সালাহউদ্দিন আহমদ গুমের ঘটনা

আসামি বাড়তে পারে তদন্তে ‘মিসিং লিংক’ খুঁজছে ট্রাইব্যুনাল

ফন্ট সাইজ:

বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ২০১৫ সালে গুমের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মামলায় বর্তমানে যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের বাইরে আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আসামির তালিকা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ আরও কয়েকজনের নাম আসতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে চাইছে না তদন্ত সংস্থা। মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তবে তদন্তকারীরা বলছেন, সালাহউদ্দিন আহমদ টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলে অবস্থান করার সময় সেলের নিরাপত্তারক্ষী সেখানে থাকা অন্য ভুক্তভোগীদের জানিয়েছিলেন, ‘তোমাদের দলের একজন হাই-প্রোফাইল নেতাকেও এখানে আনা হয়েছে।’ ওই সময় টিএফআই সেলে আটক থাকা ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং গুমের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দেয়া কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দি থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি তদন্ত সংস্থার।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার শাইখ মাহদী মানবজমিনকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে কয়েকজন সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর জবানবন্দিতে সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের অভিযোগে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই বাছাই করে গুমের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও তথ্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে আশা করছি।

মামলায় আসামির সংখ্যা বাড়বে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী বলেন, তদন্তের স্বার্থে বেশ কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তদন্ত শেষে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আসামির সংখ্যা বাড়তে পারে।
টিএফআই কর্মকর্তার ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে: জানা যায়, মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের ঘটনায় তৎকালীন র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার কার্যক্রমসহ টিএফআই-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে টিএফআইয়ের দায়িত্বে থাকা বর্তমানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তদন্ত সংস্থার হেফাজতে আনা হয়েছিল। তদন্তে আরেক কর্মকর্তা টিএফআইয়ের ওয়াইসি (অফিসার ইনচার্জ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে শনাক্ত করা হয়েছে।

তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক এ কে আজাদের ভূমিকা সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে পরবর্তীতে সিলেটের জৈন্তাপুরে একটি জঙ্গিবিরোধী অভিযানে বোমা হামলায় তিনি নিহত হন। ফলে তার কাছ থেকে সরাসরি তথ্য পাওয়ার সুযোগ না থাকায় তদন্তে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা এ কে আজাদের মৃত্যুকে তদন্তের একটি ‘মিসিং লিংক’ হিসেবে দেখছেন। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক হিসেবে এ কে আজাদ দায়িত্ব পালন করলেও ওই সময়ে জিয়াউল আহসানের কার্যক্রমও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার কার্যক্রমে জিয়াউল আহসানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১০ই মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ। সে সময় বিএনপি’র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে গেছেন। ওই সময় সালাহউদ্দিন বিএনপি’র মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রায় দুই মাস পর একই বছরের ১১ই মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে স্থানীয় পুলিশ সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্ধার করে। সে সময় ভারতের পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শিলংয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় স্থানীয়দের ফোন পেয়ে পুলিশ তাকে আটক করে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন, ৬ই আগস্ট ভারত সরকার সালাহউদ্দিন আহমদকে দেশে ফেরার জন্য ট্রাভেল পাস দেয়। পরে ওই বছরের ১১ই আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন।