প্রথমবারের মতো প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক বছরের নিষেধাজ্ঞায় যা সম্ভব হয়নি দেশটির নৌ অবরোধ সেটিই করে দেখিয়েছে। তেহরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। খবর বার্তাসংস্থা রয়টার্সের।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অভিযানগুলোর সময় বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ইরানের অপরিশোধিত তেল ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতো। কিন্তু বর্তমান নৌ অবরোধের কারণে চীনে ইরানের নতুন কোনো অপরিশোধিত তেলের চালান পৌঁছাতে পারছে না। চীনই বর্তমানে ইরানের অবশিষ্ট প্রধান তেল ক্রেতা। ফলে ইরান সরকারের অর্থব্যবস্থা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
কেপলার, ভর্টেক্সা এবং ট্যাঙ্কারট্র্যাকার্স ডট কম এর তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসব্যাপী চলমান সংঘাতের অংশ হিসেবে গত ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অবরোধ পুনর্বহাল করার পর থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে চীনে তেহরানের কোনো অপরিশোধিত তেলের চালান সফলভাবে পৌঁছাতে পারেনি।
এর ফলে ইরান এখন এশিয়ায় ভাসমান মজুত থেকে চীনের কাছে অপরিশোধিত তেল বিক্রি করতে পারছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ভেতরে ট্যাংকারে তেল জমতে থাকায় এসব ভাসমান মজুত নতুন করে পূরণ করতে পারছে না তেহরান।
ভর্টেক্সার বিশ্লেষক ক্লেয়ার জাংম্যান বলেন, ‘২০১৯-২০ সালে সর্বোচ্চ চাপের নিষেধাজ্ঞার সময়ও প্রতি মাসে কিছু না কিছু ইরানি অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হয়েছিল। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে যে দীর্ঘ সময় ধরে বহির্মুখী তেল সরবরাহ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি রয়েছে, তখন এমনটা কখনো হয়নি।’
কেপলার ও ভর্টেক্সা-এর হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে ইরান প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট জাহাজে তুলেছে। জুলাইয়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল এবং মার্চে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল।
তেল রপ্তানিতে এই ধস ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস শুকিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সরকারি ব্যয় মেটাতে তেহরানকে নতুন করে অর্থ ছাপাতে হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে কেপলার বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহী জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, এ বছর ইরানে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ভেনেজুয়েলা ও সুদানের পর এটি বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির হার।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া থেকে বিরত থাকে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্যাঙ্কারট্র্যাকার্স ডট কম-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা সামির মাদানির মতে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ভেতরে ইরানের ২৯টি তেলবাহী ট্যাংকার রয়েছে। এসব জাহাজে মোট ৩ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, ইরানি অপরিশোধিত তেল এখনো প্রকাশ্য বাজারে বিক্রির জন্য রয়েছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে চীনে সরবরাহের জন্য ইরানি তেলের চালানও প্রস্তাব করা হচ্ছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, জুলাই ও আগস্টের তুলনায় এখন বিক্রির জন্য উপলব্ধ তেলের পরিমাণ কম। কারণ উপসাগরের বাইরে ভাসমান মজুত কমে আসছে এবং নতুন করে কোনো তেল সরবরাহ সেখানে পৌঁছাচ্ছে না।
ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, অবরোধের সীমারেখার পশ্চিমে ভাসমান মজুতে থাকা ইরানি অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ ২৬ আগস্ট পর্যন্ত বেড়ে ৪ কোটি ১৭ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ের শেষে এর পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৫৫ লাখ ব্যারেল।
অন্যদিকে, সমুদ্রে ভাসমান ইরানের মোট অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ জুলাইয়ের শেষে ১৩ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২৬ আগস্টে ১০ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।
সামির মাদানি বলেন, ‘চীন তাদের আশপাশের এলাকায় ভাসমান অবস্থায় থাকা যতটুকু তেল আছে, তা নিতে পারে। কিন্তু আপাতত সত্যিকার অর্থে এর বেশি কিছু করার সুযোগ নেই।’
তেল বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর খালি ট্যাংকারগুলো আর ইরানের বন্দরে ফিরতে পারছে না, কারণ অবরোধের কারণে তাদের প্রবেশে বাধা রয়েছে। ফলে এসব জাহাজ উপকূলের কাছে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে থাকছে।
বিশ্লেষক ক্লেয়ার জাংম্যান বলেন, ইরানের তেল বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ২৭টি ট্যাংকার বর্তমানে শ্রীলঙ্কার উপকূলে খালি অবস্থায় অপেক্ষা করছে। অবরোধের কারণে এসব জাহাজ ইরানে ফিরে যেতে পারছে না।
