সংকটে থাকা কয়েকটি বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য সম্পদ নগদায়ন করে গ্রাহকদের বকেয়া দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ)। প্রথম ধাপে সাত থেকে আটটি কোম্পানির গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হবে। এ ছাড়া বীমা খাতে তথ্য গোপন ও ‘ডাবল সার্ভার’ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ছয় সপ্তাহ সময় দিয়েছে আইডিআরএ।
শুক্রবার ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত এক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন জানান, বীমা কোম্পানিগুলোর যেসব সম্পদ রয়েছে, সেগুলো বিক্রি এবং ট্রেজারি বন্ড ও এফডিআরসহ বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ নগদায়ন করে পাওয়া অর্থ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকটি কোম্পানির সম্পদ থেকে পাওয়া অর্থ আইডিআরের তদারকিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে ওই অর্থ গ্রাহকদের পরিশোধ করা শুরু হবে। তিনি বলেন, ‘তাদের যত জমি বিক্রি হয়ে লিকুইডেট হতে থাকবে, ব্যাংকে টাকা আসবে, আমরা গ্রাহকদের দিতে থাকবো।’
গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ (এফআইএফও) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে জানিয়ে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, যে গ্রাহকের দাবি আগে এসেছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাকেই আগে অর্থ দেয়া হবে। এ জন্য কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে গ্রাহকদের দাবির তালিকা সংগ্রহ করে তা নিরীক্ষকদের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি কোম্পানির জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে এবং সেখানে নিরীক্ষক রাখা হয়েছে। কোম্পানিগুলোর সরাসরি ওই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। আইডিআরের তদারকিতে নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধ করা হবে।
বকেয়া দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কথা উল্লেখ করেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কোম্পানিটির প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দাবি পরিশোধ না করার বিষয় রয়েছে। এ কারণে আপাতত প্রতিষ্ঠানটির প্রথমবর্ষের নতুন প্রিমিয়াম গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে নবায়ন প্রিমিয়াম নেয়ার সুযোগ রয়েছে। মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, ফারইস্টের ফেনীতে থাকা একটি জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং কিছু বন্ড তরলীকরণ করে পাওয়া অর্থ এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। এসব অর্থ দিয়ে আগামী সপ্তাহে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ শুরু করা হবে।
ফারইস্টের পাশাপাশি সমস্যাগ্রস্ত আরও কয়েকটি কোম্পানির গ্রাহকদেরও পর্যায়ক্রমে দাবি পরিশোধ করা হবে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ফারইস্টের সব সম্পদ ও বন্ড তরলীকরণ করা হলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে। এই অর্থ দিয়ে বড় একটি অংশের দাবি নিষ্পত্তির পর কোম্পানিটির ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।
তিনি জানান, কোনো কোম্পানি যদি ব্যবসায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং গ্রাহকদের একটি বড় অংশের দাবি পরিশোধ করতে পারে, তাহলে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে।
বীমা খাতে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোকে আইডিআরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেন, পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করা আইডিআরের মূল দায়িত্ব। যেসব কোম্পানি গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না, তাদের সম্পদ ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বীমা খাতকে একটি শক্তিশালী আর্থিক খাতে পরিণত করতে হলে প্রথমে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সে লক্ষ্যেই আইডিআরএ একদিকে কোম্পানিগুলোর সম্পদ ও আর্থিক তথ্য যাচাই করছে, অন্যদিকে বকেয়া দাবি পরিশোধে সরাসরি তদারকি করছে। তিনি জানান, সম্পদ বিক্রি ও নগদায়নের অর্থ যত পর্যায়ক্রমে হাতে আসবে, ততই গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করা হবে। এ কার্যক্রম আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে ধারাবাহিকভাবে চলবে।
ডাবল সার্ভার বন্ধে আল্টিমেটাম:
বীমা খাতে তথ্য গোপন ও ‘ডাবল সার্ভার’ ব্যবহারের অভিযোগ তুলে তা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ছয় সপ্তাহ সময় দিয়েছে আইডিআরএ। ‘ডাবল সার্ভার’ প্রসঙ্গে আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানান, তিনি এরই মধ্যে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) কাছে চিঠি দিয়েছেন। যেসব কোম্পানির একাধিক বা গোপন সার্ভার রয়েছে, সেগুলো একীভূত করতে ছয় সপ্তাহ সময় দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটা তাদের জন্য আমার সতর্কবার্তা। যারা করবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গোপন বা অতিরিক্ত সার্ভার সরিয়ে তথ্য ব্যবস্থাপনা একীভূত করতে হবে। তা না হলে কারও গ্যারেজ, বিছানার নিচে কিংবা অন্য কোথাও সার্ভার লুকানো থাকলেও তা খুঁজে বের করে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নিজের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, কোথায় সার্ভার লুকিয়ে রাখা হয়েছে তা শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত অডিট করা আইডিআরএ’র জন্য কঠিন নয়। প্রয়োজনে দেশের যেকোনো জায়গা থেকে এসব সার্ভার শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আইআরএফ সভাপতি গোলাম মাওলার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. কাজিম উদ্দিন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইআরএফ সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন।
