রাশিয়ার সঙ্গে বৃটেনের উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে দেশটিতে আবারও বাধ্যতামূলক সেনাসেবা চালু হতে পারে এমন আশঙ্কা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তবে বর্তমানে বাধ্যতামূলক সেনাসেবা পুনরায় চালুর কোনো সিদ্ধান্ত সরকার ঘোষণা করেনি। তবে এরই মধ্যে দেশটির ১৩টি শান্তি ও ধর্মীয় সংগঠনের জোট সরকারকে এ ধরনের পদক্ষেপের সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে নাকচ করার আহ্বান জানিয়েছে।
‘দ্য এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবদেন বলেছে ফোর্সেসওয়াচ, পিস প্লেজ ইউনিয়ন ও বৃটেনের কোয়েকারদের মতো সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত জোটটি এ বিষয়ে একটি আবেদন শুরু করেছে।
তাদের দাবি, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ কিংবা সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করে কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা চালু করা উচিত নয়।
ফোর্সেসওয়াচের পক্ষ থেকে এমা স্যাংস্টার বলেন, বৃটেনের তরুণদের ওপর এখন বাধ্যতামূলক সেনাসেবার আশঙ্কা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। জাতীয় সেবা তরুণদের জন্য উপকারী এমন ধারণা প্রচার করা হলেও এর সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি এবং যুদ্ধের নৈতিক দায় জড়িয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, সামরিকীকরণনির্ভর নিরাপত্তা প্রকৃত মানবনিরাপত্তা নিশ্চিত করবে- তারা এমনটা মনে করেন না। তরুণদের বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রের সামরিক সেবায় নিয়োজিত করারও বিরোধিতা করেন তারা।
এদিকে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য বৃটেনের প্রস্তুতি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা জোরালো হয়েছে। এর মধ্যেই বাধ্যতামূলক সেনাসেবা ফিরিয়ে আনার আশঙ্কা নিয়ে শান্তিকর্মীদের প্রচারণাও গতি পেয়েছে।
বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা নিয়ে বৃটেনে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে তৎকালীন কনজারভেটিভ পার্টি ১৮ বছর বয়সীদের জন্য সামরিক বা বেসামরিক জাতীয় সেবার পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিল। অন্যদিকে লেবার সরকার সামরিক বাহিনীতে তরুণদের জন্য ‘গ্যাপ ইয়ার’-এর মতো সুযোগ সম্প্রসারণ করেছে।
তবে সামরিক প্রশিক্ষণে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণের সুযোগ এবং আইন করে নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বাধ্যতামূলক সেনাসেবা নেই। দেশটির সরকারের পূর্ববর্তী অবস্থানও ছিল, বৃটেনে পেশাদার ও স্বেচ্ছাসেবী সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল।
বাধ্যতামূলক সেনাসেবা নিয়ে তরুণদের মনোভাবও বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ইউগভের ৩ হাজার ৪৪ জনের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৪০ বছরের কম বয়সীদের ৩৮ শতাংশ নতুন বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানাবেন।
বৃটেনের সরাসরি আক্রমণ আসন্ন হলেও ৩০ শতাংশ সেনাসেবায় যেতে অস্বীকৃতি জানাবেন বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে জরিপে ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, বাধ্যতামূলক সেনাসেবা চালু করা হলে তা পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। এতে সামরিক সেবায় অংশগ্রহণের প্রশ্নে বৃটিশ সমাজে মতভেদের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
একদিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে তরুণদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পছন্দের অধিকার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
শান্তি আন্দোলনের সংগঠনগুলোর দাবি, বাধ্যতামূলক সেনাসেবা তরুণদের শিক্ষা, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় হস্তক্ষেপ করবে। তাদের মতে, সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেয়া একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সিদ্ধান্ত। কাউকে জোর করে সেই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা উচিত নয়।
বৃটেনে বাধ্যতামূলক সেনাসেবার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালে সামরিক সেবা আইনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সেনাসেবা চালু করা হয়। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৩৯ সালে আবার ব্যাপকভাবে সেনাসেবা বাধ্যতামূলক করা হয়। দ্বিতীয় দফার এ ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ১৯৬০ সালে বিলুপ্ত হয়।
