হাসনাত আবদুল্লাহর দুঃখপ্রকাশ

হাসনাত আবদুল্লাহর দুঃখপ্রকাশ

ফন্ট সাইজ:

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। শনিবার বেলা ১টা ৪৫ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে দুঃখপ্রকাশ করেন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে একটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। হাসনাতের এই বক্তব্যের প্রতিবাদে শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। তারা হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং বক্তব্যের জন্য তাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। এরপরই হাসনাত দুঃখপ্রকাশ করেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি চেয়ে সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম, তাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখপ্রকাশ করছি।’ হাসনাত লিখেছেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা, সিনেমা অনেকটা নিষিদ্ধের মতোই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় আসলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। সেখানকার আলেম ওলামাদের ওপর দিয়েছেন। তাদের ভাবমূর্তি বিশ্বের সামনে ক্ষুণ্ন করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের কনসার্ট বন্ধ হওয়ার খবর মিডিয়ায় যেভাবে এসেছিল, বাস্তব চিত্র তা থেকে আলাদা ছিল দাবি করে ফেসবুক পোস্টে হাসনাত লেখেন, গভীর রাতে উচ্চ শব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। তাই শিক্ষার্থীরা শব্দ কমাতে বলে। এ নিয়ে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের কথাকাটাকাটি থেকে পরবর্তী ঘটনা ঘটে। কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন পুলিশের লাঠিপেটায়।

তিনি আরও লিখেছেন, ‘মিডিয়া ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলেও ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা স্পষ্ট, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করে দেয়নি। তারা শুধু শব্দ কমাতে বলেছিলেন। এর মানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ নয়, যেমনটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ সম্পর্কে ভুল বার্তা দিয়েছিলেন, তাদের ছোট করেছিলেন। অন্যদিকে নৌকা বাইচের বিষয়টিতে স্থান নিয়ে আমার তথ্যগত ত্রুটি হয়েছে। সিলেটের জায়গায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বলে ফেলি। এই ত্রুটিতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আমি বিব্রত। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য দুঃখপ্রকাশ করছি।’

মূল ঘটনা কী ছিল, মিডিয়া কী ফ্রেমিং করেছে, সেটা নিয়ে সংসদে কথা বলা উচিত ছিল বলেও উল্লেখ করেন এনসিপি’র এই নেতা। তিনি জানান, সম্পূরক প্রশ্নে সময় সীমাবদ্ধতার কারণে বিস্তারিত বলার সুযোগ ছিল না।
হাসনাত আরও লেখেন, ‘এই বাংলাদেশ সবার, যেখানে মসজিদ থাকবে, মন্দির থাকবে, সংগীত থাকবে, ওয়াজ থাকবে, মাজার থাকবে, কনসার্ট হবে, মাহফিল হবে, রথযাত্রা হবে, সিনেমা উৎসব হবে, আবার বিজ্ঞ আলেমদের আলোচনাও হবে। সব ধর্মের, মতের মিলনস্থল এই বাংলাদেশ। যার যেটা পছন্দ হবে, সে সেটায় যাবে, অংশ নেবে, যার যেটা পছন্দ হবে না, সে সেটায় যাবে না। আর সরকার এইটুকু নিশ্চিত করবে, কেউ যেন আরেকজনের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, এমন কিছু করতে না পারে। আজকে সরকার সেই নিরাপত্তা দিতে পারছে না এবং তার ফলে সমতার বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে ক্ষতি হচ্ছে।’

গভীর রাতে বয়কট স্লোগান
অতঃপর প্রত্যাহার
ওদিকে স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জানান: এনসিপি বয়কট স্লোগানে মধ্যরাতে মিছিল। ক্ষমা চাওয়ার আল্টিমেটাম, এনসিপি’র অনুষ্ঠানস্থলে পাল্টা কর্মসূচি। এ নিয়ে উত্তেজনা মিটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে সংসদে দেয়া বক্তব্যে হাসনাত আবদুল্লাহর দুঃখ প্রকাশের মধ্যদিয়ে। এরপরই কর্মসূচি প্রত্যাহার করে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে এনসিপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার পর কর্মসূচি প্রত্যাহারের কথা জানায় সংগঠনটি।
তবে শিল্পকলায় পূর্ব নির্ধারিত সাংগঠনিক অনুষ্ঠান করতে পারেনি এনসিপি। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, সংসদে দেয়া বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করায় একটি পক্ষ তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অন্যদিকে এনসিপি ছোটখাট একটি প্রোগ্রাম করার কথা বলে শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন ভাড়া নিয়েছিল। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে দলীয় প্রোগ্রাম করার সুযোগ নেই। তারা সেখানে অনুষ্ঠান করতে পারবে না। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দিলে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সামনে ও আশপাশে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তালা দিয়ে দেয়া হয় শিল্পকলার গেটে।

এখানে শনিবার বিকাল ৪টায় এনসিপি’র সাংগঠনিক সভা করার কর্মসূচি ছিল। এরমধ্যে সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রাতে শহরে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ বিক্ষোভ করে। তারাও বিকাল ৩টায় শিল্পকলায় কোরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত ও ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার ঘোষণা দেয়।

এরআগে শুক্রবার রাত পৌনে ১২টার দিকে শহরের কান্দিপাড়া এলাকা থেকে জাতীয় সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহর দেয়া বক্তব্যের প্রতিবাদে মিছিল বের করে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সমাবেশে বক্তারা সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের সমালোচনা করে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং তার বক্তব্যের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। অন্যথায় শনিবার বিকালে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পূর্বনির্ধারিত সাংগঠনিক সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালা করতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দেন বক্তারা।

শনিবার দুপুরে হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুক স্ট্যাটাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে জানিয়ে সংসদে দেয়া তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এরপরই নিজেদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ।