মুক্তিযুদ্ধসহ জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আকাঙ্ক্ষা পূরণেই সরকার কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ‘করবী’ হলে গুম-খুনের শিকার এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যদের চাকরি প্রদান উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে ৭৪ জন সদস্যকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী গুম-খুন এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের ১০ জন সদস্যের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রী যাদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং খোঁজখবর নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বোচ্চ দিয়ে আমরা চেষ্টা করবো, যে আকাঙ্ক্ষা ১৯৭১ সালে শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা করেছিলেন, যে আকাঙ্ক্ষা দেশ স্বাধীনের পর থেকে বিভিন্ন সময় গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে যারা হারিয়ে গিয়েছেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন এবং সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনে যে মানুষগুলো শহীদ হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিভিন্নভাবে- তাদের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, এই সরকার বদ্ধপরিকর সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে।
তিনি বলেন, আজকে হয়তো কেউ কেউ বলতে পারে যে, সরকার এই নির্যাতিত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমি কথাটা একটু ঘুরিয়ে অন্যভাবে বলতে চাই। আমি বলতে চাই, এই মানুষগুলো বা এই পরিবারগুলোর সহযোগিতা বা সমর্থন আছে বলেই সরকার পূর্ণ উদ্যোগে সেই শহীদ বা সেই আত্মত্যাগকারী যে মানুষগুলো, তাদের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করার জন্য উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সরকার কাজ করছেন। কাজেই আপনারাই হচ্ছেন আমাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং শক্তির উৎস।
সরকারপ্রধান বলেন, আমি আশা করবো, যতদিন পর্যন্ত এদেশের মানুষ আমাদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রাখবে, আমরা ততদিন পর্যন্ত এই পরিবারগুলোর সমর্থন বা আশা-প্রত্যাশা পূরণ করবো।
তিনি বলেন, আমাদের নিজেদের দলের মধ্যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে, বিভিন্ন অরাজনৈতিক ব্যক্তি বা পরিবার আছে- যাদের অবদান বা আত্মত্যাগ আছে এই দেশের গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করার জন্য। সকল সময় সরকারের চেষ্টা থাকবে, যত সীমাবদ্ধতা থাকুক না কেন তার মধ্যে চেষ্টা থাকবে, এই মানুষগুলোর পাশে থাকার জন্য, এই পরিবারের পাশে থাকার জন্য। আপনাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতি হয়তো কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তারপরেও এতটুকু বলবো, আমাদের অবস্থান থেকে আমরা আপনাদের সঙ্গে ছিলাম, আছি, ইনশাআল্লাহ থাকবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরাও চাই আপনারাও আমাদেরকে সহযোগিতা করবেন, আমাদের উৎসাহ দেবেন, যাতে আমরা শহীদসহ সকল আত্মত্যাগকারী গণতান্ত্রিকামী যোদ্ধা যারা আছেন, তাদের যে প্রত্যাশা দেশ ও জাতিকে নিয়ে, সেই প্রত্যাশা পূরণে আমরা যাতে কাজ করতে পারি, সেই সমর্থন প্রত্যাশা করছি।
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানটি আমাদের জন্য কিছুটা কষ্ট বয়ে নিয়ে আসে বৈকি। কারণ আমরা এই অনুষ্ঠানে এমন কতোগুলো মানুষকে স্মরণ করছি, যে মানুষগুলো হয়তো আজকে এখানে থাকার কথা ছিল, কিন্তু আমাদের মাঝে নেই। এই যে মানুষগুলো আজকে আমাদের মাঝে নেই, তাদের অনুপস্থিতির যে কারণ, সেই কারণের ভেতর দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ একটি ফ্যাসিস্ট অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছে। সেজন্যই আমাদের প্রথম কাজটি হবে, সেই মানুষগুলো- যারা আজকে আমাদের মাঝে অনুপস্থিত, কোথায় কি অবস্থায় আছে একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জানেন। আমাদের উচিত হবে দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দোয়া করা যে, সেই মানুষগুলোকে যাতে আল্লাহ যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থাতে সর্বোচ্চ ভালো অবস্থায় যাতে তাদেরকে রাখেন।
আবেগ প্রবণ কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে এখানে সেই মানুষগুলোর পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই আপনাদের সামনে দেখে আমিও কিছুটা ইমোশনাল বোধ করছি।
তারপরেও এতটুকু আমি বলতে চাই, আমরা আপনাদের আগে বলেছিলাম- স্বাভাবিকভাবে বড় কিছু অর্জন করতে গিয়ে আমাদের যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, যে মানুষগুলো ত্যাগ স্বীকার করেছেন, যারা আমাদের মাঝে আছে নেই। যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদেরকে এতটুকু বলতে চাই যে, যে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার পরিবারের সদস্য আজকে হারিয়ে গিয়েছে- তারা যে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নিয়ে এ দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য যে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন বা যারা বিভিন্নভাবে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন বর্তমান সরকার তার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করবে, যাতে করে সেই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া জুলাই অভ্যুত্থান ও গুম-খুনের শিকার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ইশফাক আহমেদ, শাম্মী সুলতানা, আলাল আহমেদ, শহীদ আনভীর বাবা মমতাজ হোসেন, শহীদ আহনাফের মা জারতাজ পারভীন, জুলাইযোদ্ধা কাজী সাইমুম সিরাজ বক্তব্য রাখেন। তারা নিয়োগপত্র প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি জানান।
চাকরির নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন- গুমের শিকার ইফতেখার আহমেদ দিনারের ভাই ইশফাক আহমেদ, নুরুজ্জামান জনির ভাই মনিরুজ্জামান হীরা, আনোয়ার হোসেন মাহবুবের ভাই আনান হোসেন নূর, সেলিম রেজা পিন্টুর ভাই হাসনাইন রেজা এবং খালেদ হোসেন সোহেলের স্ত্রী শাম্মী সুলতানা। জুলাই অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধা দৃষ্টিশক্তিহীন আলাল আহমেদ, শহীদ আলভীর বাবা মো. আবুল হোসাইন, শহীদ আহনাফের মা জারতাজ পারভীন, আহত যোদ্ধা কাজী সাইমুম সিরাজ এবং ইসরাফিল ইসলামের ভাই মাহবুব আলম প্রমুখের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা, শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক, শাহরিয়ার পামির, আমার বিএনপি পরিবারের সদস্য মোকছেদুল মোমিন মিথুন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
