটের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে মনে করেন কমিউনিটি বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
দেশ পত্রিকার সম্পাদক মিজানুর রহমান জানান, কমিউনিটির অলিগলিতে হাজারো সংগঠন। কিন্তু কোথাও বাংলাদেশি কেউ বিপদে পড়লে এমনকি হত্যার শিকার হলেও এসব সংগঠন তেমন পাশে থাকে না।
হত্যাকাণ্ডের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থার ওপর বাংলাদেশ আস্থা রাখতে চায় বলে জানিয়েছেন নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল এর কনসাল জেনারেল মোহাম্মাদ মোজাম্মেল হক।
তিনি জানান, যাদের পরিবার যোগাযোগ করেছে তাদেরকে সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। নিউইয়র্ক এবং টেনিসীতে নিহত দুই বাংলাদেশির পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি বলেও দাবি করেন কনসাল জেনারেল।
এ ছাড়া নিউইয়র্ক কনস্যুলেট জেনারেল প্রবাসীদের জন্য সেপ্টেম্বর থেকে সর্বপ্রথম কল সেন্টার চালু করতে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
