দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি, পূর্বানুমানযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা। একইসঙ্গে শিল্পাঞ্চল ও রপ্তানিমুখী কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আগাম লোডশেডিং সূচি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা। রোববার রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব দাবি জানান তারা।
পলিসি এঙচেঞ্জ বাংলাদেশ ও এমসিসিআই ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ: উন্নত ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে। এতে সহায়তা করে অস্ট্রেলিয়া সরকারের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ।
বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ। এরপর পলিসি এঙচেঞ্জ বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হাসিব হাসান ‘বিজনেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার- পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা দেন। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব এবং অঞ্চলভিত্তিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ বিজনেস ইনডেঙের (বিবিএঙ) তথ্য তুলে ধরা হয়।
পরে পলিসি এঙচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন বাংলাদেশ টেঙটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, লাফার্জহোলসিমের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, ইএসটেঙ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. ইজাজ হোসেন এবং বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এঙপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম।
আলোচনায় বাংলাদেশ বিজনেস ইনডেঙ (বিবিএঙ) ২০২৪-২৫-এর তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ব্যবসায়িক অবকাঠামোর স্কোর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৭১ দশমিক ১ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮ দশমিক ৮ পয়েন্টে নেমেছে। জরিপে অংশ নেয়া ৭৪ দশমিক ২ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তারা কখনো কখনো বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখোমুখি হন। মাত্র ২০ দশমিক ১ শতাংশ ব্যবসায়ী অবকাঠামো উন্নয়নে কাঠামোগত বা নিয়ন্ত্রক উদ্যোগ দেখতে পেয়েছেন।
এ সময় বলা হয়, চলমান গ্যাস সংকট, কম গ্যাসের চাপ, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং বাড়তি জ্বালানি ব্যয় শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আগস্টের শুরুতে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমানো বা বন্ধ রাখতে হয়েছে।
প্যানেল আলোচনায় বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জ্বালানি সংগ্রহের দুর্বলতার প্রতিফলন। রপ্তানিমুখী ও জ্বালানি-নির্ভর শিল্পকে সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি একটি পৃথক শিল্প জ্বালানি নীতি প্রয়োজন।
মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান শিল্প বিনিয়োগ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা জরুরি। আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়নকে সামনে রেখে জ্বালানি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
সিরামিক শিল্পের জন্য গ্যাসকে শুধু জ্বালানি নয়, উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হিসেবে উল্লেখ করেন মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের সরবরাহ অনিশ্চয়তা উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগকে হুমকির মুখে ফেলছে।
ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকট এখন শুধু সরবরাহের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি ও পরিকল্পনারও বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাস্তবসম্মত জ্বালানি মিশ্রণের দিকে নজর দিতে হবে।
আলোচনায় শিল্প ও রপ্তানিমুখী কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি আগাম ও নির্ভরযোগ্য লোডশেডিং সূচি প্রকাশের দাবি ওঠে। এতে কারখানাগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবে বলে মত দেন অংশগ্রহণকারীরা।
গোলটেবিলের সুপারিশের ভিত্তিতে বিবিএঙের তথ্য ও তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রস্তাব সমন্বয় করে একটি নীতিপত্র তৈরির উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানানো হয়।
